নিঃসঙ্গতায় মৃত্যু—আমরা বেঁচে থাকতে কতজন সত্যিই জানে যে আমরা আছি

রাজীব নন্দী
রাজীব নন্দী

মানুষ একা থাকতে চায় না। সে চায়, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করুক, তার নীরবতা টের পাক, তার ফোন না ধরলে আবার ফোন করুক, কয়েক দিন দরজা না খুললে উদ্বিগ্ন হয়ে কড়া নাড়ুক।

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ দলবদ্ধভাবে শিকারে যেতো, শিকার শেষে দিনান্তে আগুনের চারপাশে বৃত্ত তৈরি করতো—শুধু শীত কাটানোর জন্য নয়, একে অপরের গল্প, ভয়, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য। তাই মানুষের ইতিহাস আসলে সহাবস্থানের ইতিহাস। অথচ আজকের নগরসভ্যতা যেন সেই প্রাচীন বৃত্তটি ভেঙে দিয়েছে। মানুষ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষের ভিড়ে থেকেও একা।

চলতি মাসের শুরুতে রাজধানীর পল্লবী ও মুগদা এলাকায় মাত্র চারদিনের ব্যবধানে তিনজন মানুষের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। কেউ বিছানায়, কেউ ঘরের মেঝেতে, আবার কেউ ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন দিনের পর দিন। মৃত্যুর পরও তাদের খোঁজ নিতে কেউ আসেননি। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন আলোচিত খবর হলো, রাজধানীর শাহবাগ এলাকার আজিজ সুপার মার্কেটের আবাসিক ভবনের ১৪তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ফারা ফেরদৌস নামে চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ২৬ জুন বিকেলে এই ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ তিনদিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর অবশেষে তার নিথর দেহের সন্ধান মেলে।

ফারা ফেরদৌস, তানভীর হোসেইন শুভ, নূরজাহান বেগম কিংবা সেলিনা আফরোজ—তাদের মৃত্যুর ধরন এক নয়, জীবনও এক ছিল না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা সবাই একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন—একটি গভীর নীরবতা। আরও নির্মম হলো, মৃত্যুর পরও সেই নীরবতা কয়েকদিন ধরে অটুট ছিল।

এই ঘটনাগুলোকে কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আমাদের নগর সমাজের আয়না—যে সমাজে মেট্রোরেলের কামরায় শত মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু একজন আরেকজনের চোখের ক্লান্তি পড়ে না; যে সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধু থাকে, কিন্তু অসুস্থ হলে দরজায় কড়া নাড়ার মানুষ থাকে না; যে সমাজে প্রতিদিন হাজারো বার্তা আদান-প্রদান হয়, কিন্তু একটি আন্তরিক প্রশ্ন ‘তুমি সত্যিই কেমন আছ?’ ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছে।

কার্ল মার্কস প্রায় দেড়শ বছর আগে লিখেছিলেন, আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে শুধু তার শ্রম থেকেই নয়, অন্য মানুষের থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন তিনি কারখানার শ্রমিকের কথা বলছিলেন। আজ সেই বিচ্ছিন্নতা অফিসের নির্বাহী, চিকিৎসক, ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা করপোরেট কর্মী সবার জীবনে নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আমরা এখন কাজ করি জীবনের জন্য নয়; অনেক সময় জীবনকেই কাজের কাছে সমর্পণ করি। ধীরে ধীরে মানুষ পরিচয় হারিয়ে কেবল একটি পেশা, একটি পদবি কিংবা একটি কর্মক্ষমতায় পরিণত হয়।

সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম বলেছিলেন, সমাজ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু আইন দিয়ে নয়, সম্পর্ক দিয়ে। পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী এই অদৃশ্য বন্ধনগুলোই মানুষকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাখে। যখন সেই বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যায়, তখন মানুষ জনসমুদ্রে থেকেও নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করে। বাংলাদেশের শহুরে জীবনে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। যৌথ পরিবার ভেঙেছে, প্রতিবেশী সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ফলে, একসঙ্গে থেকেও আমরা একে অপরের জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।

আজকের মানুষকে সবসময় কেউ শোষণ করছে না, অনেক সময় মানুষ নিজেই নিজেকে শোষণ করছে। আরও সফল হওয়ার, আরও উৎপাদনশীল হওয়ার, আরও এগিয়ে থাকার অন্তহীন প্রতিযোগিতায় আমরা নিজের ভেতরের মানুষটিকেই অবহেলা করছি। অফিস শেষ হয়, কিন্তু কাজ শেষ হয় না। ফোন বন্ধ হয় না, ই-মেইল থামে না, উদ্বেগ কমে না। আমরা ক্রমশ ব্যস্ত হচ্ছি, কিন্তু সেই ব্যস্ততা আমাদের সম্পর্কগুলোকে নীরবে গ্রাস করছে। তাই এই মৃত্যুগুলো কেবল চারজন মানুষের মৃত্যু নয়। এগুলো এমন এক সমাজের সংকেত, যেখানে মানুষের সামাজিক মৃত্যু অনেক আগে ঘটে, শারীরিক মৃত্যু শুধু তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়ে আসে।

এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি ক্রমশ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নীতির একটি বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কমিশন অন সোশ্যাল কানেকশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ছয়জনের একজন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে প্রতি বছর আনুমানিক ৮ লাখ ৭১ হাজার অকালমৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ জন মানুষের মৃত্যু কোনো না কোনোভাবে এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিঃসঙ্গতা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, জ্ঞানীয় অবক্ষয় ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন নিঃসঙ্গতাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং সামাজিক অবকাঠামো, নগর পরিকল্পনা, কর্মসংস্কৃতি ও জননীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একাকী মৃত্যুগুলোও সেই বৈশ্বিক সংকটেরই স্থানীয় প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়।

আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশ একটি ঘনবসতির দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই একে অপরের কাছাকাছি আছি? নাকি শুধু পাশাপাশি বাস করছি? পাশাপাশি অ্যাপার্টমেন্টে থেকেও প্রতিবেশীর নাম জানি না, একই অফিসে কাজ করেও সহকর্মীর দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা বুঝতে পারি না, একই পরিবারের সদস্য হয়েও মাসের পর মাস খোঁজ নিই না। সংখ্যায় আমরা একসঙ্গে, কিন্তু জীবনে ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছি।

একাকীত্বের ইতিহাস মানুষের সভ্যতার মতোই পুরোনো। গ্রিক পুরাণে নার্সিসাস নিজের প্রতিচ্ছবির প্রেমে পড়ে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই বন্দী হয়ে যায়। এটি কেবল আত্মমুগ্ধতার গল্প নয়, নিজের বাইরে আর কাউকে স্পর্শ করতে না পারার ট্র্যাজেডিও। আবার ভারতীয় পুরানে নির্বাসিত যক্ষ মানুষের গভীরতম ভয়কে স্পর্শ করে, পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়। কারণ, মানুষ প্রকৃতির একমাত্র প্রাণী, যে শুধু ভাত বা আশ্রয়ে বাঁচে না; সে বেঁচে থাকে অন্যের স্মৃতি, স্পর্শ, প্রতীক্ষা ও স্বীকৃতিতে। তাই নিঃসঙ্গতা কেবল একা একটি ঘরে বসে থাকা নয়; নিঃসঙ্গতা হলো এমন এক নীরব মরুভূমি, যেখানে চারপাশে মানুষের পদচিহ্ন আছে, কিন্তু কোনো পদধ্বনি নেই; জানালার বাইরে আলো জ্বলে, অথচ ভেতরে কারো জন্য কোনো প্রদীপ জ্বলে না। সম্ভবত এ কারণেই মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়; বরং এমন এক জীবন, যেখানে তার অনুপস্থিতি যেমন কারো নজরে পড়ে না, তেমনি তার উপস্থিতিও কারো জীবনে বিশেষ কোনো পার্থক্য তৈরি করে না।

কবি আবুল হাসান বহু আগে লিখেছিলেন, ‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!’। কিন্তু তাঁর সেই একাকীত্ব ছিল মানুষের চিরন্তন অস্তিত্বের দার্শনিক উপলব্ধি। আজকের ঢাকা শহরের একাকীত্ব ভিন্ন ধরনের। এটি শুধু অস্তিত্বের নয়; এটি সামাজিক। এখানে মানুষ একা হয় শুধু নিজের ভেতরে নয়, নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের কর্মজীবনে, এমনকি মৃত্যুর পরও। আবুল হাসানের মানুষ নিজের কাছে অচেনা ছিল। আমাদের সময়ের মানুষ যেন অন্য মানুষের কাছেও অচেনা হয়ে উঠছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’

এই সংকটের সমাধান শুধু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো নয়, যদিও সেটি জরুরি। এর সমাধান আরও গভীরে—মানুষকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা। হয়তো শুরুটা খুব ছোট। কোনো পুরোনো বন্ধুকে অকারণে ফোন করা। একা থাকা বাবা-মায়ের দরজায় কড়া নাড়া। সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করা, ‘আজ তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে, সব ঠিক আছে তো?’ কারণ, অনেক সময় একটি প্রশ্নই একজন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, সে এখনো কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে। আমাদের মৃত্যুর পর কতদিন লাগবে মানুষ জানতে যে আমরা আর বেঁচে নেই? এই প্রশ্নের চেয়েও ভয়ংকর প্রশ্ন হলো, আমরা বেঁচে থাকতে কতজন সত্যিই জানে যে আমরা আছি?

 

রাজীব নন্দী: শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
rajibnandy@cu.ac.bd