ডিহাইড্রেশন হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে?

শবনম জাবীন চৌধুরী

আপনার পানি পিপাসা পেয়েছে, অর্থাৎ আপনার শরীরে সঠিক পরিমাণে পানির সরবরাহ নেই। ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা বলতে শরীরে পর্যাপ্ত পানির অভাবকে বোঝায় । যখন আমাদের শরীরে পানি গ্রহণের তুলনায় দেহ থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার হার বেড়ে যায়, তখন পানিশূন্যতা দেখা দেয়।

এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ সমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে কর্মরত পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল। তিনি বলেন, ‘শরীরের ভেতরের ভারসাম্যটাই আসল। গরমে শুধু বাইরে ঠান্ডা থাকলেই হবে না, ভেতর থেকেও ঠান্ডা থাকা জরুরি। তাই খাবার খাওয়ার সময় সচেতন থাকতে হবে, পানি পানের পরিমাণ ঠিক রাখা ও জীবনযাত্রায় আনতে হবে সামান্য সচেতনতা। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোই তীব্র গরমের দিনেও আপনাকে রাখবে স্বস্তিতে, প্রাণবন্ত ও সুস্থ।’

কখন ডিহাইড্রেশন হয়

শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে স্বাভাবিক কাজগুলোতে বিঘ্ন ঘটে। গ্রীষ্মের তপ্ত দিনগুলোতে যখন শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ঘাম বেরিয়ে যায় বা জ্বর, ডায়রিয়া ও বমির ফলে ডিহাইড্রেশন দেখা যায়। এছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করলে বা এমন ধরনের ওষুধ সেবন করলে যার ফলে বারবার প্রস্রাব হয়—এসব কারণেও পানিশূন্যতা দেখা দেয়।

পানি আমাদের শরীরে কী কাজে লাগে

আমাদের শরীরের ৭৮ শতাংশ হচ্ছে পানি। ব্রেইন ও হার্টে পানির পরিমাণ ৭৩ শতাংশ। হাড়ে ৩১ শতাংশ এবং পেশী ও কিডনিতে রয়েছে ৭৯ শতাংশ। আর ত্বক ও ফুসফুসে রয়েছে যথাক্রমে ৬৪ ও ৮৩ শতাংশ। আমাদের শরীরের প্রধান প্রধান কাজগুলো করতে পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যেমন: হজম, রেচন, হাড়ের জোড়াগুলোকে নমনীয় রাখতে, লালা তৈরি, শরীরের অভ্যন্তরের বিভিন্ন ভারসাম্য বজায় রাখতে, অক্সিজেনের সরবরাহ, হাড় ও অঙ্গগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও অন্তঃসত্ত্বাকালীন শিশুর ব্রেইন, স্পাইনাল কর্ড ও ফিটাসকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে।

ডিহাইড্রেশন হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে

শরীরে পানির অভাব বা ডিহাইড্রেশন হলে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। শিশুদের ও বড়দের ক্ষেত্রে এই লক্ষণের কিছু ভিন্নতা রয়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার লক্ষণ

  • শুষ্ক ঠোঁট ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া।
  • কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি না আসা।
  • কম প্রস্রাব করা বা প্রস্রাবের সময় অল্প পরিমাণে মূত্রত্যাগ করা। প্রস্রাবের রঙ হলদেটে বা গাঢ় হলুদ রঙের হওয়া।
  • মাথার তালু হালকা ভেতরের দিকে বসে যাওয়া।
  • চোখ বসে যাওয়া।
  • শুষ্ক, খসখসে ও কুঁচকে যাওয়া ত্বক।
  • দ্রুত ও জোরে জোরে শ্বাস নেওয়া।
  • হাত-পায়ে ঠান্ডার অনুভূতি।
  • ক্লান্তিবোধ ও অতিরিক্ত ঘুম

বড়দের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার লক্ষণ

  • ঘন ঘন পিপাসা পাওয়া। অনেক সময় পিপাসা না পেলেও শরীর ভেতর থেকে শুকিয়ে যেতে পারে।
  • প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা কমলা হয়ে যাওয়া পানিশূন্যতার প্রধান লক্ষণ।
  • মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া। মুখ আঠালো বা শুকনো অনুভূত হওয়া।
  • সারাক্ষণ ক্লান্ত বা মাথা ঝিমঝিম করা ও দুর্বলতা।
  • ঘন ঘন মাথাব্যথা হওয়া, কথাবার্তায় অসংলগ্নতা বা বিভ্রান্তি।
  • ত্বক তার স্বাভাবিক নমনীয়তা বা উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে এবং শুষ্ক হয়ে পড়ে।
  • ত্বকে লালচে ভাব।
  • হাত-পায়ের পেশিতে টান লাগা বা ব্যথা হওয়া।
  • দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাবের বেগ না আসা বা অল্প প্রস্রাব হওয়া।
  • ক্লান্তি বা অবসাদ।
  • ঘুমঘুম ভাব।
  • হার্টবিট বেশি কিন্তু রক্তচাপ কম।
  • ক্ষুধামন্দা কিন্তু মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা।
  • পা ফুলে যাওয়া।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য।

কাদের ডিহাইড্রেশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে

পর্যাপ্ত পানি পান না করলে যে কারোরই পানিশূন্যতা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে শিশু ও বয়স্কদের (৬৫ বছর বা অধিক বয়সী) এই ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ শিশুরা পানি পিপাসা পেলে সেভাবে করে সেটা সবসময় প্রকাশ করতে পারে না এবং অসুস্থ থাকলে সেটি আরও বেশি প্রকট হয়ে যায়। আর বয়স্কদের শরীরে সাধারণত পানির পরিমাণ কম থাকে এবং পানি পিপাসা পেলে তারা সেটা সবসময় অনুভব করতে পারেন না। তাই শিশু ও বয়স্কদের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পানের বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরি।

ডিহাইড্রেশন হলে যেসব শারীরিক জটিলতা হতে পারে

শরীরে পানিশূন্যতার মাত্রা বেড়ে গেলে কিছু শারীরিক জটিলতা তৈরি হয় এবং সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন  হওয়া জরুরি। জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স
  • হিট স্ট্রোক
  • কিডনিতে পাথর বা কিডনি ফেইলিওর

পানিশূন্যতা রোধে করণীয়

দৈনিক ২ থেকে আড়াই লিটার পানি পান করতে হবে। শুধু পানি পিপাসা পেলেই নয়, বারে বারে পানি পান করতে হবে। নিয়মিত পানি পানের অভ্যাস করতে হবে। ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে গ্রহণ করা যায়। এ ছাড়া শসা, লাউ, ডাব, টক দই হলো বেস্ট কুলিং ফুড।