পোশাক শিল্পের ভিত গড়া নারীরাই এখন সবচেয়ে অনিশ্চয়তায়

তানজিলা তাসনিম

ঈদের ছুটির সময় নাসিমার মোবাইলে একটা বার্তা আসে। তিনি ভেবেছিলেন সাধারণ কোনো ম্যাসেজ হবে। কিন্তু খুলে পড়তে গিয়ে দেখেন, তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী নাসিমা বলেন, ‘আমি এখনো জানি না আমার অপরাধ কী ছিল।’ 

নাসিমা সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের একটি কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছিলেন। এই শিল্পগোষ্ঠীটির সাতটি কারখানা থেকে একসঙ্গে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়, যার মধ্যে তিনিও একজন।

নাসিমার দাবি, চাকরি হারানোদের বেশির ভাগই তার বয়সী নারী। একই কারখানায় তার এক পুরুষ আত্মীয়ও কাজ করেন, কিন্তু তাকে ছাঁটাই করা হয়নি।

দ্য ডেইলি স্টার নাসিমার এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। আল-মুসলিম গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রাজীব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। 

অবশ্য গত মাসে কোম্পানিটি দাবি করেছিল, শ্রম আইন মেনেই সব পাওনা মিটিয়ে এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

তবে এসব প্রশাসনিক যুক্তিতে নাসিমার কী আসে যায়? তিনি এখন গাইবান্ধায় নিজের গ্রামে ফিরে গেছেন। বেদনার সুর ভেসে এলো তার কণ্ঠে, ‘আমার এই বয়সে আমি কোথায় আবার নতুন কাজ পাব?’

তিনি এমন এক শিল্পের অংশ ছিলেন, যার ভিত্তি গড়েছিলেন নারীরা। কিন্তু আজ সেই নারীরাই পুরুষদের চেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।

চ
সাভারে যে কারখানায় একসময় কাজ করতেন নূর বাণু, তারই পাশে পেট চালাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী দোকান চালাচ্ছেন নুর বানু। আল মুসলিম গ্রুপের একটি কারখানা থেকে গত মাসে তাকে ছাঁটাই করা হয়। ছবি: স্টার

পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক খাতের মোট জনবলের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন নারী। বহু বছর ধরে দেশের এই খাতটি সারা বিশ্বে নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। খাতটি লাখ লাখ নারীকে সবেতন কাজের সুযোগ করে দিয়ে পরিবার, গ্রাম ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল।

তবে ২০০৫ সালের মধ্যে এই হার কমে ৭০ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২১ ও ২০২৩ সালে তা আরো কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ শতাংশে। এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ, জিআইজেড, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পৃথক গবেষণাতেও এই নিম্নমুখী প্রবণতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল জানান, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই সময়ে নারীদের কর্মসংস্থান ৫৭ শতাংশ বাড়লেও পুরুষদের বেড়েছে ৭৮ শতাংশ। যদিও সংখ্যাগত দিক থেকে নারী শ্রমিকের মোট সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, মেশিনের ব্যবহার বা অটোমেশনের কারণে মেশিন অপারেটর ও হেলপারের মতো যেসব পদে সবসময়ই নারীরা কাজ করে আসছেন, সেই পদগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের এই পতনের হার আরও আশঙ্কাজনক।

অটোমেশন, দক্ষতার ঘাটতি ও 'পুরুষবান্ধব' মানসিকতা

কাজী ইকবাল এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, নতুন যন্ত্রপাতির সঙ্গে দক্ষতার অমিল। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে নাইট শিফটে নারীদের কাজে না দেওয়ার প্রবণতা।

তিনি বলেন, কিছু আধুনিক প্রযুক্ত পরিচালনার জন্য বাড়তি দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা নারী শ্রমিকদের নেই। তাছাড়া একটি মেশিন যখন নাইট শিফটসহ ২৪ ঘণ্টা চলে, তখন নিরাপত্তার অজুহাতে নারীদের চেয়ে পুরুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বিআইডিএসের এই কর্মকর্তা বিষয়টিকে মজুরির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। অতীতে কম মজুরিতে কাজ করানো যেত বলেই মালিকেরা নারী শ্রমিকদের পছন্দ করতেন। কিন্তু পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা করার পর সেই হিসাব বদলে গেছে। মজুরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী শ্রমিকের চাহিদাও কমে গেছে।

দক্ষতার এই ঘাটতি তথ্যেও স্পষ্ট। ২০২২ সালের এফএসজি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা প্রাথমিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ, যেখানে পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই হার ১৮ শতাংশ। তাছাড়া অটোমেটেড লাইনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ওভারলক, ফ্ল্যাট লক ও বোতাম তৈরি করার আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো পরিচালনায় পুরুষেরা বেশি পারদর্শী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দক্ষতার ঘাটতি পূরণে নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা খুব কমই করা হয়েছে। উপরন্তু নারীদের অগ্রগতি আটকে দিচ্ছে লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বা সামাজিক ধারণা।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, পোশাক খাতে সুপারভাইজার পদে নারীদের হার ১৫ শতাংশের কম এবং ম্যানেজারিয়াল বা প্রশাসনিক পদে ৫ শতাংশেরও কম। মালিক ও শ্রমিক উভয়ের মধ্যেই এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে, পুরুষেরা দ্রুত কাজ করতে পারেন এবং তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি।

বিআইডিএসের জেনারেল ইকোনমিক্স ডিভিশনের গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী বলেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অটোমেশনের কারণে নারীদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। কারণ মালিকেরা এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক খুঁজছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ জানান, অটোমেশনের এই ধাক্কা ২০১৩ সালের দিকেই শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি ব্যাপক ছাঁটাইয়ের কারণে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

তার মতে, প্রতিটি নতুন মেশিন গড়ে প্রায় আটজন শ্রমিকের কাজ একাই করে ফেলে এবং কোনো পুনর্দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এগুলো চালু করা হয়। মজার বিষয় হলো, নারীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে তারা এসব মেশিন পুরুষদের চেয়ে সমান বা তারচেয়েও ভালো চালাতে পারতেন।

কঠোর ও নির্যাতনমূলক কর্মপরিবেশ

সুলতান উদ্দিন আহমেদ অটোমেশনের পাশাপাশি আরও দুটি সংকটের কথা তুলে ধরেন। প্রথমত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণ সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে সরাসরি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। এসব কারণকে অবশ্য অনেক মালিক তাদের সুবিধার্থে সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।

দ্বিতীয়ত, কারখানা সংলগ্ন এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে ওঠায় বয়স্ক নারী, বিশেষ করে যাদের সন্তান রয়েছে, তারা বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।

দক্ষতার ঘাটতির পাশাপাশি মজুরির বৈষম্য এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সানেম এবং মাইক্রোফাইন্যান্স অপরচুনিটিজের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে ওভারটাইম ছাড়া নারীদের মধ্যক মাসিক আয় ৯ হাজার ৬৬৯ টাকা, যেখানে পুরুষদের আয় ১০ হাজার ৯২৮ টাকা।

উভয় আয়ই গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশন নির্ধারিত জীবনযাত্রার ন্যূনতম মজুরির (১৯ হাজার ২০০ থেকে ২৬ হাজার টাকা) চেয়ে অনেক কম।

এফএসজি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই আয়ের ব্যবধান প্রায় ২৫ শতাংশ। এছাড়া দেখা গেছে, নারী শ্রমিকরা তাদের আয়ের ৫৩ শতাংশ পরিবারকে পাঠান, যেখানে পুরুষেরা পাঠান ৩৬ শতাংশ। ফলে নারীদের নিজস্ব সঞ্চয় বলতেই কিছু থাকে না।

কাজের পরিবেশও নারীদের কাজ ছাড়তে বাধ্য করছে। এফএসজি রিপোর্টে ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নামমাত্র বিরতি, শত শত শ্রমিকের ভিড়ে দমবন্ধ গরম পরিবেশ এবং এর ফলে শ্রমিকদের ঘন ঘন মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জির কথা বলা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, তাদের কারোর জন্যই কোনো স্বাস্থ্য বীমা নেই।

প্রতিটি ফ্লোরে নারীদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই। ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ অপর্যাপ্ত এবং ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোতেও লোকবল কম।

আইসিএআরের ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৪০ বা তার বেশি নারী শ্রমিক থাকলে ডে-কেয়ার সেন্টার রাখা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক হলেও এই ঘাটতি রয়েই গেছে। অনেক কারখানা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা বা পরিদর্শকদের দেখানোর জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার রাখে, কাজের কাজ কিছুই করে না।

উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সুপারভাইজারদের গালিগালাজ বা মৌখিক নির্যাতন খুবই সাধারণ বিষয়। এফএসজি রিপোর্ট বলছে, এই মানসিক চাপই নারীদের পুরুষদের চেয়ে বহু বছর আগেই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য করার অন্যতম প্রধান কারণ।

নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে যৌন ও মানসিক হয়রানি নারীদের টিকিয়ে রাখাকে আরও কঠিন করে তুলছে। আইসিএআরের রিপোর্টে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হয়েছেন অথবা স্বচক্ষে দেখেছেন।

১৯ বছর বয়সী আখিরুন ইসলামের বাবার জুয়ার অভ্যাস। সংসারে আর্থিক সংকট দেখে এক বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে কারখানায় যোগ দেন তিনি। আখিরুন জানান, কোনো উপায় না থাকায় তাকে এসব নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, যেসব পুরুষদের সঙ্গে আমি কাজ করি, তারা প্রায়ই এমনভাবে তাকায় যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। কেউ কেউ কু-উদ্দেশ্যে গায়ে হাতও দিয়েছে। আমার এই চাকরিটা দরকার। এখানে থাকতে আমার ভালো লাগে না, কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার উপায়ও নেই।

প্রায় ২৫ বছর আগে কিশোরী বয়সে এই শিল্পে যোগ দেন তামান্না আক্তার। তার চোখে ধরা পড়া পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, তখনকার দিনে অনেক বেশি নারী গার্মেন্টসে যোগ দিতেন। এখনো আসেন, কিন্তু আগের মতো না।

তিনি মনে করেন, তরুণী নারীরা এখন শেষ সম্বল হিসেবেই কেবল গার্মেন্টসকে বেছে নেন। বহু বছর কাজ করার পরও তিনি তার পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে কম বেতন পান।

তামান্না বলেন, আমার বাবা মারা গেছেন। মা আর ছোট বোনকে দেখতে হয়। শুধু নিজের কথা চিন্তা করলে এই চাকরি আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিতাম।

বয়সও এখন বড় বাধা। ৪৫ বছর বয়সী আমেনা খাতুন মাসের পর মাস ধরে কাজ খুঁজেও পাচ্ছেন না। সম্প্রতি গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় একটি জরুরি নিয়োগ দেওয়া কারখানার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, আমার বয়স বেশি বলে তারা আমাকে নেয়নি। অভিজ্ঞ হওয়ার পরও গত কয়েক দিনে অন্তত পাঁচটি কারখানায় যোগাযোগ করেছি, কাজ পাইনি। এখন মনে হচ্ছে আমি হয়তো আর কখনোই কাজ পাব না।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, নারীর কম অংশগ্রহণের এই হার কেবল অটোমেশনের ফল নয়, এটি পোশাক খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং শ্রমবাজারে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্যেরই প্রতিফলন।

তিনি বলেন, মালিকরা এখন ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা চাচ্ছেন যা মধ্যবয়সী নারীরা অতীত বৈষম্যের কারণে অর্জনের সুযোগ পাননি। ফলে ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের সময় বয়স্ক নারীরাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন।

বেকারত্বের প্রভাব

তবে এই তথ্যকে সবাই একইভাবে দেখছেন না। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নারী শ্রমিকের অনুপাত কমার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, অন্যান্য খাতে বেকারত্ব বাড়ায় বর্তমানে প্রচুর পুরুষ শ্রমিক তৈরি পোশাক শিল্পে ঢুকছেন। অতীতে নারীরা যেসব কাজ করতেন, তারা তা গ্রহণ করছেন।

কর্মক্ষেত্রে হয়রানির দাবি অস্বীকার করে তিনি বলেন, অভিযোগ না এলে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার কারণে অনেক নারী হয়রানির শিকার হলেও অভিযোগ করতে চান না।

তিনি জানান, নিয়মিত কারখানাগুলো তদারকি করা হয়। কারখানাগুলোতে অভিযোগ বাক্স থাকে এবং ক্রেতা ও থার্ড-পার্টি অডিটররা সরাসরি শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পাশাপাশি ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নারীদের বলির পাঁঠা করার বিষয়টিও তিনি নাকচ করে দেন।

তিনি বলেন, কাজের অর্ডার কমে গেলে কারখানা লোকসান এড়াতে শ্রমিক ছাঁটাই করতেই পারে, যা আইনসিদ্ধ। লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করে ছাঁটাই করা হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।

সামনের সম্ভাব্য পরিণতি

বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, এর পরিণাম কেবল কারখানার চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিআইডিএসের অতনু রব্বানী বলেন, এত বড় একটি শিল্পে যদি নারীদের অংশগ্রহণ কমতেই থাকে, তবে তা পরিবারের আয়, সামগ্রিক ভোগ এবং পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, নারীরা যখন কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায়, তখন তারা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও হারায়।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভানেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়নি। নারীরা এই খাতের মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও এখনও সবচেয়ে কম বেতন পান।

বিলসের কর্মকর্তা সুলতান উদ্দিন আহমেদ সরকারের একটি বিশেষ 'টাস্কফোর্স' গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই টাস্কফোর্স কারখানাগুলো শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য থাকবে এবং ছাঁটাই আসলেই প্রয়োজন কি না তা খতিয়ে দেখবে। পোশাক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিচ্ছে, অথচ সংসদে এটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।

তিনি নীতিগত ঘাটতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, বড় শিল্পগ্রুপগুলো সংকটে পড়লে সরকারি সহায়তা পায়, কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ব্যাংক ঋণের চাপে কোনো সুরক্ষা না পেয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যায়।

সানেমের সেলিম রায়হান তৈরি পোশাক খাতকে বিগত চার দশকে বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, শিশুদের শিক্ষা এবং পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা অপরিসীম।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অবস্থান ধরে রাখতে না পারলে অর্জিত সাফল্যগুলো নস্যাৎ হয়ে যাবে। তাই নারীদের কাজ হারানোর আগেই তাদের দক্ষ করে তোলার নীতি গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পুনর্দক্ষতা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত শিক্ষা, সুপারভাইজার পদে যাওয়ার সুযোগ এবং বৈষম্যমূলক নিয়োগ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি সুলভ মূল্যে ডে-কেয়ার, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা এবং কাজ হারানো শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন গাজীপুর প্রতিনিধি মনজুরুল হক।)