সঙ্গীর প্রাক্তন নিয়ে কৌতূহল, কোথায় সীমা টানবেন?

জারীন তাসনিম

নতুন একটি সম্পর্কে আছেন। একদিন কথায় কথায় সঙ্গীর আগের সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠল। প্রথমে সাধারণ দু-একটি প্রশ্ন করলেন। কত দিনের সম্পর্ক ছিল, কেন শেষ হয়েছিল কিংবা এখনো যোগাযোগ আছে কি না। কিন্তু সেখানেই কি কৌতূহল থামে? হয়তো এরপর জানতে ইচ্ছা করছে মানুষটি দেখতে কেমন ছিলেন, কোথায় ঘুরতে যেতেন, কী উপহার দিতেন, এমনকি পুরোনো ছবিগুলোও দেখতে মন চাইছে।

সঙ্গীর অতীত নিয়ে কিছুটা কৌতূহল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তার জীবনের আগের অভিজ্ঞতাগুলো তাকে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফলে অতীতের সম্পর্ক নিয়েও কিছু জানতে ইচ্ছা করতে পারে। কিন্তু সব তথ্য জানা কি বর্তমান সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয়? নাকি কিছু প্রশ্ন উল্টো অস্বস্তি, তুলনা কিংবা সন্দেহের কারণ হয়ে উঠতে পারে?

কতটা জানা প্রয়োজন, ভাবুন

আগের সম্পর্কের প্রতিটি ঘটনা জানার প্রয়োজন না থাকলেও কিছু বিষয় বর্তমান সম্পর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিশেষ করে অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা যদি বর্তমান সম্পর্কের আচরণ, প্রত্যাশা বা সীমার ওপর প্রভাব ফেলে, সেটি নিয়ে কথা বলা উপকারী।

সঙ্গী কোথায় প্রথম দেখা করেছিলেন, কোন রেস্তোরাঁয় যেতেন, কী নামে ডাকতেন কিংবা জন্মদিনে কী উপহার দিয়েছিলেন—এসব তথ্য হয়তো কৌতূহল মেটাবে। কিন্তু বর্তমান সম্পর্ক বুঝতে এগুলো কতটা প্রয়োজন, সেই প্রশ্নটিও করা দরকার। অনেক সময় এমন তথ্য জানার পরই শুরু হয় নতুন সমস্যা। একই জায়গায় আপনাকে নিয়ে গেলে মনে হতে পারে, প্রাক্তনকেও কি এখানে নিয়ে এসেছিলেন? আপনাকে কোনো উপহার দিলে সেটিও আগের সঙ্গীকে দেওয়া হয়েছিল কি না, এমন ভাবনা আসতে পারে। তাই কোনো প্রশ্ন করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, উত্তরটি জানলে বর্তমান সম্পর্কের কোনো বিষয় বুঝতে সুবিধা হবে, নাকি শুধু আরও প্রশ্ন তৈরি হবে?

তুলনা শুরু হচ্ছে না তো?

কৌতূহল থেকে খুব সহজেই তুলনা শুরু হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সঙ্গীর প্রাক্তনকে খুঁজে বের করাও এখন কঠিন নয়। এরপর তার ছবি, পড়াশোনা, চাকরি, পোশাক কিংবা জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের তুলনা শুরু হতে পারে। সমস্যা হলো, এই তুলনায় আপনি এমন একজন মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন, যিনি বর্তমান সম্পর্কের অংশই নন। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও জীবনের খুব সামান্য অংশই দেখা যায়।

সঙ্গী আগে কাকে পছন্দ করতেন, সেই ব্যক্তির মতো হওয়াও বর্তমান সম্পর্কের শর্ত নয়। অতীতের সম্পর্ক শেষ হয়েছে এবং বর্তমান সম্পর্কটি আলাদা দুই মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। তাই প্রাক্তনকে নিজের জন্য কোনো মানদণ্ড বানিয়ে ফেলা অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে।

একই প্রশ্ন বারবার করছেন?

