ইরানের ‘পানি অস্ত্র’ ব্যবহারের হুমকিতেই কি পিছিয়ে গেলেন ট্রাম্প
‘সবার জন্য হরমুজ খুলে না দিলে’ ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ার ‘চরম বার্তা’ দিয়েছিলেন মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময়ও বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় পার হওয়ার আগেই অর্থাৎ, গত ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যেন বিশ্ববাসীকে শোনালেন ‘আশার বাণী’।
শত্রু-মিত্র সবাইকে বিস্মিত করে ট্রাম্প জানালেন, ইরানকে আরও ৫ দিন সময় দেওয়ার কথা।
ট্রাম্পের এমন ‘হামলা-বিরতি’র পরপরই শুরু হয়ে যায় আলোচনা-বিশ্লেষণ।
কেন ট্রাম্প এমনভাবে ‘পিছিয়ে’ গেলেন এবং কোন ভাবনা থেকে তিনি এমন ‘বিরতির’ পথে হাঁটলেন—তা নিয়েও সমরবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত প্রকাশের বিস্তর আয়োজন দেখা গেল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয়।
তবে সব বিশ্লেষকের মুখে যে বিষয়টি বেশি বেশি শোনা গেল তা হচ্ছে—ট্রাম্পের হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারগুলো ধ্বংসের হুমকি দেওয়ায় পরিস্থিতি অনেকটাই পালটে যায়। যে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করার আশায় ইরানের ‘সবকিছু ধ্বংস’ করে দেওয়ার প্রত্যয় প্রকাশ করেছিলেন, এখন তিনিই ইরানকে সঙ্গে নিয়ে হরমুজ ‘পাহারা’র প্রস্তাব দিচ্ছেন।
পানি ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই মহাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ‘শীতল যুদ্ধ’ নামে এক চরম সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক রেষারেষি শুরু হয়। এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এই দেশ দুইটি সামরিক দিক থেকেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে অভাবনীয় মারণাস্ত্র তৈরির পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে।
এরপর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলেও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা এখনো সবার মনে। তিন দশকের বেশি সময় পরও কোথাও কোনো যুদ্ধে কোনো পরাশক্তি দেশ জড়িয়ে গেলেই নতুন মহাযুদ্ধের ভয় জেগে উঠে শান্তিবাদী মানুষদের মনে।
১৯৯৫ সালে একটি কথা বেশ ছড়িয়ে পড়ে। তা হলো—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। সেসময় মিশরীয় অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সিরাজ আলদ্বীন বলেছিলেন, ‘এই শতাব্দী তেল নিয়ে যুদ্ধ করলেও, পরবর্তী শতাব্দীতে যুদ্ধ হবে পানিকে কেন্দ্র করে—যদি না আমরা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই।’
এর ঠিক ১০ বছর আগে, অপর মিশরীয় রাজনীতিক ও কূটনীতিক বুট্রোস বুট্রোস ঘালি বলেছিলেন—‘মধ্যপ্রাচ্যে পরবর্তী যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়।’
বুট্রোস ঘালি ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এরপর জাতিসংঘের অপর মহাসচিব এবং দক্ষিণ কোরীয় রাজনীতিক ও কূটনীতিক বান কি মুন পরবর্তী যুদ্ধ-সংঘাতের সঙ্গে পানিকে যুক্ত করেন।
এ ছাড়াও, ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক ব্রহ্ম চেল্লানিও পানির সঙ্গে আগামী যুদ্ধের সংযোগ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ আলোচিত হয়েছেন।
তাই দীর্ঘ ৪ দশক ধরে পানির সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা অনেকটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
মরুর দেশে পানির গুরুত্ব
গত ২২ মার্চ তথা চলমান ইরান যুদ্ধের ২৩তম দিনে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—পানি নতুন যুদ্ধের ভয়াবহ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারিত হচ্ছে।
জেনেভায় ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আচমকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এই উপসাগরীয় দেশটিতে হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অন্যান্য শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করে।
এরপরও ইরানের বর্তমান শাসকদের পতন ও দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ক্রমাগত রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয় প্রায় ৪ সপ্তাহ ধরে গণবিধ্বংসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অপ্রত্যাশিত হামলার পর ইরান প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোর নানান স্থাপনায় হামলা শুরু করে।
মধ্যপ্রাচ্যের ৬ আরব রাজা-শাসিত রাষ্ট্র অঢেল তেল-গ্যাসের মালিক হলেও মরু ভূমির দেশ হওয়ায় তারা ভীষণভাবে পানীয় জলের সংকটে আছে।
ফরাসি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশসনের ২০২২ সালের তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—আরব আমিরাতের মোট খাওয়ার পানির চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশ সাগরের নোনা পানি পরিশোধন করে মেটানো হয়।
