ফুফু কি পরিবারের সবচেয়ে ভুল বোঝা সম্পর্কগুলোর একটি?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের পরিবারগুলোর গল্পে ফুফুর কথা খুব বেশি আসে না। খালা, দাদি কিংবা নানিকে নিয়ে যত গল্প শোনা যায়, ফুফুদের নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। অথচ পরিবারের সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি, গল্প আর সম্পর্কের অনেকগুলো সুতোই গিয়ে মিলে তাদের কাছে।

ফুফুর পরিচয় সহজ—তিনি বাবার বোন। কিন্তু সম্পর্কটা সবসময় এত সহজ নয়। কারণ ফুফুর সঙ্গে সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো পরিবারের সমীকরণ।

ছোটবেলায় ফুফু মানে অনেকের কাছেই থাকেন হঠাৎ বেড়াতে আসা একজন প্রিয় মানুষ। তিনি এলে বাড়ি একটু সরগরম হয়ে ওঠে। গল্প হয়, হাসাহাসি হয়, কখনো হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা খুব সাধারণ, কিন্তু সেখান থেকেই সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়।

ফুফুরা এমন একটি সময়ের সাক্ষী, যা নতুন প্রজন্ম কখনো দেখেনি। বাবার ছোটবেলার গল্প, পরিবারের পুরোনো বাড়ি, দাদা-দাদির জীবনের নানা ঘটনা কিংবা হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের স্মৃতি—এসব গল্প তাদের কাছেই থাকে। পরিবারের ইতিহাসের অনেকটা অংশ যেন তারা সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে চলেন। বাবার বয়স বাড়ার সঙ্গে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবাকে হারানোর পর ফুফুর সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব নতুন করে ধরা দেয়। কারণ তারা বাবার জীবনের এমন অনেক গল্প জানেন, যা আর কারও কাছ থেকে শোনা সম্ভব নয়। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে ফুফুরাই বাবার দিকের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে থাকেন। কোন আত্মীয় কোথায় আছেন, কার খবর কী এসব তথ্য তাদের কাছ থেকেই জানা যায়।

পুরোনো অ্যালবাম খুললে ফুফুর সঙ্গে বন্ধনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। কোথাও ফুফু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কোথাও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পাশে আছেন, কোথাও আবার পুরো পরিবারকে একসঙ্গে জড়ো করে ছবি তুলছেন। ছোটবেলায় এসব দৃশ্য আলাদা করে চোখে পড়ে না। বয়স বাড়ার পর ছবিগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, পরিবারের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তারা উপস্থিত ছিলেন।

তবে ফুফুর সম্পর্ককে অন্য অনেক সম্পর্ক থেকে আলাদা করে বেশ কিছু বিষয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি বিয়ের পর অন্য একটি সংসারে চলে যান। নিজের পরিবার, সন্তান, দায়িত্ব সবকিছু নিয়ে তার আলাদা জীবন তৈরি হয়। ফলে প্রতিদিন দেখা হয় না, নিয়মিত যোগাযোগও থাকে না। দূরত্ব তৈরি হয়। আর সেই দূরত্ব থেকেই অনেক ভুল বোঝাবুঝির শুরু।

তাছাড়া ফুফুর সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হবে, সেটি শুধু ফুফু আর ভাতিজা-ভাতিজির ওপর নির্ভর করে না। পরিবারের অন্য সম্পর্কগুলোরও প্রভাব থাকে সেখানে। বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে ফুফুর সম্পর্ক ভালো হলে আসা-যাওয়া, যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতাও সাধারণত বেশি হয়। আবার দূরত্ব থাকলে সেটির প্রভাব পরের প্রজন্মের সম্পর্কেও পড়ে। ফলে একই পরিবারে খালাদের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক, ফুফুর সঙ্গে সম্পর্কও একই রকম নাও হতে পারে।

এখানে বাবার সঙ্গে ফুফুর সম্পর্কের ভূমিকাও আছে। তাদের সম্পর্ক সুন্দর থাকলে ফুফুদের সঙ্গে ভাতিজা-ভাতিজির সম্পর্ক সুন্দর থাকার জায়গা তৈরি হয়। আবার তাদের সম্পর্ক সুন্দর থাকলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণত মায়েরা খালাদের গল্প যেভাবে বাচ্চাদের কাছে তুলে ধরেন, বাবারা ফুফুদের গল্প অতটা করেন না সন্তানদের সঙ্গে। ফলে ফুফু মানুষটির নানা দিক অজানাই থেকে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

ফুফুরা আবার এক ধরনের অদ্ভুত প্রত্যাশার মুখোমুখিও হন। বিয়ের পর নতুন সংসার সামলাবেন, আবার বাবার পরিবারের সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত থাকবেন—এমন একটি অলিখিত প্রত্যাশা অনেক পরিবারেই দেখা যায়। বেশি খোঁজ নিলে প্রশ্ন ওঠে, কম খোঁজ নিলেও প্রশ্ন ওঠে। ফলে তাদের অবস্থানটা সব সময় সহজ নয়।

সম্ভবত এ কারণেই ফুফুদের নিয়ে নানা ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে। পারিবারিক গল্প, নাটক কিংবা সিনেমায় তাদের কখনো কঠোর, কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ, কখনো অতিরিক্ত কৌতূহলী হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তব জীবন এত সরল নয়। ফুফুর জীবনেও থাকে দায়িত্ব, টানাপোড়েন, নিজের সংসার আর নিজের সংগ্রাম।

হ্যাঁ, সব ফুফু যে একই রকম স্নেহশীল হন তা নয়। কেউ কেউ হয়তো ভুল বোঝার পরিস্থিতি তৈরি করে দেন নানা পারিবারিক জটিলতায়। কিন্তু আবার প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের জটিলতা তো অন্যান্য সম্পর্কেও তৈরি হয়, তবু দূরত্বের কথা বলতে গেলে ফুফুর সঙ্গে দূরত্বের কথাই কেন বেশি সামনে আসে? তাহলে কি ফুফু পরিবারের সবচেয়ে ভুল বোঝা সম্পর্কগুলোর একটি? প্রশ্নটির উত্তর সবার জন্য এক হবে না।

তবে এটুকু বলা যায়, এই সম্পর্কটিকে শুধু কয়েকটি প্রচলিত ধারণা দিয়ে বিচার করা কঠিন। কারণ এর ভেতরে আছে দূরত্ব, টান, পারিবারিক সমীকরণ, স্মৃতি আর এমন এক ধরনের স্নেহ, যা সব সময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু থেকে যায়।