একটি বিষয় একবার জানতে চাওয়া এবং একই বিষয় ঘুরিয়ে বারবার জানতে চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। সঙ্গী উত্তর দেওয়ার পরও যদি মনে হয় আরও কিছু লুকানো আছে, তখন সমস্যাটি শুধু তথ্যের অভাব নাও হতে পারে।

হয়তো আপনার ভয় হচ্ছে, সঙ্গী এখনো প্রাক্তনকে ভুলতে পারেননি। অথবা মনে হচ্ছে আগের সম্পর্কটি বর্তমান সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেক্ষেত্রে প্রাক্তন সম্পর্কে আরও দশটি প্রশ্ন করার চেয়ে নিজের অস্বস্তির কারণটি সরাসরি বলা বেশি কার্যকর হতে পারে। যেমন: পুরোনো সম্পর্কের বিস্তারিত জানতে চাওয়ার বদলে জানতে পারেন, বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে তিনি কী ভাবছেন বা প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে আপনাদের দুজনের সীমা কী হওয়া উচিত।

সঙ্গী বলতে না চাইলে

সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে একজন মানুষকে তার অতীতের প্রতিটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলতে হবে। কেউ হয়তো আগের সম্পর্ক কেন শেষ হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখেছেন কিংবা বর্তমানে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না, এসব নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন। কিন্তু পুরোনো ঝগড়া, ব্যক্তিগত মুহূর্ত বা অন্তরঙ্গ বিষয় নিয়ে কথা বলতে না-ও চাইতে পারেন।

কোনো বিষয় বর্তমান সম্পর্ককে সরাসরি প্রভাবিত না করলে সেই ব্যক্তিগত সীমাটিও সম্মান করা দরকার। উত্তর দিতে না চাওয়া মাত্রই কিছু লুকানো হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

নিজের অতীতের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম রাখুন

সঙ্গীর কাছে যে পরিমাণ স্বচ্ছতা আশা করছেন, নিজের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড রাখা ভালো। আপনি যদি নিজের আগের সম্পর্কের প্রতিটি ঘটনা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তাহলে সঙ্গীর কাছ থেকেও তা দাবি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটি ভাবতে পারেন। আবার আপনি সবকিছু বলতে স্বচ্ছন্দ বলেই সঙ্গীকেও একইভাবে বলতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তিগত সীমা একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। দুজনের জন্য গ্রহণযোগ্য জায়গাটি আলোচনার মাধ্যমেই ঠিক করা ভালো।

কখন প্রাক্তনের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা জরুরি

অতীত তখনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন সেটি বর্তমানে এসে দাঁড়ায়। সঙ্গী যদি নিয়মিত প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, আগের সম্পর্ক নিয়ে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, আপনাকে প্রাক্তনের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা সেই সম্পর্কের কোনো বিষয় আপনাদের মধ্যে বিশ্বাসের সমস্যা তৈরি করে, তখন বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত বর্তমান সম্পর্ক। ‘তোমাদের মধ্যে ঠিক কী হয়েছিল?’ জানতে চাওয়ার বদলে ‘এই যোগাযোগটি আমাদের সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করছে?’ প্রশ্নটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

কৌতূহল থাকুক, সীমাও থাকুক

সঙ্গীর অতীত সম্পর্কে কিছু জানা একে অপরকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একটি সম্পর্ক ভালো রাখতে প্রাক্তনের পুরো ইতিহাস জানা কোনো শর্ত নয়। কোন তথ্যটি বর্তমান সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি শুধুই কৌতূহল—এই পার্থক্যটাই বোঝা দরকার। এমন প্রশ্ন করুন, যার উত্তর আপনাদের মধ্যে বোঝাপড়া, বিশ্বাস কিংবা সীমা পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে। শুধু তুলনা করার উপকরণ তৈরি করবে এমন তথ্য না জানলেও চলে। শেষ পর্যন্ত বর্তমান সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে সঙ্গী অতীতে কাকে কীভাবে ভালোবেসেছিলেন তা নয়, বরং এখন আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে কতটা বিশ্বাস, সম্মান ও স্বচ্ছতা আছে, সেটিই।