যেভাবে বন্ধু হয়ে উঠছেন বাবারা
মামুন রায়হান বেসরকারি চাকরি করেন। সেই ভোরে উঠে অফিসের গাড়ি ধরতে হয়। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। তারপর এক কাপ চা নিয়েই বসে পড়েন বড় মেয়েকে পড়াতে। এর মধ্যে ছোট মেয়েটা এসে কোলে উঠে পড়ে। শুরু হয় বাবার সঙ্গে আহ্লাদ। দিনের সব কথা দুইমেয়ের যেন সেই সময়েই বাবাকে বলা চায়। আবার ছুটির দিনেও পড়ে পড়ে কেবল ঘুমান না তিনি। ভোরে উঠে বড় মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। তাকে শহর চেনান, মানুষ দেখান।
মামুনের স্ত্রী গৃহিনী, গৃহস্থালির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তবু মেয়েদের সবকিছুর ভার মায়ের ওপর ছেড়ে রাখেননি মামুন। নিজের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, কখনো কখনো সম্ভবের বাইরে গিয়েও মেয়েদের সময় দেন তিনি।
আমরা যারা মিলেনিয়াল বা তার আগের প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করি, আমাদের পরিবারগুলোয় এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যেত না। তখন বাবা ছিলেন পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি। যার মূল কাজ অর্থ উপার্জন। সংসার কীভাবে চলছে বা সন্তানরা কী করছে, সেসব নিয়ে তারা ভাবতেন না। ফলে সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ভারও থাকত মায়ের কাঁধে। বাবাদের কাজ ছিল অফিস থেকে ফিরে এক কাপ চা, পেপার আর টেলিভিশনের রিমোটপ নিয়ে বসা।
কিন্তু আধুনিক সময়ের বাবারা সেই স্টেরিওটাইপিং ভেঙে ফেলছেন। সন্তান পালনে তারা মায়ের সঙ্গে সমান্তরালে কাজ করছেন। সেই মা যদি কর্মজীবী না-ও হন, বাবারা নিজের দায়িত্ব পালন থেকে সরে যাচ্ছেন না।
কথা বলেছিলাম এমন কয়েকজন বাবার সঙ্গে। যাদের একজন বললেন, কেবল মাত্র ‘বুকের দুধ’ খাওয়ানোর কাজটুকু ছাড়া সদ্যোজাত সন্তানের সব কাজই করতে পারেন তিনি।
ফলে ডায়াপার বদলানো, দুধ খাওয়ানোর পর বার্পিং করানো বা গ্যাস তোলা, ঘুম পাড়ানো এমনকি কাঁথা-কাপড় ধোয়ার মতো কাজগুলোও আর কেবল মায়ের একার কাঁধে থাকছে না।
মুনিরা সুলতানা বলছিলেন সন্তান পালনে তার স্বামীর সহযোগিতার কথা। জানালেন, তার স্বামী আক্ষরিক অর্থেই সন্তানের সব কাজ খুব আনন্দ নিয়ে করেন। রাতে অফিস থেকে ফিরে ছেলেকে ঘুম পাড়ান। ‘এমনকি আমি যেন ঘুমাতে পারি সেজন্য ও ছেলেকে নিয়ে আরেক রুমে খেলে, খাওয়ার সময় হয়ে গেলে খাওয়ায়। ছুটির দিনে গোসলও করায়।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জিনাত পুষ্পের স্বামী একটি ব্যাংকে কাজ করেন। কোথাও বেড়াতে গেলে দেখা যায় শিশু সন্তানকে তার স্বামীই দেখভাল করেন। বিশেষ করে পুষ্প কোনোদিন শাড়ি পরলে, সেদিন পারতপক্ষে ছেলেকে কোলে নিতে দেন না। অফিস থেকে দুজনেই কাছাকাছি সময়ে ফেরেন। ফিরেই পুষ্প রান্নাঘরে ঢুকলে, ছেলেকে নিয়ে বসেন তার স্বামী। খেলা করেন, পড়ানোরও চেষ্টা করেন। ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে বাকি কাজও দুজনে সমানভাবে ভাগ করে নেন।
আমাদের দেশে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এমন বাবাদের সংখ্যা। কথা হয় বেসরকারি টেলিভিশনের এক প্রযোজক বাবার সঙ্গে, যিনি সন্তানের স্কুলে আনা-নেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করেন অফিসের শিডিউল। সন্তানদের যেকোনো কাজ থাকে যার অগ্রাধিকারের শীর্ষে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কোন ভাবনা থেকে তিনি এসব দায়িত্ব মাথা পেতে নেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী যেহেতু দুজনেই কর্মজীবী। দুজনে মিলেই সংসার চালাই। তাই আমি মনে করি, সন্তান পালনের কাজটিও দুজনে মিলেই করা উচিত। আমার স্ত্রী মা বা নারী বলেই সন্তানের সব দায়িত্ব তার, আমি এর সঙ্গে একমত নই। সন্তান দুজনের, দায়িত্বও দুজনের।’
বাবারা সন্তানের কাজগুলো করে দিচ্ছেন, ক্রন্দনরত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রাতভর হাঁটছেন, ডায়াপার বদলাচ্ছেন কিংবা কাঁথা ধুচ্ছেন, ফিডার বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন—এমন দৃশ্য বাংলাদেশের মানুষদের প্রথাগত চিন্তাধারায় মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে বাবাদের পরিবার থেকেই আসে আপত্তি। এমনকি বাবা স্বেচ্ছায় সন্তানের কাজ করলেও মাকে শুনতে হয় কটু কথা। সবাই ধরেই নেন, স্ত্রীর চাহিদা মেটাতে গিয়েই পুরুষটি অফিসের কঠিন কাজ শেষ করে বাসায় ফিরেও একটু আরাম করার সুযোগ পাচ্ছেন না। অথচ ওই নারী বা মা কীভাবে দিনভর সন্তান সামলেছেন, সে কথা কেউ ভাবতেও চায় না। কারণ যুগ যুগ ধরে সন্তান পালনের কাজটি নারীই করে এসেছেন। নারীর জন্য কাজটি সহজ হলেও, পুরুষের জন্য তা হয়ে যায় ‘কঠিন’।
আর আমাদের আধুনিক বাবারা সেই ধারণাটিই ভাঙছেন। এখন বাবারা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, সন্তান লালন-পালনে শরীরে জরায়ুর উপস্থিতি জরুরি নয়। সেটি কেবল জন্মদানে প্রয়োজন। সন্তানের বাকি সব কাজ বাবা কিংবা মা যে কেউ করতে পারেন। বাবারা দেখাচ্ছেন, মেয়ের চুলের বেনি বাবাও বাঁধতে পারেন, দুধ বানাতে কেমন উষ্ণতার পানি প্রয়োজন সেটা জানতেও মা হওয়ার প্রয়োজন নেই। এসবের জন্য প্রয়োজন সন্তানের জন্য ভালোবাসা আর স্ত্রীকেও মানুষ হিসেবে দেখতে পারার মানসিকতা।
আর তাই, এখন মেয়েরাও পিরিয়ডের কথা নির্দ্বিধায় বলছে বাবার কাছে। অফিস থেকে ফেরার পথে স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আসতে মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছে। ছেলের স্কুলের অভিভাবক সভায় অফিস থেকে ছুটি নিয়ে যোগ দিচ্ছেন বাবারা। এমনকি প্রথম প্রেম কিংবা প্রথম ভালো লাগার অনুভূতির কথাও আমাদের সন্তানরা ভাগ করে নিচ্ছে বাবার সঙ্গে। এখন বাবারা আর দূরের কেউ নন। এখন বাবারা খুব কাছের, ঠিক যেন বন্ধুর মতো।