সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া কি জরুরি?

জারীন তাসনিম

সম্পর্কে আসার পর ধীরে ধীরে সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গেও পরিচয় হচ্ছে। কখনো একসঙ্গে আড্ডা, কখনো জন্মদিনের দাওয়াত, আবার কখনো সঙ্গীর পরিকল্পনার সঙ্গে তার বন্ধুরাও থাকছেন। কারও সঙ্গে হয়তো সহজেই আপনার বন্ধুত্ব হয়ে গেল, আবার কারও সঙ্গে কয়েকবার দেখা হওয়ার পরও খুব একটা কথা জমছে না। তখন প্রশ্ন আসতে পারে, সঙ্গীর কাছের মানুষদের সঙ্গে কি আপনারও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকা জরুরি?

সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা অবশ্যই স্বস্তির। তবে ভালো সম্পর্ক আর বন্ধুত্ব এক বিষয় নয়। সঙ্গীর প্রতিটি বন্ধুকে নিজের বন্ধু বানাতে হবে, এমন কোনো নিয়মও নেই। বরং কোথায় সৌজন্য যথেষ্ট আর কোথায় বন্ধুত্ব স্বাভাবিকভাবে তৈরি হচ্ছে, সেই পার্থক্যটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো সম্পর্ক থাকলে সুবিধা আছে

সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে অনেক পরিস্থিতিই সহজ হয়ে যায়। সঙ্গীর জন্মদিন, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া কিংবা কোনো সামাজিক আয়োজনে সবাই একসঙ্গে থাকলে অস্বস্তি কম হয়। সঙ্গীকেও আলাদাভাবে দুই পক্ষ সামলাতে হয় না। এ ছাড়া তার বন্ধুদের মাধ্যমে সঙ্গীর জীবনের আরেকটি দিক জানার সুযোগ হয়। অনেক বন্ধুত্ব হয়তো আপনার সম্পর্ক শুরু হওয়ার বহু আগে থেকে। তাদের সঙ্গে সঙ্গীর আচরণ, পুরোনো গল্প কিংবা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে মানুষটিকে অন্যভাবে চেনা যায়। তবে এই সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করতেই হবে, এমন নয়। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, একে অপরকে সম্মান করা এবং একসঙ্গে থাকলে স্বচ্ছন্দ থাকা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট।

বন্ধুত্ব জোর করে তৈরি হয় না

সঙ্গীর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি তার খুব প্রিয় মানুষ হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে আপনার সঙ্গেও সেই ব্যক্তির একই ধরনের সম্পর্ক তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ ও কথা বলার ধরন আলাদা। কারও সঙ্গে প্রথম দেখাতেই কথা জমে যায়, আবার কারও সঙ্গে দীর্ঘদিন পরিচয়ের পরও সম্পর্কটি পরিচিতির মধ্যেই থেকে যায়। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। শুধু সঙ্গী খুশি হবেন বলে তার বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করলে উল্টো অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বন্ধুত্ব তৈরি হলে সেটি সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হোক। না হলে সৌজন্যপূর্ণ সম্পর্কও যথেষ্ট।

পছন্দ না হলেও সম্মান রাখা যায়

সঙ্গীর সব বন্ধুকে আপনার পছন্দ হতেই হবে না। কোনো বন্ধুর সঙ্গে আপনার ব্যক্তিত্ব নাও মিলতে পারে। তার কোনো অভ্যাস বিরক্তিকর লাগতে পারে কিংবা কথা বলার মতো বিষয় খুব বেশি নাও থাকতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অভিনয় করার প্রয়োজন নেই। আবার শুধু আপনার সঙ্গে মিলছে না বলে সঙ্গীকে সেই বন্ধুত্ব থেকে দূরে সরে যেতেও বলা ঠিক নয়। দেখা হলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, প্রয়োজনীয় সৌজন্য দেখানো এবং অকারণে বিরোধ তৈরি না করাই যথেষ্ট হতে পারে। একইসঙ্গে সঙ্গীরও বোঝা উচিত, তার বন্ধু মানেই আপনারও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে হবে না।

সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কতটা?

