মাদক কার্টেলের রক্তাক্ত শহরেই বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার
মাদক কার্টেল-সহিংসতায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে মেক্সিকোর অন্যতম বড় শহর গুয়াদালাহারা। সেনাবাহিনীর অভিযানে কুখ্যাত এক মাদক সম্রাট নিহত হওয়ার পর সপ্তাহান্তজুড়ে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মতো এই শহরেও ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ। তবু সব আতঙ্কের মাঝেই আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে শহরটি, যেখানে চারটি ম্যাচ আয়োজনের কথা রয়েছে।
মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন আধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভরসা করছে। ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভিডিও নজরদারি, সবই থাকবে নিরাপত্তা বলয়ে।
কিন্তু বাস্তবতা ভয়াবহ। জালিস্কো রাজ্য জুড়ে নিখোঁজের ঘটনা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, আর এসব ঘটনার বড় অংশই ঘটেছে গুয়াদালাহারা মহানগর এলাকায়। সরকারি হিসাবে রাজ্যটিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৫৭৫। অপরাধী গোষ্ঠীর জোরপূর্বক সদস্য সংগ্রহই এসব ঘটনার বড় কারণ বলে জানিয়েছেন গুয়াদালাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কারমেন চিনাস।
রোববার সেনা অভিযানে নিহত হন কুখ্যাত মাদক সম্রাট নেমেসিও ‘এল মেনচো’ ওসেগুয়েরা, যিনি জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের প্রধান এবং মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মোস্ট-ওয়ান্টেড অপরাধী ছিলেন। তার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে অন্তত ৫৭ জন নিহত হন। ২০টি রাজ্যে সড়ক অবরোধ করা হয়, বাস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির অবনতিতে গুয়াদালাহারা এবং মধ্যাঞ্চলীয় কেরেতারো রাজ্যে ফুটবল ম্যাচও স্থগিত করা হয়। সহিংসতার বিষয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সহিংসতার পর শহরের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, জালিস্কোতে ক্লাস স্থগিত করা হয় এবং আরও ডজনখানেক রাজ্যে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এদিকে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ক্ষোভও রয়েছে অনেকের মধ্যে। ২০২০ সালে নিখোঁজ হওয়া ভাইয়ের খোঁজে এখনও সংগ্রাম করছেন কারমেন পন্সে। তার ভাষায়, “উদযাপনের কিছু নেই, দেশ গোল উদযাপন করছে, আর আমরা আমাদের প্রিয়জনদের খুঁজে বেড়াচ্ছি।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিখোঁজদের পরিবারগুলোর ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভও হতে পারে। ইতোমধ্যে সহিংসতার কারণে পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে, স্থানীয় গাইড মিসায়েল রোব্লেস জানিয়েছেন, তিনি ২৫টি ট্যুর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্বকাপ ম্যাচের জন্য নির্ধারিত এস্টাদিও আকরন স্টেডিয়ামের কাছাকাছিও অপরাধচক্রের আস্তানা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। স্টেডিয়াম থেকে দুই কিলোমিটারেরও কম দূরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপহরণের অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৮ সালে নিখোঁজ হওয়া ছেলেকে খুঁজে চলা হোসে রাউল সারভিন আশঙ্কা করছেন, বিশ্বকাপ দেখতে আসা পর্যটকেরাও অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। তার কণ্ঠে আতঙ্ক, “আমাদের মতো আর কারও সঙ্গে যেন এমন কিছু না ঘটে। সে যদি আজ বেঁচে থাকত, বিশ্বকাপ দেখে খুব খুশি হতো।”