ট্যাংকার জব্দ করল ইরান, মার্কিন বাহিনীর হামলায় বিকল ২ জাহাজ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ওমান উপসাগরে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি তেলের ট্যাংকার আটক করেছে। অন্যদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বন্দরে ঢোকার চেষ্টা করার সময় তারা দুটি ট্যাংকার বিকল করে দিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন এই দাবি করল। এই সংঘাত চলমান যুদ্ধের ভঙ্গুর বিরতি এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

শুক্রবার ফারস নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের নৌবাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, তারা ‘ওশান কোই’ নামক জাহাজটি আটক করেছেন। তার দাবি, জাহাজটি ইরানের তেল রপ্তানি এবং জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছিল।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি ইরানি বাহিনীর জাহাজে ওঠা এবং সেটি আটক করার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি বার্বাডোসে নিবন্ধিত।

অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আলাদাভাবে জানিয়েছে যে, ওমান উপসাগরে ইরানের বন্দরে প্রবেশের চেষ্টাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী দুটি ট্যাংকার বিকল করে দিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি কুপার এক বিবৃতিতে জানান, ইরানে আসা-যাওয়া করা জাহাজের ওপর যে অবরোধ রয়েছে, তা কঠোরভাবে পালন করতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী সদা প্রস্তুত।

এর কিছু সময় আগে হরমুজ প্রণালিতে দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এই পরিস্থিতিতে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ওই এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি যুদ্ধজাহাজে (ডেস্ট্রয়ার) হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রই একটি তেলের ট্যাংকার ও আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। তারা জানায়, এই হামলায় ১০ জন নাবিক আহত হয়েছেন এবং ৫ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

ইরানের সামরিক কমান্ড আরও অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান ওই প্রণালীর পূর্বে এবং চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এই ঘটনাকে অবশ্য বড় করে দেখতে রাজি নন ট্রাম্প। একে ‘লাভ ট্যাপ’ বা মৃদু আঘাত বলে তিনি দাবি করেন, এর মাধ্যমে কোনো নিয়ম ভাঙা হয়নি।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার বলেছেন, যুদ্ধ পুরোপুরি থামানোর প্রস্তাবের ওপর ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন।

কাতার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংঘাত থামানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

এদিকে ইরানের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শুক্রবার জানান, তারা মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে এখনও চিন্তাভাবনা করছেন। তবে হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পরিস্থিতির ওপর ইরানের সেনারা কড়া নজর রাখছে এবং যেকোনো হামলা বা উসকানিমূলক আচরণের জবাব দিতে তারা তৈরি।

আল জাজিরার সাংবাদিক রসুল সরদার তেহরান থেকে জানান, আইআরজিসি আগেও জাহাজ আটক করেছে, কিন্তু এবারের পদক্ষেপটি ইরানের কৌশলে এক নতুন মোড়।

তার মতে, ইরান মনে করছে এই জলপথগুলো এখন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করছে এবং নতুন কিছু কঠোর নিয়ম চালু করছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে যেকোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হলে ইরানি বাহিনীর কাছ থেকে আগাম অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে।

যে পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয়, সেই পথ পার হতে গেলে জাহাজগুলোকে এখন থেকে ইরানকে ইমেইল করতে হবে। ইমেইলে জানাতে হবে জাহাজটি কোন দেশের, তাতে কী মালামাল আছে এবং সেটি কোথায় যাচ্ছে। ইরান এসব তথ্য দেখে তাদের টোল দিতে বলবে।

তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণ নতুন এক সামুদ্রিক নিয়ম। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের অধিকার বা ক্ষমতা হাতছাড়া করছে না।

তিনি আরও বলেন, ইরানের এই বড় সিদ্ধান্তটি একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। তা হলো—  ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর ওপর নিজেদের কব্জা মজবুত করছে। তাদের সায় না থাকলে এখন থেকে কোনো জাহাজই আর সেখানে যাতায়াত করতে পারবে না।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরেজ শেয়ার্স মনে করেন, ওমান উপসাগরে জাহাজ আটক করে আইআরজিসি আসলে বিশ্বকে তাদের ক্ষমতার জানান দিচ্ছে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে এই জলপথে এখন তাদেরই হুকুম চলে, যা তারা আগে কখনো এভাবে করতে পারেনি।

তিনি বলেন, আইআরজিসি এই রুটটিকে অনিরাপদ ও বিপজ্জনক করে তুলছে, যেন সবাই বুঝতে পারে এই অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতাপ কতটা।

শেয়ার্সের মতে, এই সবকিছুর মূলে রয়েছে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার নড়বড়ে আলোচনা। আমেরিকা যদি চুক্তির শর্তগুলো মানতে রাজি না হয়, তবে আইআরজিসি ঠিক এভাবেই নিজেদের শক্তি দেখিয়ে আলোচনার টেবিলে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে।