ইরান কি ভেঙে যাবে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সব আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে ইরানে দ্বিতীয়বারের মতো যুগপৎ হামলা চালিয়েছে মহাক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র ও এর প্রধান মিত্র ইসরায়েল।

এবারের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর এখন অনেকের মনে প্রশ্ন—প্রাচীন সভ্যতার এই দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা পাবে তো?

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইরানের নির্বাসিত ‘যুবরাজ’ রেজা পাহলভি নিজের ওয়েবসাইটে ইরানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য নিজ দেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন—‘ইরানের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো আপোস হবে না। আমরা ইরানের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বো না।’

তার ভাষ্য, ইরানের ভৌগোলিক বিভাজন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যাবে না। যেসব ব্যক্তি বা দল ইরানের অখণ্ডতা নষ্ট করতে কাজ করবে, এমনকি যারা এ কাজে সমর্থন দেবে তাদেরকে ইরানের জনগণ কঠোর হাতে প্রতিরোধ করবে।

 

একই ভাষ্য ইরানের বর্তমান শাসকদেরও।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামির বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়—ইরানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে সশস্ত্র বাহিনী ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত’ লড়াই করে যাবে।
এ কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে আজ থেকে ঠিক ৪৭ বছর আগে ইরানের জনগণের প্রবল আন্দোলনে দেশছাড়া হয়েছিলেন ইরানের সম্রাট রেজা শাহ পাহলভি। সেসময় যুবরাজ রেজা পাহলভি এক প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।

Army Chief Vows Iran’s Harsh Response to US - Politics news
সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। ছবি: সংগৃহীত

 

ইরানের সেই সাবেক রাজার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তাঁবেদারির পাশাপাশি নিজ দেশের জনগণের ওপর সীমাহীন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।

ইরান-সম্রাট রেজা শাহ পাহলভির দেশ পালানোর পর যারা ক্ষমতায় আসেন তাদের বিরুদ্ধেও আছে জন-নির্যাতনের অভিযোগ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করায় ইরানের বিপ্লব-পরবর্তী শাসকরা সারা বিশ্বে ‘প্রতিরোধের প্রধান মুখ’ হয়ে উঠে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রর হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার সংবাদে ইরানে খামেনিপন্থিদের শোকের পাশাপাশি ও পাহলভিপন্থিদের উল্লাসের ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে। এমন বাস্তবতায় দুই পক্ষই ইরানের অখণ্ডতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তবুও যেন প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গকিলোমিটারের দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। আর তাই যেন এ নিয়ে সব পক্ষই সরব।

ইরানের ‘দুর্বলতা’

বছর পাঁচেক আগে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছিল—‘ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা একটি অলীক কল্পনা’। প্রতিবেদনটিতে এর নানাবিধ কারণও তুলে ধরা হয়।

ইরানের সম্ভাব্য ভেঙে পড়াকে ‘বলকানাইজেশন’ বা ‘বলকানীকরণ’ হিসেবে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিভাষাটির মাধ্যমে ইউরোপের বলকান অঞ্চলে সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে সাত দেশের জন্ম নেওয়াকে বোঝানো হয়।

Balkanization' and What We can Learn from History | by Blaise Webster |  Medium
বলকানাইজেশনের আগে অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার মানচিত্র। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

 

প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে এখনো পর্যন্ত সরকারবিরোধী যত বিক্ষোভ দেখা গেছে সেগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক। তেহরানের শাসকদের বিরুদ্ধে দেশটির জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা খুবই কম। অধিকাংশ ইরানি ‘এক পতাকা’র নিচে থাকার মানসিকতা নিয়ে চলেন। তারা তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে চান।

তবে সেই প্রতিবেদনটিতে ইরানের জাতিগত ‘বিভেদের’ চিত্রও তুলে ধরা হয়।

ইরানে প্রধান জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে আছে আজেরি, কুর্দি, আরব ও বেলুচ। প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখের দেশ ইরানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের কাছাকাছি।

প্রতিবেদন অনুসারে—এসব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় বসবাস করলেও তারা যেকোনো সময় দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এসব জাতিগোষ্ঠীর প্রতি দীর্ঘদিন ধরে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে বৈষম্য’ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আছে। তাদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপর সরকারি ভাষা ফারসির সীমাহীন প্রভাব ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে বলেও বলা হয়ে থাকে।

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার কথা ইরানের সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও বহু বছর ধরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে জন-দাবি আছে।

ইরানে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ শিয়া মতবাদের হলেও বাকি ১০ শতাংশের কম সুন্নি মতাদর্শের মানুষদের নিয়ে দেশটিতে ধর্মীয় উত্তেজনা আছে। আছে স্বাধীন রাষ্ট্রের আশায় সশস্ত্র আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস।

গত ১৮ জানুয়ারি ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইরানকে ‘বলকানের’ মতো ভেঙে ফেলার ‘কৌশলগত ভ্রান্তি’ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন ভাবনা রাখা সত্ত্বে ইরানকে টুকরো করা হলেও সেই দেশ দুইটির সঙ্গে তেহরানের সমস্যা দূর হবে না।

কেননা, বলকান অঞ্চলে বাইরের শক্তির আগ্রাসন ছিল না। সেই অঞ্চলের জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদের আত্মপরিচয়ে জেগে ওঠায় নতুন নতুন দেশের জন্ম হয়। ইরানের জাতিগত বৈচিত্র্য ঐতিহাসিক। সেটি কোনো কাঠামোগত ত্রুটি নয় যে একটু সুযোগ পেলেই ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ, আধুনিক ইরানের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে থাকা ‘অ-ইরানি’ বা ‘অ-পারসি’ জাতিগুলো আবহমান কাল থেকে ইরানি সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ, বলে প্রতিবেদনটিতে জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে, ইতিহাসের বরাত দিয়ে রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে বলেন—যুগোস্লাভিয়ার শীর্ষ নেতা মার্শাল টিটোর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলকানের সেই ‘এক দেহে লীন’ বহু জাতিক শিল্পসমৃদ্ধ দেশটির ঐক্য বজায় রাখতে আজকের ইরানের ‘একতা’র মতোই বয়ান তুলে ধরা হতো। টিটোর মৃত্যুর ঠিক এক দশকের মাথায় তথা ১৯৯১ সাল থেকে ধীরে ধীরে এক দেশ ভেঙে সাত দেশের জন্ম হতে দেখেছিল বিশ্ববাসী।

তাই, ইরানের ‘বলকানীকরণের’ বা দেশটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার বিষয়ে আজকের ‘কৌশলগত ভ্রান্তি’ নিকট ভবিষ্যতে যে নিছক বাস্তবতার রূপ নেবে না তা কেই বা নিশ্চিত করে বলতে পারেন।

তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে সেই ‘কল্পনাকে বাস্তবের রূপ দিতে গেলে অনেক ঝুঁকি আছে’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে—ইরানকে অস্থিতিশীল করে তোলা হলে সেই অস্থিরতা দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। অর্থাৎ, ইরানের উত্তর-সীমানার ককেশাস, পশ্চিম ও দক্ষিণে উপসাগরীয় এলাকা, উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে মধ্য এশিয়াসহ পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে।

তাই ইরানকে ভেঙে ফেলার আগে বিশ্বশক্তিগুলোকে অনেক হিসাব করতে হবে বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

ইরানে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন

ইরানের পুব থেকে পশ্চিমে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোয় জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষদের মধ্যে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন বেশ জোরালো। বিশেষ করে, ইরানের পশ্চিম সীমান্তে কুর্দি-অধ্যুষিত ‘পূর্ব কুর্দিস্তানে’ ‍ও পুবে বেলুচ-অধ্যুষিত সিস্তান-বেলুচিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের সংবাদ প্রায়শই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়।

Iran map
ইরানের মানচিত্র। ছবি: সংগৃহীত

 

এ ছাড়াও, ইরানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ পারসি হলেও আজেরিদের সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। বৃহত্তম জনগোষ্ঠী পারসিদের সঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী আজেরিদের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের।

আবার, ইরানে থাকা আরব জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে অনারব পারসিকদের সংঘাত ‘ঐতিহাসিক’।

গত বছর ১৯ জুন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—ইরান অশান্ত হলে সীমান্তে সশস্ত্র হামলা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা পাকিস্তানের।

সে বছর জুনের শুরুতে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ইরানে হামলা চালিয়েছিল। রয়টার্সের সেই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল—ইরানের শাসকদের পতন হলে এর সুযোগ নেবে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে থাকা পাকিস্তান ও ইরানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
এ কথা সবাই জানেন যে, বেলুচ জাতিগোষ্ঠী ইরান ও পাকিস্তানে বিভক্ত হয়ে আছে। দুই দেশেই স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠনের জন্য সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। জইশ আল-আদল এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম।

সুন্নি সশস্ত্র সংগঠন জইশ আল-আদল এর লোগো। ছবি: সংগৃহীত

 

এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী সিস্তান-বেলুচিস্তানে ইরানের সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে ইরানি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত।

