আইফোন ডুও: অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল স্মার্টফোনটিতে কী আছে
প্রযুক্তিপ্রেমীদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল স্মার্টফোন আইফোন ডুও।
বুধবার রাতে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে প্রথমবারের মতো পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন জন টার্নাস।
ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোতে অ্যাপল সদর দপ্তরের স্টিভ জবস থিয়েটার থেকে সরাসরি সম্প্রচারকৃত অনুষ্ঠানে টার্নাস বলেন, ‘অন্যরা এমন ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করেছে, যেগুলো পাশাপাশি জোড়া লাগানো দুটি ফোনের মতোই অস্বস্তিকর মনে হয়।’
‘বড় ডিসপ্লের এমন একটি ডিভাইস তৈরি করাই অ্যাপলের লক্ষ্য, যা ব্যবহারকারীদের আইপ্যাডের মতোই স্বাভাবিক ও সহজাত অনুভূতি দেবে,’ যোগ করেন তিনি।
আইফোন ডুও দেখতে অনেকটা পাসপোর্টের মতো, প্রান্তগুলো গোলাকার। ভাঁজ খুললে ফোনটি ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চির (১৯ সেন্টিমিটার) বড় ও চওড়া পর্দায় রূপ নেবে। অ্যাপলের দাবি, পুরোপুরি খোলা অবস্থায় এটিই তাদের সবচেয়ে পাতলা আইফোন।
বিদ্যমান ফোল্ডেবল ফোনগুলোর সমালোচনা করে টার্নাস বলেন, এগুলো অনেকটা অস্বস্তিকর এবং স্ক্রল করা বা ভিডিও দেখার মতো সাধারণ কাজের জন্যও খুব একটা উপযোগী নয়।
তার দাবি, পকেটে রাখা যায়—এমন একটি ডিভাইসে আইপ্যাডের মতো অভিজ্ঞতা দিতেই আইফোন ডুও তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য এতে বিশেষভাবে তৈরি হিঞ্জ, একই অনুপাতের দুটি পর্দা এবং নতুন টাইটানিয়ামের বডি ব্যবহার করা হয়েছে।
টার্নাস বলেন, ‘এটি একেবারেই নতুন, আবার একই সঙ্গে বেশ পরিচিত। আকারে এটি আপনার পাসপোর্টের কাছাকাছি। হাতে ধরতে পরিচিত লাগে এবং এক হাতেও আরামে ব্যবহার করা যায়।’
অ্যাপল জানিয়েছে, আইফোন ডুও-তে রয়েছে ‘এ২০ চিপ’। এতে অ্যাপলের তৈরি নতুন সি২ মডেম চিপও ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়্যারলেস ডেটা সংযোগের জন্য কোয়ালকমের চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই মডেম তৈরি করেছে অ্যাপল।
১৬ অক্টোবর থেকে প্রি-অর্ডার করা যাবে আইফোন ডুও। এর দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার।
টার্নাস আইফোনকে ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের একটি কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
অ্যাপলের সিইও বলেন, ‘আপনার তথ্য যখন আর আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন আস্থারও একটা সীমা থাকে।’ এ কারণেই যতটা সম্ভব অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স সরাসরি ডিভাইসেই কাজ করে বলে জানান তিনি।
অ্যাপলের এআই পণ্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা লিলিয়ান রিনকন নতুন সিরির বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাজারে আসার সময়ই নতুন সিরি ৩ লাখ অ্যাপের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। চলতি বছরের শুরুতে গুগল থেকে অ্যাপলে যোগ দেন রিনকন।
আইফোন ১৮ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স
এর আগে অনুষ্ঠানে শুরুতে আইফোন ১৮ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেল উন্মোচন করেন টার্নাস।
২০০৭ সালে প্রথম আইফোন বাজারে আসার পর থেকে প্রতিবছরই নতুন সংস্করণ উন্মোচন করেছে অ্যাপল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে এল বহুল প্রতীক্ষিত আইফোন ১৮ সিরিজ।
তিনটি ফোনেই অ্যাপলের সবচেয়ে আধুনিক ‘এ২০ প্রো’ চিপ ব্যবহৃত হয়েছে। অ্যাপল জানিয়েছে, নতুন এই চিপের কারণে উন্নত এআই মডেল সরাসরি আইফোনে চালানো আরও সহজ হবে।
আইফোন ১৮ সিরিজের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (সিরি) ও ব্যাটারিতেও করা হয়েছে ব্যাপক উন্নতি।
