তরুণ নেতৃত্বে শক্তিশালী হোক সামাজিক সংলাপ ও ট্রেড ইউনিয়ন

ম্যাক্স তুনন
ম্যাক্স তুনন

একজন তরুণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন, ‘আমাদের প্রায়ই অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। বলা হয়, আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু সুযোগই যদি না পাই, তাহলে অভিজ্ঞতা অর্জন করব কীভাবে?’

তার কথাগুলো বাংলাদেশে বিদ্যমান ট্রেড ইউনিয়নগুলোর একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরে। তরুণরা ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সীমিতই থেকে যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে তরুণরা সক্রিয় অবদান রাখলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এখনো মূলত জ্যেষ্ঠ নেতাদের হাতেই কেন্দ্রীভূত।

বিষয়টি অভিজ্ঞ নেতৃত্ব বনাম তরুণ নেতৃত্বের নয়। বরং অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় ঘটানোর বিষয়। বিশ্বের প্রতিটি শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনই প্রজন্মের ধারাবাহিকতার ওপর গড়ে উঠেছে। তাই চ্যালেঞ্জটি কেবল তরুণদের জন্য কিছু জায়গা তৈরি করা নয়; বরং তাদের ওপর আস্থা রাখা, দায়িত্ব দেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করা। তরুণ নেতারা বর্তমান নেতৃত্বকে প্রতিস্থাপন করতে চান না; তারা তাদের কাছ থেকে শিখতে, তাদের পাশে থেকে কাজ করতে এবং আগামী দিনের শ্রমিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে চান।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও গিগ অর্থনীতির বিস্তারের ফলে কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এটি কেবল বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, বরং বৈশ্বিক প্রবণতা। আইএলও-এর ‘গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়; বরং নিশ্চিত করা যে শ্রমবাজারে তারা প্রবেশ করছে তা নিরাপদ, উৎপাদনশীল এবং সেখানে শোভন কাজের সুযোগ আছে।

এই পরিবর্তনের সময়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনা এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শ্রমিকদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যদি নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত না করে, তাহলে তা ধীরে ধীরে বর্তমান শ্রমবাজারের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

তাই ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে—তরুণদের সম্পৃক্ত করার পদ্ধতিকে নতুনভাবে ভাবার। তরুণ শ্রমিকরা ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়া, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজ এবং জলবায়ু সহনশীলতা ও কেয়ার ইকোনমির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারেন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের জন্য সুস্পষ্ট পথ তৈরি করতে হবে এবং অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ ও মেন্টরশিপের সুযোগ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সরকারকে সামাজিক সংলাপের কাঠামোতে তরুণদের আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং আইএলওসহ উন্নয়ন সহযোগীদের এই বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে অর্থবহ সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—কীভাবে শ্রমিক আন্দোলন আগামী প্রজন্মের শ্রমিকদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে পারে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে—যা সমষ্টিগত দরকষাকষি ও সামাজিক সংলাপের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান—সময়ের সঙ্গে বিকশিত হতে হবে। সম্প্রতি আইএলও আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় আমরা দেখেছি, তরুণ নেতারা সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। কারখানা পর্যায়ে তারা ইউনিয়ন গঠন, শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তি ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সামনের সারিতে কাজ করছেন। তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

তবুও জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব, সমষ্টিগত দরকষাকষি এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো সীমিত। অনেকের অভিজ্ঞতা হলো, অনেক সময় দক্ষতা ও সক্ষমতার চেয়ে বয়স ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই বেশি গুরুত্ব পায়। তরুণ নারী নেত্রীরা আরও কিছু অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছেন। যেমন: সামাজিক প্রত্যাশা, অবৈতনিক পরিচর্যা কাজের দায়িত্ব এবং নেতৃত্ব বিকাশের তুলনামূলক কম সুযোগ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণ নেতারা শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলেননি; তারা নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার সুযোগও চেয়েছেন। তারা বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০২৬, শিল্প সম্পর্ক, সমষ্টিগত দরকষাকষি, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের কাজ সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চান। তারা জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছ থেকে মেন্টরশিপ, আলোচনায় ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সর্বোপরি অর্থবহভাবে অবদান রাখার সুযোগ প্রত্যাশা করেন।

অবশ্য তরুণদেরও দায়িত্ব রয়েছে। নেতৃত্ব গড়ে ওঠে অঙ্গীকার, ধারাবাহিক শিক্ষা, সংলাপ ও সেবার মনোভাবের মাধ্যমে। যেসব তরুণ নেতার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, তারাও এ বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা, নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা এবং বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।

বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা দেশের ক্রমবর্ধমান এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ শ্রমশক্তিকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই সরকার ও বিভিন্ন শিল্পখাতে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে দেখছি। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও সেই পরিবর্তন সমানভাবে জরুরি। তরুণ নেতৃত্বে বিনিয়োগ করা শুধু ট্রেড ইউনিয়নের ভবিষ্যতের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্যও একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

এই আন্তর্জাতিক যুব দিবসে আমাদের চ্যালেঞ্জ তারুণ্যের উদযাপনের ঊর্ধ্বে গিয়ে তরুণদের ওপর আস্থা রাখা, প্রকৃত দায়িত্ব অর্পণ করা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কারণ ভবিষ্যতের কর্মজগত গড়ে তুলবে আজকের তরুণ শ্রমিকরাই। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগও তাদের প্রাপ্য।

 

ম্যাক্স তুনন: কান্ট্রি ডিরেক্টর, আইএলও বাংলাদেশ