এক্সপ্লেইনার

বিক্রি হচ্ছে স্পেসএক্সের শেয়ার, কিনতে পারবেন যারা, ঝুঁকি কতটুকু

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের শেয়ার বাজারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে আগামী ১২ জুন। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মহাকাশযান প্রস্তুতকারক, মহাকাশ উৎক্ষেপণ ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স তাদের শেয়ারের একটি অংশ সাধারণ মানুষের জন্য ছেড়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেক্সাসের এই কোম্পানির কোনো শেয়ার বর্তমানে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত নেই। তবে, প্রাথমিক প্রস্তাবে সাধারণ স্টকের ৫৫ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৫টি শেয়ার প্রতিটি ১৩৫ ডলার মূল্যে বিক্রির কথা জানিয়েছে স্পেসএক্স।

প্রাথমিক প্রস্তাবে দুই ধরনের সাধারণ শেয়ারের কথা জানিয়েছে স্পেসএক্স। 'ক্লাস এ' পর্যায়ের প্রতিটি শেয়ারের মালিক শেয়ার প্রতি একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকারী হবেন। 'ক্লাস বি' পর্যায়ের প্রতিটি শেয়ারের মালিক শেয়ার প্রতি ১০টি ভোট দিতে পারবেন।

কেন বাজারে শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা

বিবিসি জানিয়েছে, আগামী ১২ জুন প্রথমবারের মতো শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের পাবলিক শেয়ারের লেনদেন শুরু হবে।

এর লক্ষ্য বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা। স্পেসএক্সের প্রাথমিক লক্ষ্য বাজারে কোম্পানিটির ৫৫৫ মিলিয়ন শেয়ার প্রতিটি ১৩৫ ডলারে বিক্রি করে অন্তত ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা।

এই অর্থ দিয়ে স্পেসএক্সের বর্তমান কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং সেইসঙ্গে নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছেন মাস্ক। তার পরিকল্পনার মধ্যে আছে—গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণ, মঙ্গল গ্রহে কলোনি তৈরি, মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার স্থাপন।

ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ ৮২৫ বিলিয়ন ডলার। আর তার প্রতিষ্ঠিত স্পেসএক্সের আর্থিক মূল্যমান রেটিং প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টারের মতে ৭৮০ বিলিয়ন ডলার।

গত মাসে স্পেসএক্সের জমা দেওয়া করা আইপিও বিবরণী অনুযায়ী, ইলন মাস্কের হাতে আছে কোম্পানিটির শেয়ারের ৪২ শতাংশ বা প্রতিটি ৮ দশমিক ৩৯ ডলার মূল্যের ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন শেয়ার।

কিন্তু শেয়ারের দাম বাড়ানোর ফলে কোম্পানিটির মূল্য দাঁড়াবে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ইলন মাস্ক হবেন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার।

যেভাবে কেনা যাবে স্পেসএক্সের শেয়ার

শেয়ার তালিকাভুক্ত হয়ে যাওয়ার পর যেকোনো সময় তা কেনা যাবে। এককভাবে শেয়ার কিনতে চাইলে এমন কোনো প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে যারা স্পেসএক্সের শেয়ারের ব্রোকার হিসেবে কাজ করছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেসএক্সের পাবলিক শেয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নিউইয়র্ক সিটির নাসড্যাক শেয়ার বাজারের তালিকাভুক্ত হবে।

spacex
ছবি: এআই

নাসডাকসহ কিছু শেয়ার বাজারে সম্প্রতি এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যার ফলে শেয়ার বাজারের অন্তর্ভুক্ত বিনিয়োগকারীরা সরাসরি চেষ্টা না করলেও, শেষ পর্যন্ত হয়তো স্পেসএক্সের সামান্য অংশের মালিক হয়ে যেতে পারেন।

যুক্তরাজ্যে কয়েকটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের স্পেসএক্সের শেয়ার আছে। এর মধ্যে রয়েছে এডিনবরা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও বেইলি গিফোর্ড ইউএস গ্রোথ।

এছাড়া, যুক্তরাজ্যের এজে বেল, হারগ্রিভস ল্যান্সডাউন তাদের গ্রাহকদের স্পেসএক্সের শেয়ার কেনার সুযোগ দিচ্ছে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন ব্রোকারেজ প্ল্যাটফর্ম চার্লস সোয়াব, ফিডেলিটি, রবিনহুড, সোফাই টেকনোলজিস ও মরগান স্ট্যানলির ই-ট্রেডের মাধ্যমেও স্পেসএক্সের শেয়ার কেনা যাবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে আগামী ১১ জুন শেয়ারের অফিসিয়াল দাম নির্ধারণ করা হবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বেস্টইনভেস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেসন হল্যান্ডস বলেন, ‘সাধারণত, যুক্তরাজ্যের ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্কিন শেয়ার বাজারে ঢোকা বেশ কঠিন। কিন্তু বেশ কয়েকটি ব্রোকার ও ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম স্পেসএক্সের আইপিও কেনার সুযোগ দিচ্ছে। গ্রাহকদের চাহিদা এবং এটি যে বড় একটি সুযোগ তা টের পেয়েছে তারা।’

তিনি জানান, এসব প্ল্যাটফর্মের সর্বনিম্ন সাবস্ক্রিপশন সাধারণত এক হাজার পাউন্ড হতে পারে এবং আবেদনের সময়সীমা আগামী বুধবার শেষ হবে।

শেয়ার বণ্টন

গার্ডিয়ান বলছে, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শেয়ার যদি শেষ পর্যন্ত না থাকে, তা ভেবে বণ্টন পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

এমন হতে পারে যে অনেকে সমান সংখ্যক শেয়ার পাবেন, অথবা কে কত বিনিয়োগ করতে চান সেই অনুযায়ী বণ্টন করা হতে পারে।

আবেদন অনেক বেশি হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত কিছু বিনিয়োগকারী হয়তো কিছুই পাবেন না।

এজে বেলের মার্কেট ব্যবস্থাপনার প্রধান ড্যান কোটসওয়ার্থ বলেন, ‘ধরা যাক কেউ ৫ হাজার পাউন্ড কিংবা সাড়ে ৬ হাজার ডলারের শেয়ারের জন্য আবেদন করলেন। তারা হয়তো প্রথম ১ হাজার ডলার বা পাউন্ড মূল্যের শেয়ার পুরোটা বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু বাকি অর্থের ওপর হয়ত তাদের নির্দিষ্ট শতাংশের শেয়ার দেওয়া হতে পারে। আবেদনগুলোর জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম এখন পর্যন্ত নেই।’

মাস্কের শেয়ারের কী হবে

বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে স্পেসএক্সের শেয়ার কিনে হয়ত অনেকে ভাবতে পারেন যে প্রতিষ্ঠানটির নীতি-নির্ধারণীতে থাকার সুযোগ হবে। কিন্তু সত্য হলো বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও স্পেসএক্স কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মাস্ক তার নিজের শেয়ার বিক্রি করছেন না এবং কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারদের মোট ভোটের ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ নিজের কাছেই রাখছেন।

এই শেয়ার কিনে কতটা লাভ কতটা ঝুঁকি

প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগকারীরা আশা করবেন, স্পেসএক্সের শেয়ার কেনার পর দাম হয়তো এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু শেয়ারের দাম যেমন বাড়তে পারে, তেমনি কমতেও পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্পেসএক্সের মতো কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের কার্যক্রমের দিকে বেশি মনোযোগী থাকে। তারা এটাও জানে না যে, শেয়ারের লেনদেন শুরু হলে দাম বাড়বে নাকি কমবে।

এর আগে রকেট উৎক্ষেপণে ব্যর্থতা, রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে ইলন মাস্কের জনপ্রিয়তা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল। তার ওপর তার উদ্যোগগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অনিশ্চয়তায় ভরা।

গত বছর স্পেসএক্স ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, তাদের নেট লোকসান ছিল ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।

স্পেসএক্সের শেয়ার বিক্রির শর্ত-সম্বলিত আইপিও বিবরণীতে বলা হয়েছে, কোম্পানির নেট লোকসানের ইতিহাস আছে এবং ভবিষ্যতেও এটি লাভজনক নাও হতে পারে।

এখন এর শেয়ার কেনা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারী কী চায় তার ওপর। স্পেসএক্সের শেয়ারের মালিক—এই কথা ভেবেই যদি কেউ শান্তি পায় তার ক্ষেত্রে হারানোর কিছু থাকছে না।

ড্যান কোটসওয়ার্থ বলেন, স্পেসএক্সের প্রবৃদ্ধির সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি সম্ভাব্য কিছু ঝুঁকিও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে শেয়ারের মূল্য কমিয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘স্পেসএক্সের ব্যর্থতা, নীতিগত বা আইনি পরিবর্তন, ইলন মাস্কের বিতর্কিত মন্তব্য কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।’

এসবের বাইরে, কোনো ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ না করে সরাসরি একটি একক কোম্পানির শেয়ার কেনা সবসময়ই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ—কারণ পরিস্থিতি খারাপ হলে লোকসান ছাড়া উপায় থাকে না।

বেস্ট ইনভেস্টেরের হল্যান্ডস বলেন, ‘স্পেসএক্সে কারও বিনিয়োগের বড় অংশ খাটাতে আমি সতর্ক থাকব। যদি শুরুর দিকে ভালো লাভ হয়, তবে কোম্পানির অভ্যন্তরীন কেউ শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাওয়ার আগেই কিছু মুনাফা তুলে নেওয়া এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।’