আইফোন ১৮ প্রোর দাম শুরু হচ্ছে ১ হাজার ১৯৯ ডলার থেকে, আর ১৮ প্রো ম্যাক্সের দাম ১ হাজার ২৯৯ ডলার থেকে। আগের প্রজন্মের ১৭ প্রো ও ১৭ প্রো ম্যাক্সের তুলনায় দুটি মডেলেরই প্রারম্ভিক দাম ১০০ ডলার বেশি।
এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে এ ধরনের ছবি শনাক্তে নতুন প্রযুক্তিও এনেছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটি ‘অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ’ নামে একটি নতুন মানদণ্ড চালু করেছে।
এর মাধ্যমে আইফোন ১৮ প্রোর ক্যামেরায় তোলা ছবির সত্যতা যাচাই করা যাবে। তবে সুবিধাটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনে পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি শনাক্তে ‘সিন্থআইডি’ নামের নতুন মানদণ্ডও চলবে অ্যাপলে।
প্রথমবারের মতো নয়েজ ক্যানসেলেশন এয়ারপড
অ্যাপল নতুন সংস্করণের এয়ারপডও উন্মোচন করেছে। এর দাম শুরু হবে ১২৯ ডলার থেকে। তুলনামূলক কম দামের এই মডেলেই প্রথমবারের মতো নয়েজ ক্যানসেলেশন সুবিধা থাকছে।
১৪৯ ডলারের আরেকটি সংস্করণে থাকবে ওয়্যারলেস চার্জিং ও স্টেমে থাকা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভলিউম বাড়ানো-কমানোর সুবিধা। স্টেমে আঙুল ওপর-নিচ করেই ভলিউম পরিবর্তন করা যাবে।
ওয়াচ সিরিজেও নতুন সংস্করণ
অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২ ও অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪ উন্মোচন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন দুই ঘড়িতেই স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নতুন সেন্সর ব্যবস্থা আগের চেয়ে ঘন ঘন হৃদস্পন্দন পরিমাপ করবে। এর মাধ্যমে শরীরের পুনরুদ্ধার ও ফিটনেসের অবস্থা বোঝার নতুন সুবিধাও যুক্ত হয়েছে।
অ্যাপলের দাবি, নতুন অ্যাপল সিলিকন ও উন্নত সেন্সরের সাহায্যে এসব ঘড়িতে পরিধানযোগ্য ডিভাইসের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভুল হৃদস্পন্দন পরিমাপের সুবিধা পাওয়া যাবে।
গত অর্থবছরে আইফোন থেকে অ্যাপলের আয় হয়েছে ২০৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা কোম্পানিটির মোট বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি।
বাজার বিশ্লেষক পাওলো পেসকাতোর রয়টার্সকে বলেন, ‘অ্যাপল নতুন একটি প্রিমিয়াম পণ্যের বাজার তৈরি করেছে, আয়ের নতুন পথ খুলেছে এবং আইফোন ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে।’
তবে পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান চলাকালে ১ শতাংশ ও অনুষ্ঠান শেষে অ্যাপলের শেয়ারের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়।
এর আগে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) পূর্বাভাস করেছিল, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি আইফোনের ফোল্ডেবল স্মার্টফোন বিক্রি হতে পারে। এ থেকে অ্যাপলের আয় হতে পারে ৪৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
আইডিসির গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল ম্যাশেবলকে বলেন, ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ কেবল এই খাতের প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবে না, বরং পুরো বাজারের গতিপথই বদলে দিতে পারে।
আইডিসির হিসাবে, অ্যাপল ফোল্ডেবল ফোনের বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করতে পারে। একইসঙ্গে এই ফোন বিক্রি থেকে তৈরি হওয়া মোট বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি অ্যাপলের দখলে যেতে পারে।
অ্যাপলের নতুন ফোনটি বাজারে আসার পর দীর্ঘদিন ধরে ফোল্ড ফোনের বাজারে নেতৃত্ব দেওয়া স্যামসাং ও হুয়াওয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামবে।