টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পানি প্রতিবেশ সংরক্ষণের আহ্বান
নিরাপদ পানিকে সর্বজনীন অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও প্রতিবেশভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে খুলনায় শেষ হয়েছে তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন ২০২৬।
খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে ২৪ থেকে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে উপকূলীয় ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য অঞ্চলের পানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পানি শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনের শেষ দিনে ১২ দফা খুলনা ঘোষণা গৃহীত হয়, যেখানে পানি সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা, প্রতিবেশ অবক্ষয় ও জীবিকা ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
ঘোষণায় বলা হয়, পানিকে কেবল একটি 'সম্পদ' হিসেবে নয়, বরং প্রতিবেশের মৌলিক উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশের বিভিন্ন প্রতিবেশগত অঞ্চলের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পানি নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রাকৃতিক ভূ-উপরিস্থ জলাধার লিজ দেওয়ার প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করা।
এছাড়া লোকজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সমাজভিত্তিক পানি ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়। গ্রামীণ এলাকায় এবং দুর্যোগকালীন সময়ে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বিশেষ বাজেট বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়।
কৃষিজমিতে মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ত পানি উত্তোলন বন্ধ করা এবং অপরিকল্পিত লবণাক্ত পানিনির্ভর চিংড়ি চাষ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি নদী অবমুক্তকরণ এবং খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক সংযোগ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের তাগিদ দেওয়া হয়।
ঘোষণায় পানি ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরদারে একটি পার্লামেন্টারি ককাস গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পিত কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নদী, হাওর, বিল, মোহনা ও সমুদ্রনির্ভর মৎস্যজীবীদের জীবিকা সুরক্ষা এবং মৎস্য প্রজনন প্রতিবেশ সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়। সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র প্রদান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়।
এছাড়া ভূমি, বায়ু ও পানি দূষণ হ্রাস এবং গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবেশ-কেন্দ্রিক উপকূলীয় বসতি ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করা হয়।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ওয়াটারএইড দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে বাংলাদেশ পানি সম্মেলন ২০২৮-এর জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা যায়।
তিনি বলেন, শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে দাবি উত্থাপন এবং তা সংসদে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরলে সংকট নিরসনে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সমাপনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম।