মায়ের পর সবচেয়ে বেশি আদর কি খালার কাছেই পাওয়া যায়?
‘খালা, আম্মুকে কিন্তু বলো না!’—বাংলাদেশের অসংখ্য খালার ফোনে, মেসেঞ্জারে কিংবা সামনাসামনি এই অনুরোধ কোনো না কোনো সময় নিশ্চয়ই এসেছে। পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, নতুন কোনো শখে টাকা খরচ করা, কিংবা প্রথম প্রেমের গল্প—এমন অনেক কিছুই আছে, যা অনেক সময় মাকে বলতে সাহস হয় না। কিন্তু খালাকে বলা যায়।
বাঙালি পরিবারে খালার সঙ্গে সম্পর্কটা অদ্ভুত রকমের। তিনি পরিবারের মানুষ, আবার অনেক সময় বন্ধুও। তিনি বড়দের দলে, কিন্তু পুরোপুরি বড়দের মতো নন। আবার ছোটদের পক্ষ নিলেও তিনি ছোটদের দলেও পড়েন না। হয়তো সে কারণেই অনেকের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর সঙ্গে খালারা জড়িয়ে আছেন।
‘খালার বাসা’ কথাটির মধ্যেও এক ধরনের নস্টালজিয়া আছে। সেই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আমাদের শৈশবের অসংখ্য বিকেল, পারিবারিক অনুষ্ঠান আর নির্ভার কিছু দিন। ছোটবেলায় খালার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। কেউ কেউ নিশ্চয়ই এখনো মনে করতে পারেন, ছোটবেলার সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর কিছু কেটেছে খালার বাসাতেই। স্কুল ছুটির দিন, সপ্তাহান্ত কিংবা হঠাৎ কোনো বিকেলে সেখানে গেলে মনে হতো পরিবেশটা একটু অন্য রকম। খালাতো ভাইবোনদের সঙ্গে খেলাধুলা, দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া, বিকেলে ছাদে আড্ডা কিংবা রাতে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া—এসব চমৎকার স্মৃতি কম-বেশি সবারই আছে। আমাদের বড় হওয়ার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ যেন এগুলো।
অনেকের আবার মনে পড়ে খালার বাসার রান্নার কথা। মায়ের রান্নার সঙ্গে তুলনা নয়, কিন্তু খালার বাসায় একই খাবারও যেন একটু অন্য রকম লাগত। খালার বাসায় বিকেলের নাশতা, হঠাৎ করে বানানো কোনো বিশেষ পদ শুধু খাবার নয়, এর সঙ্গে জড়ানো সময় আর স্মৃতি। তাই স্বাদটাও আলাদা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খালার সঙ্গে সম্পর্ক বদলায়। ছোটবেলায় যিনি চকলেট কিনে দিতেন, তিনি একসময় জীবনের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মানুষ হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, প্রথম চাকরি, বিয়ে, কিংবা জীবনের কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত—অনেকেই এসব বিষয়ে খালার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ খালারা এমনভাবে কথা শোনেন, যেভাবে সবাই শোনেন না। যেসব কথা বাবা-মাকে নানা কারণে বলা হয়ে ওঠে না, খালা সেখানেও ভরসার জায়গা হয়ে ওঠেন।
খালাদের বিষয়ে আরেকটা মজার বিষয় হলো, তারা প্রায়ই এমন কিছু জানেন, যা অন্য আত্মীয়রা জানেন না। পরিবারের নানা খবর তাদের কানে সবার আগে পৌঁছে যায়। কে কোন বিষয়ে পড়ছে, কার পরীক্ষা কেমন হলো, কে নতুন চাকরি পেল, কার মন খারাপ—এসব খবর তারা কীভাবে যেন জেনে যান! মায়ের মতোই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন খারাপ খবরে, সুখবরে উচ্ছ্বসিত হন।
ফোন করে খোঁজও নেন। ‘খেয়েছ?’, ‘শরীর ঠিক আছে?’—এই সাধারণ প্রশ্নগুলোই দূরে থাকা ভাগনে-ভাগনিদের জন্য অনেক বড় হয়ে ওঠে। আজকাল পরিবারের সদস্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, অনেক সময় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকেন। আগের মতো নিয়মিত দেখা হয় না। তবু জন্মদিনে, কোনো পারিবারিক উপলক্ষে কিংবা হঠাৎ কোনো সন্ধ্যায় ভিডিও কলে ভেসে ওঠা খালার মুখ পরিচিত এক স্বস্তির অনুভূতি নিয়ে আসে।
বড় হওয়ার পর পুরোনো ছবি দেখতে গিয়ে কিংবা পরিবারের গল্প করতে বসলে খেয়াল করা যায়, শৈশবের অনেক স্মৃতিতেই কোনো না কোনো খালা আছেন। কোথাও তিনি বেড়াতে নিয়ে গেছেন, কোথাও লুকিয়ে প্রিয় খাবার খেতে দিয়েছেন, কোথাও আবার মায়ের বকা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। ছোটবেলার দুষ্টুমি, কৈশোরের জেদ, বড় হওয়ার লড়াই—সবকিছুরই সাক্ষী তারা। সে কারণেই মায়ের পর সবচেয়ে বেশি আদর কার কাছ থেকে পাওয়া যায়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে খালার নামটা বারবার ফিরে আসে।
খালা, খালামণি বা খালাম্মাদের নিয়ে মানুষের এত আবেগের আরেকটি কারণ হয়তো তাদের অবস্থান। তারা মা নন, তাই সবসময় শাসন করেন না। আবার একেবারে বাইরের মানুষও নন। ফলে অনেক কথাই তাদের বলা যায়, যা অন্যদের বলা যায় না। তারা বকেন, আবার পক্ষও নেন। মা রাগ করলে খালাই গিয়ে বলেন, ‘আচ্ছা, ওকে আর একটু ছাড় দাও।’
হয়তো সে কারণেই খালাদের নিয়ে এত গল্প, এত স্মৃতি। জীবনের অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, কিন্তু খালার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশবের সেই পরিচিত অনুভূতিগুলো খুব সহজে বদলায় না। আর তাই বড় হওয়ার অনেক বছর পরও, কোনো সুখবর পেলে বা মন খারাপ হলে, কোথাও খুব নিরাপদ ছায়া পেতে মন চাইলে আগে খালার কথাই মনে পড়ে।

