লেবাননে ড্রোন হামলায় নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ ফিরেছে বাড়িতে

নিজস্ব সংবাদদাতা, সাতক্ষীরা

সংসারের অভাব ঘোচাতে ঋণ করে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম। পরিবারের স্বপ্ন ছিল—বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে বদলে দেবেন ভাগ্য।

কিন্তু সেখানে চলমান সংঘাতে এক ড্রোন হামলায় নিহত হন দুজন। নিহতের চার সপ্তাহ পর তাদের মরদেহ ফিরেছে বাড়িতে।

আজ রোববার সকাল সোয়া ১০টার দিকে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা-চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪৫) ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলামের (২১) মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়।

মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
ভালুকা-চাঁদপুর গ্রামে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আঙিনায় ভিড় করেছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

স্বামীর মরদেহ দেখে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে তিনি বিলাপ করছিলেন।

কাঁদতে কাঁদতে রুমা খাতুন বলেন, ‘সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল আমার স্বামী। ঋণ করে পাঠিয়েছি। এখন এই ঋণ কীভাবে শোধ করব? দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’

স্বামীর মৃত্যুর পর গত চার সপ্তাহ ধরে একদিকে সংসারের অনটন, অন্যদিকে মরদেহ ফেরার অপেক্ষা—এই দুই দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে তার। এখন সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

‘সচ্ছলতা আনতে গিয়েছিল, ফিরল লাশ হয়ে। মেয়েদের লেখাপড়া কীভাবে চালাব, জানি না,’ বলেন রুমা।

পাশেই দাঁড়িয়ে কান্না করছিলেন বড় মেয়ে তামান্না (১৭) ও ছোট মেয়ে তন্নি (১৫)। তাদের আকুতি, ‘আমরা কিছু চাই না, আমাদের বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

শফিকুলের স্ত্রী রুমা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে বারবার ডাকছিলেন। কখনো বিলাপ করছেন, কখনো নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। বাবা আফসার আলীর চোখেও ছিল অসহায়ত্বের ছাপ।

তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি, এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, আত্মীয়দের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সে লাশ হয়ে ফিরল।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, চলতি বছরের রোজার শুরুতে শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম লেবাননে যান। সেখানে একটি ফলের বাগানে কেয়ারটেকারের কাজ নেন। বিদেশে যেতে প্রত্যেকের প্রায় আট লাখ টাকা খরচ হয়, যার বড় অংশই ছিল ঋণ।

গত ১১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারা। এরপর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে শনিবার দিবাগত রাতে তাদের মরদেহ দেশে আনা হয়।

কাদাকাটি গ্রামেও ছিল একই রকম শোকের পরিবেশ। নাহিদুলের বাবা মো. আব্দুল কাদের ও মাতা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের মরদেহ সামনে রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা বলেন, ‘সংসারে সচ্ছলতা আনতেই অল্প বয়সে বিদেশে গিয়েছিল নাহিদুল। আমরা এখন কাকে নিয়ে বাঁচব, কীভাবে বাঁচব।’

ছবি: সংগৃহীত

ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

কাদাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপঙ্কর সরকার বলেন, ‘নাহিদুলের পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত। সরকারি সহায়তা না পেলে তারা বড় সংকটে পড়বে।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত জানান, শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে লেবানন থেকে মরদেহ দুটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহ পরিবহন ও দাফনের জন্য সরকারিভাবে ৩৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, জোহরের নামাজের পর নিজ নিজ গ্রামের মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।

অভাবের সংসার থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্নে বিভোর হয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন দুই তরুণ-প্রবীণ শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তারা ফিরে এলেন কেবল কাফনে মোড়া দুটি নিথর দেহ হয়ে।