গত বছর ১২ ডিসেম্বর গ্রাগভিত্তিক মার্কিন সহায়তা-পুষ্ট রেডিও ফ্রি ইউরোপ-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—ইরানে বিস্তৃত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী জইশ আল-আদল নতুন রূপে হাজির হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়—সুন্নি সশস্ত্র সংগঠন জইশ আল-আদল বলেছে যে তারা ছোট ছোট বেলুচ আধা-সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে একটি নতুন জোট গঠন করেছে। তাদের লক্ষ্য ইরানের ‘নিপীড়ক’ শাসকদের ওপর হামলা চালানো।

ইরানে মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ বেলুচ জাতিগোষ্ঠীর হলেও তারা দেশটির সিস্তান-বেলুচিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই প্রদেশটি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের সীমান্তবর্তী। এই দুই দেশের সীমানা লাগোয়া দুই প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সক্রিয়।

গত ১৬ জানুয়ারি বার্তা সংস্থা এপির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়—প্রতিবেশী ইরাকে আশ্রয় নেওয়া ইরানের কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় দেশটির আধা-সামরিক বিপ্লবী গার্ডের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

 

এর দুইদিন আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়—সশস্ত্র কুর্দি সংগঠনগুলো সীমান্তবর্তী ইরাক থেকে ইরানে ঢোকার সুযোগ খুঁজছে। প্রতিবেদনটিতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও তুরস্কের গোয়েন্দা বিভাগের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত শতাংশ কুর্দি হলেও এই জাতিগোষ্ঠী দেশটির অন্তত চারটি প্রদেশে সংখ্যাগুরু। ইরাক-তুরস্ক-সিরিয়ার কুর্দিদের মতো ইরানের কুর্দিরাও বহু বছর ধরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে আসছে।

গত ১ মার্চ তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু আজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ইরাকে আশ্রয় নেওয়া ইরানের কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির (পিএকে) অভিযোগ ইরাকে গোষ্ঠীটির সদরদপ্তরে ইরানের বিপ্লবী গার্ড হামলা চালিয়েছে। এতে আরও বলা হয় যে, পিএকে-কে ইরান সরকার সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা দিয়েছে।

ইরানে শীর্ষ কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে পিএকে অন্যতম।

এ ছাড়াও—তুরস্ক, ইরাক, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান লাগোয়া ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আজেরি জাতিগোষ্ঠীর ভেতর বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনা দীর্ঘদিনের। আজেরিরা তুর্কি ভাষা ও জাতিসত্তার মানুষ। তারা অ-ইরানি এবং তুর্কি জাতিরাষ্ট্র তুরস্ক ও আজেরি জাতিরাষ্ট্র আজারবাইজানের সঙ্গে বেশি মিল খুঁজে পায়।

Ethno-religious Distribution in Iran's Provinces Source: Minority groups from CIA 2004 "Iran Country Profile" Iran map.  
ইরানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস। ছবি: সংগৃহীত

 

আজেরিরা ইরানের ভেতর চারটি প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা দীর্ঘদিন ধরে সেসব প্রদেশ একত্র করে ‘দক্ষিণ আজারবাইজান’ নাম দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করে আসছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত আলি খামেনি বাবার দিক থেকে আজেরি বংশোদ্ভূত।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ইরানে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী আজেরিদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা-বোধ কমানোর জন্য ১৯৮৯ সালে আলি খামেনিকে অনেক নিয়ম ডেঙিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা করা হয়েছিল। তাকে সর্বোচ্চ নেতা বানানোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ পারসিদের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলেও সেই সময় সংবাদ বিশ্লেষণগুলোয় বলা হয়েছিল।

এ কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে—তেল আবিবের পক্ষ থেকে বহুবার জানানো হয়েছে যে ইরানে প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে ইসরায়েলের ‘পূর্ণ সমর্থন’ আছে।

আবার ফিরে আসা যাক ইরানের সেই নির্বাসিত ‘যুবরাজে’র কথায়।

গত ১ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ এক মতামতে রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেছেন যে ইরানি জনগণের স্বাধীনতা তাদের হাতের কাছে চলে এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে এটাও বলেছেন যে, ‘ইরান ইরাক নয়’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরাকে যেসব ভুল হয়েছিল তারা তা করবেন না।

বিশ্ববাসী দেখেছে মার্কিন হামলা ও শাসন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের ফলে ইরাকের কী পরিণতি হয়েছে। কিভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় খনিজসমৃদ্ধ দেশটি। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নানাবিধ দ্বন্দ্বের কারণে সেখানে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি।

এখন দেখা যাক, ইরানের ভাগ্যে কী ঘটে।