বিশ্লেষণ

ইউটিউব-ফেসবুকে প্রকাশিত যেসব টক-শো কখনোই হয়নি

আবীর অয়ন

আপনি ইউটিউব স্ক্রল করছেন, হঠাৎ একটি স্প্লিট-স্ক্রিন ভিডিও সামনে এলো। শিরোনাম লেখা, ‘খালেদ মুহিউদ্দীনের টক শোতে মুখোমুখি শেখ হাসিনা বনাম ড. শফিকুর রহমান।’ দেখেই থেমে গেলেন। ভিডিওর থাম্বনেইলে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের পরিচিত গ্রাফিক্স, আর দুই পাশে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দুই ব্যক্তিত্ব। এক বিস্ফোরক, ঐতিহাসিক ঘটনা দেখার প্রত্যাশা নিয়ে ভিডিওটিতে ক্লিক করলেন।

আপনি একা নন। ঠিক এই ভিডিওটি দেখেছেন ৩ লাখ ৫২ হাজারের বেশি মানুষ। আর হাজারো দর্শক মন্তব্যের ঘরে ছুটে গিয়ে সেই কথিত বাকযুদ্ধ নিয়ে আবেগঘন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন।

কিন্তু এখানে আছে একটি বড় ফাঁক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এসব টক-শো বাস্তবে কখনোই হয়নি।

বিশ্লেষণ করা প্রায় ২০০টি এমন কনটেন্টে দেখা গেছে, পৃথক আর্কাইভ ফুটেজ জোড়া লাগিয়ে মুখোমুখি লাইভ বিতর্কের বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে পরিচিত টক-শো ও সাংবাদিকদের ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করে কৃত্রিম আলাপচারিতাকে বাস্তব টেলিভিশন বিতর্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

দর্শকদের বিভ্রান্ত করতে এসব ভুয়া ভিডিও তৈরি ও ছড়িয়ে দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অতি সাধারণ এডিটিং কৌশল, যা ‘চিপফেক’ নামে পরিচিত।

এসব ভুয়া টক-শো সমসাময়িক সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়কে পুঁজি করে ধর্মীয় বক্তা, রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের পুরোনো ফুটেজ, বক্তব্য ও মিডিয়া উপস্থিতি মিলিয়ে এমন লাইভ বিতর্কের মতো ভিডিও তৈরি করে, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি।

নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ড অনুসন্ধানের মাধ্যমে দ্য ডেইলি স্টার এ ধরনের কনটেন্ট প্রচারকারী কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে একটি ইউটিউব চ্যানেল ও একটি ফেসবুক পেজের বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। যেসব প্ল্যাটফর্ম অন্তত ৫০টি ভুয়া টক-শো তৈরি করেছে, সেগুলোকেই এই বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত কয়েক মাসে এই দুটি প্ল্যাটফর্ম অন্তত ১৭৩টি এ ধরনের ভিডিও তৈরি করেছে।

ইউটিউব চ্যানেল ‘রাজনৈতিক স্টুডিও’ এর মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করা এই চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। স্প্লিট-স্ক্রিন বিন্যাস, স্টুডিওসদৃশ পটভূমি ও সম্প্রচার গ্রাফিক্স ব্যবহার করে এই চ্যানেলটি নিজেদের উপস্থাপন করেছেন প্রচলিত রাজনৈতিক টক-শো ও সংবাদ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে।

চ্যানেলটির কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত এটি অন্তত ১১০টি ভুয়া ভিডিও প্রকাশ করেছে [, , , , ], যেগুলোর সম্মিলিত ভিউ ১ কোটি ২৩ লাখ।

চ্যানেলটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবিও প্রচার করে। এক ভিডিওতে ক্যাপশন দেওয়া হয়, ‘জেল থেকে বের হয়েই লাইভে হাসানুল হক ইনু’।

সেখানে পুরোনো ফুটেজ জুড়ে দিয়ে এমন ভিডিও বানানো হয়েছে, যেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমান সময়ে বসে ইনুর বক্তব্য শুনছেন। বাস্তবে, ২০২৪ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকে ইনু এখনো কারাগারেই আছেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কথিত মুক্তির বিষয়েও একই ধরনের বিভ্রান্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়েছে [, , , ]। অন্য কিছু ক্ষেত্রে ভিডিও এডিট করে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে কৃত্রিম কথোপকথনে যুক্ত করা হয়েছে [, , , ]।

চ্যানেলটির কনটেন্ট কৌশল মূলত আলোচিত ব্যক্তিত্বদের জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাকে অন্তত ৩৮টি ভিডিওতে দেখা গেছে [, , ]। শেখ হাসিনা রয়েছেন ২৪টি ভিডিওতে [, ]। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ১১ বার করে ব্যবহার করা হয়েছে [, , , ]।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী এ ধরনের কার্যক্রমকে আদর্শিক অবস্থাননির্ভর ‘কাট-পিস’ চ্যানেল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শকে সন্তুষ্ট করতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অসংশ্লিষ্ট ফুটেজ জুড়ে দেয়। যারা নিজেদের বিশ্বাসগত জায়গা থেকে এসব কনটেন্ট দেখেন, তারা সফলভাবেই এসব ভিডিওর প্রতি আকৃষ্ট হন।’

৩ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি অনুসারী থাকা ফেসবুক পেজ ‘বাংলা নিউজ২৪০’ এ ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার আরেকটি প্ল্যাটফর্ম। পেজটি এ পর্যন্ত অন্তত ৬৩টি ভুয়া টক-শো ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে মোট ৪ কোটি ৮০ লাখ ভিউ হয়েছে।

এসব ভিডিও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের ফুটেজ উপস্থাপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পৃথক ক্লিপ স্প্লিট-স্ক্রিনে সাজিয়ে লাইভ স্টুডিওর মতো করে দিয়ে ভিডিও তৈরি করা হয়।

এখানেও তারেক রহমানকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাকে অন্তত ৮টি ভিডিওতে দেখা গেছে [, ]। এছাড়া ডিজিটাল অ্যাকটিভিস্ট ইলিয়াস হোসেন ও পিনাকী ভট্টাচার্যকে ৭ বার করে উপস্থাপন করা হয়েছে [, , ]।

দ্য ডেইলি স্টার উভয় প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসব ভিডিওর মন্তব্য বিভাগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক দর্শক এসব ভিডিওকে বাস্তব সম্প্রচার বলে মনে করছেন। তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, যেন দেখানো কথোপকথনগুলো সত্যিই হচ্ছে এবং এসব কৃত্রিম আলোচনাকে কেন্দ্র করে তীব্র মতামত প্রকাশ করছেন [, , , ]।

সাইফুল আলমের মতে, দর্শকদের একটি বড় অংশ বুঝতেই পারেন না যে এসব ভিডিও বিকৃত ও এডিটেড।

তিনি বলেন, ‘এই প্রতারণা মোকাবিলায় স্কুল পর্যায় থেকেই মানুষের মিডিয়া ও তথ্যসচেতনতা বাড়াতে হবে।’

কেটে নেওয়া এবং নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত ফুটেজ ব্যবহার করে দর্শকদের বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে এসব কনটেন্ট মেটা ও ইউটিউবের নীতিমালা লঙ্ঘন করছে। তবে স্থানীয় বাস্তবতায় এসব নীতিমালা কার্যকর করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

সাইফুল আলম এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভাব ও প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকে দায়ী করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক দায়িত্ব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হলেও আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রণে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো নেই। বরং এসব শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কঠোর তদারকি ছাড়া নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যেতে ব্যাপক লবিং করে থাকে।’