প্রতিবার সঙ্গী বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে আপনাকেও যেতে হবে, এমন নয়। একটি সম্পর্কে একসঙ্গে সময় কাটানো যেমন দরকার, তেমনি দুজনের আলাদা সামাজিক জীবন থাকাও স্বাভাবিক। সঙ্গী কখনো তার বন্ধুদের সঙ্গে একা সময় কাটাতে চাইতে পারেন। আপনিও নিজের বন্ধুদের সঙ্গে একই সুযোগ চাইতে পারেন। এতে সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যায় না।

আবার সব আয়োজন এড়িয়ে যাওয়াও কখনো দূরত্ব তৈরি করতে পারে। বিশেষ কোনো জন্মদিন, বিয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে মাঝে মাঝে যোগ দিলে সঙ্গীর কাছের মানুষদের সঙ্গে পরিচয় ও স্বাচ্ছন্দ্য দুটোই বাড়তে পারে। তাই প্রতিটি আড্ডায় থাকা কিংবা একেবারেই না থাকা, এই দুইয়ের মাঝামাঝি নিজের জন্য স্বস্তিকর জায়গাটি খুঁজে নেওয়া যায়।

বন্ধুত্ব হলে সীমাটাও বুঝুন

কখনো সঙ্গীর কোনো বন্ধুর সঙ্গে আপনারও খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যেতে পারে। সেটি সমস্যার কিছু নয়। তবে মনে রাখা ভালো, সম্পর্কের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সেই বন্ধুকে মাঝখানে ফেলে দেওয়া অস্বস্তিকর হতে পারে।

প্রতিবার ঝগড়ার পর সঙ্গীর বন্ধুকে ফোন করে অভিযোগ করা কিংবা তার কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য জানার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। বন্ধুটিকেও তখন দুজনের মধ্যে পক্ষ বেছে নেওয়ার মতো অবস্থায় পড়তে হয়। একইভাবে সঙ্গী ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুর সঙ্গে যে কথা বলেছেন, বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তা জানার চেষ্টা করাও ঠিক নয়। আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হলেও সঙ্গী ও তার বন্ধুর নিজস্ব সম্পর্কের জায়গাটি সম্মান করা দরকার।

কোনো বন্ধুকে নিয়ে অস্বস্তি হলে কী করবেন?

সব ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু ‘তাকে আমার ভালো লাগে না’ পর্যায়ে থাকে না। কোনো বন্ধুর আচরণ যদি আপনার প্রতি অসম্মানজনক হয়, আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে অযথা মন্তব্য করেন কিংবা বারবার ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করেন, তাহলে বিষয়টি সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।

তবে আলোচনার সময় পুরো মানুষটিকে বিচার না করে নির্দিষ্ট আচরণ নিয়ে কথা বলা ভালো। ‘তোমার বন্ধুকে আমার সহ্য হয় না’ বলার বদলে কোন আচরণে আপনি অস্বস্তি বোধ করেছেন, সেটি বোঝানো সহজ। অন্যদিকে শুধু ঈর্ষা বা ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে সঙ্গী কার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবেন, সেটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করাও সম্পর্কের জন্য ভালো নয়।

একটি সম্পর্কে আসার পর দুজনের সামাজিক বৃত্ত কিছুটা মিশে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। সঙ্গীর কোনো বন্ধু একসময় আপনারও ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন। আবার কিছু মানুষ শুধু সঙ্গীর বন্ধু হিসেবেই থেকে যাবেন। একইভাবে আপনার বন্ধুদের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। তাই সঙ্গীর বন্ধুদের সবাইকে নিজের বন্ধু বানানো লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যেখানে সঙ্গীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের আপনি সম্মান করেন এবং তারাও আপনাকে সম্মান করেন। শেষ পর্যন্ত সঙ্গীর বন্ধুদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের গভীরতা দিয়ে নিজেদের সম্পর্কের মান বিচার করার প্রয়োজন নেই। বন্ধুত্ব হলে ভালো, না হলেও পারস্পরিক সম্মান ও স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকাটাই বেশি জরুরি।