একটি নক্ষত্রের উদয়: স্বপ্নিল অভিষেকে মেসির গোল ও অ্যাসিস্ট
২০০৬ সালের জার্মানির সেই গ্রীষ্মকাল ছিল এক পালাবদলের সময়। নব্বই দশকের কিংবদন্তিদের রাজত্ব তখন ফুরিয়ে আসছে, আর বিশ্ব ফুটবল খুঁজছিল নতুন এক আইকনকে। আর্জেন্টিনায় এই খোঁজ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই ছিল এক আবেশের মতো। তারা কেবল একজন খেলোয়াড় নয়, বরং দিয়েগো ম্যারাডোনার পর একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় ছিল।
২০০৬ সালের ১৬ জুন, গেলসেনকির্চেনে আর্জেন্টাইনরা এবং পুরো দুনিয়া অবশেষে তার দেখা পায়— লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপের মাঠে পা রাখার আগেই মেসি পরিণত হয়েছিলেন ইউরোপজুড়ে ডিফেন্ডারদের মনে ভয় ধরানো এক 'অতিপ্রাকৃত' নামে। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় তিনি গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভোগা এক লাজুক কিশোর থেকে এমন এক ফরোয়ার্ডে রূপ নিচ্ছিলেন, যাকে দেখে সিনিয়র খেলোয়াড়রা পর্যন্ত নির্বাক হয়ে যেতেন। তার মেন্টর এবং কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রোনালদিনিয়ো ততদিনে মেসির সিংহাসনে আরোহণের সুর বাজাতে শুরু করেছিলেন।
২০০৬ বিশ্বকাপ যখন দুয়ারে, মেসির নামের পাশে ততদিনে দুটি লা লিগা ও একটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। যদিও ঊরুর চোটের কারণে ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব আসরের ফাইনাল খেলা হয়নি তার। তখন থেকেই প্রত্যাশার প্রবল চাপের মাঝে ছিলেন তিনি। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা ১৮ বছর বয়সী তরুণের হাতে শিরোপা ধরা ব্যানার নিয়ে মাঠে আসত— যে ভবিষ্যৎবাণী পূর্ণ হতে সময় লেগে যায় ১৬ বছর।
গেলসেনকির্চেনের আকাশ আকাঙ্ক্ষার দাবিতে ভারী হয়ে উঠেছিল, কিন্তু বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত কিশোরকে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত বেঞ্চেই বসে থাকতে হয়। আইভরিকোস্টের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেও খেলার সুযোগ পাননি তিনি। বার্সায় পাওয়া চোট কাটিয়ে উঠতে থাকা মেসি তাকিয়ে দেখছিলেন কীভাবে আর্জেন্টিনা কৌশলগতভাবে প্রতিপক্ষ সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোকে চুরমার করে দিচ্ছে।
অবশেষে কোচ হোসে পেকারম্যান সংকেত দেন। বদলি খেলোয়াড়ের বোর্ডে ১৯ সংখ্যাটি ফুটে উঠতেই গগনবিদারী গর্জন শুরু হয়— কেবল সাদা-আকাশি রঙে ঠাসা গ্যালারি থেকেই নয়, বরং ভিআইপি বক্স থেকেও, যেখানে ম্যারাডোনা একজন অন্ধ ভক্তের মতো উন্মাদনায় লাফাচ্ছিলেন।
দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের পাশে মেসিকে ছোটখাটো দেখাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তার আগমনী বার্তার তেজ ছিল আকাশচুম্বী। মানিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি কোনো সময় নেননি। ৭৮তম মিনিটে লেগে থাকা মার্কারকে ফাঁকি দিয়ে তিনি চোখের পলকে এগিয়ে যান। বলটি যেন তার পায়ের সঙ্গে আঠার মতো লেগে ছিল। পাঁচ মিনিট পর বাঁ প্রান্ত দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ঢুকে একটি নিখুঁত বল বাড়িয়ে দেন হার্নান ক্রেসপোকে, নথিবদ্ধ হয় বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির প্রথম অ্যাসিস্ট।
তবে 'কিংবদন্তি হওয়ার যাত্রা' শুরু হয় মূলত আরও পাঁচ মিনিট পর। কার্লোস তেভেজ একটি ধারালো পাস বাড়ান, যেখানে মেসির প্রথম স্পর্শটিই ছিল ডিফেন্ডারদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা— ধরাছোঁয়ার বাইরে গিয়ে ডি-বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা ফেলেননি তিনি। এরপর ডান পায়ের দর্শনীয় ফিনিশিংয়ে বল জড়ায় জালে। ১৮ বছরের সেই তরুণের উদযাপন পরবর্তী দুই দশক ধরে বারবার দেখার মতো এক দৃশ্যে পরিণত হয়।
মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে ওই 'ওয়াইল্ডকার্ড এন্ট্রি' হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার মূল আকর্ষণ। ৬-০ গোলের বিধ্বংসী জয়ের পর শেষ বাঁশি বাজতেই বোঝা যায়— এটি কেবল একটি জয় ছিল না, ছিল একজন নতুন সম্রাটের রাজ্যাভিষেক। সেদিন এমন একজন তারকার জন্ম হয়, যিনি পায়ের জাদু দিয়ে আগামীর পথরেখা তৈরি করতে আসেন।
ভিআইপি বক্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শক তখন আনন্দের আতিশয্যে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। যার সঙ্গে মেসির আজীবন তুলনা হওয়ার নিয়তি নির্ধারিত ছিল, সেই ম্যারাডোনা সাধারণ ভক্তদের মতো উল্লাসে নিজের জার্সি খুলে ঘোরাচ্ছিলেন। আগেই তিনি অবশ্য সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, 'আমি ওই খেলোয়াড়টিকে দেখেছি যে আর্জেন্টাইন ফুটবলে আমার জায়গা দখল করবে... তার নাম মেসি।'
এরপর যা ঘটে তা ছিল বিস্ময় ও অনিবার্যতার এক সংমিশ্রণ। মেসির প্রথম বিশ্বকাপ অ্যাসিস্ট থেকে গোল করা সতীর্থ ক্রেসপো ম্যাচের শেষে তাকে আখ্যায়িত করেন 'সংযত প্রতিভা' হিসেবে। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের সুরও রাতারাতি বদলে যায়।
টাইব্রেকারে গড়ানো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পথে জার্মানির বিপক্ষে মেসিকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার জন্য কোচ পেকারম্যান পরবর্তীতে অনেক সমালোচিত হন। তবে তিনি সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচটিকে দেখছিলেন ভবিষ্যতের এক প্রয়োজনীয় ভূমিকা হিসেবে। তিনি মেসিকে বলেছিলেন, 'সতীর্থদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতে থাকো, এটা তোমার কাজে লাগবে। কারণ তোমার আসল বিশ্বকাপ হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়।'
সময়ের হিসেবে পেকারম্যান ভুল ছিলেন। চূড়ান্ত গৌরব অর্জনের জন্য মেসিকে আরও অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়— ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে লুসাইল স্টেডিয়ামে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে পেকারম্যান ভুল ছিলেন না।
গেলসেনকির্চেনে জুনের পড়ন্ত বিকালে মেসির 'কল্পিত রূপ' বাস্তবে ধরা দিয়েছিল। বিশ্ব সেদিন শুধু একজন বদলি খেলোয়াড়কে দেখেনি, তারা দেখেছিল বুটের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হওয়া পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি গল্পের সূচনা।