এ ছাড়াও, পানি শোধনাগারের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা প্রায় ৭০ শতাংশ, ওমানের প্রায় ৮৬ শতাংশ ও কুয়েতের নির্ভরতা প্রায় ৯০ শতাংশ।
ভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়—সাগরের পানি শোধনাগারের ওপর ধনী দেশ কাতারের নির্ভরতা প্রায় ৯৯ শতাংশ ও বাহরাইনের নির্ভরতা প্রায় ৯০ শতাংশ।
ন্যাচার সাময়িকীর এক গবেষণার বরাত দিয়ে এএফপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—সারা বিশ্বে মোট পানি পরিশোধনাগারের প্রায় ৪২ শতাংশের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে।
চলতি মার্চের শুরুতে প্রখ্যাত ফরাসি পানি-বিশেষজ্ঞ এসথার ক্রাউসার-দেলবুর্গ বার্তা সংস্থাটিকে বলেন, ‘ওখানে (মধ্যপ্রাচ্য) পরিশোধিত পানি না থাকলে কোনোকিছুই টিকবে না।’
অনেক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এসব পানি শোধনাগারগুলোয় প্রতিশোধমূলক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মহাকাব্যিক ক্রোধে’ পানি ঢেলে দিয়েছে। তাকে যেন ইরানের ‘সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি থেকে ‘সরে আসতে’ বাধ্য করেছে।
ইরানের ‘পানি অস্ত্র’
চলমান ইরান যুদ্ধে ইতোমধ্যে পানি শোধনাগারে হামলার সংবাদ পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত ৮ মার্চ পারস্য উপসাগরে খনিজসমৃদ্ধ দ্বীপ দেশ বাহরাইনের এক পানি পরিশোধনাগারে প্রতিবেশী ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন।
তবে সেই হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এর একদিন আগে ইরানের বিপ্লবী বাহিনী অভিযোগ করে যে, বাহরাইনের একটি মার্কিন ঘাঁটি থেকে পারস্য উপসাগরে ইরানের কাশেম দ্বীপের এক পানি পরিশোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে।
ইরানের জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলি-আবাদির দাবি, মার্কিন হামলায় ‘পানি পরিশোধনাগার ও সরবরাহ ব্যবস্থার আংশিক ক্ষতি হয়েছে’।
এএফপির প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—২০১০ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সতর্ক করে বলেছিল যে, আরব দেশগুলোর পানি পরিশোধনাগারগুলো কোনো কারণে সমস্যায় পড়লে ‘বড় বিপর্যয়’ নেমে আসবে।
বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য: বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে পানি পাওয়া যায় বৈশ্বিক গড়েরও ১০ গুণ কম। তাই মধ্যপ্রাচ্যের জীবন ও অর্থনীতি মূলত পানীয় জলের ওপর নির্ভরশীল।
গত ২৩ মার্চ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন রাখা হয়, কেন পানি পরিশোধনাগারগুলোকে হামলার লক্ষ্য করা হচ্ছে?
জবাবে বলা হয়—ইরানের প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর পানি পরিশোধনাগারগুলো পারস্য উপসাগরের তীর ধরে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে সেগুলো ইরানের উপকূলের বেশ কাছে। সর্বনিম্ন প্রায় ৩০ কিলোমিটার—অনেকটা ঢিল ছোড়া দূরত্ব। সেসব পরিশোধনাগারগুলোকে ইরান সহজেই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারবে।
মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলোর পানি পরিশোধনাগারগুলোয় হামলা চালিয়ে ইরান সহজেই চলমান যুদ্ধের মোড় ঘুড়িয়ে দিতে পারবে জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—শুষ্ক আরব দেশগুলো পানীয় জলের অভাবে পড়লে পুরো অঞ্চলে হাহাকার পড়ে যাবে।
অনেক বিশেষজ্ঞের বিশ্বাস—এমনটি ঘটলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর প্রতিটি মানুষের ওপর সরাসরি পড়বে। আরব দেশগুলোর শিল্পকারখানাগুলো মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যাবে। দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ তেল-গ্যাসশিল্পও মুখ থুবড়ে পড়বে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে পানি পরিশোধনাগারগুলোয় হামলা চালানো হয় না। কিন্তু, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় ইরান যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও পানি পরিশোধনকেন্দ্রগুলোয় হামলা চালায় তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘অপূরণীয়’ ক্ষতি হয়ে যাবে। দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে পুরো অঞ্চল।
কারও কারও মতে, ট্রাম্প ইরানের ‘স্পর্শকাতর’ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে যেন ‘নিজেই নিজের ফাঁদে ধরা পড়েছেন’। তাই ট্রাম্পকেই ‘পিছ পা’ হতে হলো ইরানে ৫ দিন হামলা না চালানোর ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে।
তবে গতকাল ২৩ মার্চ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে—‘ট্রাম্পের এই কালক্ষেপণ তার যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ’।
তাহলে, ইরানের ‘পানি অস্ত্র’ ব্যবহারের হুমকিতেই কি ট্রাম্প অন্তত ৫ দিনের জন্য হলেও যুদ্ধ পিছিয়ে দিলেন?




