একক পরিবারের স্বাধীনতা নাকি যৌথ পরিবারের মায়া—উৎসবে কোনটি আপনার পছন্দের
ঘরভর্তি প্রিয় মানুষের মাঝে থাকা যেন এক ব্যস্ত বাড়ির রান্নাঘর ভাগাভাগি করে সবাই মিলে কাজ করার মতো। সেখানে যেমন থাকে উষ্ণতা, হাসি আর পারস্পরিক সহযোগিতা, তেমনি থাকে ভিড়, কোলাহল এবং মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মনোমালিন্যও।
আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে সম্ভবত এভাবেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
ধারণা করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় যৌথ পরিবার ব্যবস্থার শেকড় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কৃষিনির্ভর সমাজে প্রোথিত, কারণ তখন একসঙ্গে বসবাস করা যেমন ছিল সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় তেমনি অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত।
আজকের দিনে যৌথ পরিবার আগের তুলনায় কম দেখা গেলেও, এটি এখনো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পারবারিক ব্যবস্থায় একই ছাদের নিচে একাধিক প্রজন্ম—যেমন, দাদা-দাদি, চাচা-ফুপু, মামা-খালা কিংবা চাচাত-খালাত ভাইবোনরা একসঙ্গে জীবনযাপন করেন। পাশ্চাত্য সমাজে এমন পারিবারিক কাঠামো খুব একটা প্রচলিত নয়।
অন্যদিকে, নিউক্লিয়ার পরিবার বা একক পরিবার শুধু বাবা-মা ও সন্তানদের নিয়ে গঠিত। একক পরিবারের সদস্য হওয়ায় আমি অনেক সময় আত্মীয়দের বাড়িতে কাজিনদের সঙ্গে কাটানো রাতগুলোর আনন্দ খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। আসলে কোন কিছুর অনুপস্থিতিই সেটির মূল্য বুঝিয়ে দেয়।
পরিবারের উষ্ণতা খুবই চমৎকার একটি ব্যাপার। এত মানুষ আপনাকে ভালোবাসে, খেয়াল রাখে এবং আপনাকে অনুভব করায় যে আপনি তাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়, এই ঘনিষ্ঠতারও একটি মূল্য আছে। কখনো কখনো এর জন্য কিছু ব্যক্তিগত পরিসর বা স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়।
ইঞ্জিনিয়ারিং শেষবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিকুল হক নিজ শহরে পরিবারের কাছে গেলে অনেক সময় বুঝতে পারেন যে, পরিবারের যেকোনো সংঘাত মীমাংসার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা যথেষ্ট নয়।
তার মতে, যৌথ পরিবারে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় খুব সাবধান থাকতে হয়। একটি ভুল শব্দ কারও না কারও মনে কষ্ট দিতে পারে।
আমি নিজেও মাঝে মাঝে যৌথ পরিবারে গেলে এই চাপ অনুভব করি। সবসময় সবার সঙ্গে দেখা করা, সব চাচা-ফুপুর বাসায় গিয়ে খাওয়া—এসবের জন্য যেমন সামাজিক শক্তি লাগে, তেমনি সময়ও লাগে। সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যেন অসাবধানতাবশত কারও অনুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে। এই বাড়তি সতর্কতা সব সময় বজায় রাখা যে কারও জন্যই ক্লান্তিকর।
সাদিকুল আরও জানান, যৌথ পরিবারে পরীক্ষার রাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। 'মা-বাবাকে শব্দ কমাতে বলতে পারি, কিন্তু চাচা বা খালাকে একই কথা বলতে সংকোচ বোধ করি। যদি আবার তারা কিছু মনে করেন,' বলেন তিনি।
অনেকের মতে, যৌথ পরিবার নীরবে আপনার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কিছুটা কেড়ে নিতে পারে। সাদিকুল হকের মতে, বাবা-মাকে নিয়ে একক পরিবারে থাকার সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তিনি উপভোগ করেন, তা হলো নিজের স্বাধীনতা।
তবে যৌথ পরিবার মানেই শুধু অদৃশ্য বাধা আর সীমাবদ্ধতা নয়। অনেকের মতে, যৌথ পরিবারে প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না কেউ সবসময়ই থাকে।
সাফকাত জহির একক পরিবারে থাকেন। স্নাতক শেষবর্ষের এই শিক্ষার্থী মনে করেন, শিশুদের ক্ষেত্রে কারও কাছে মনের কথা বলা অত্যন্ত জরুরি।
তার ভাষায়, 'একক পরিবার খারাপ নয়। কিন্তু যদি সন্তানরা বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পায় বা পর্যাপ্ত যোগাযোগ না থাকে, তবে তারা একাকিত্বে ভুগতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।'
একক পরিবারে বাবা-মা যদি যথেষ্ট সময় না দেন বা সন্তানের জন্য নিরাপদ আলাপের পরিবেশ তৈরি না করেন, তবে শিশুরা নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারে। সেক্ষেত্রে যৌথ পরিবার অনেক সময় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে প্রায়ই এমন কেউ থাকেন, যাকে শিশু বিশ্বাস করতে পারে, সেই মানুষটি হতে পারেন দাদা-দাদি, প্রিয় কোনো খালা বা ফুপু, কিংবা কাছের কোনো কাজিন।
পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্য কেউ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বা সাময়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গৃহস্থালি কাজগুলো সামলে নেন। এই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই কঠিন সময়ে যৌথ পরিবারকে করে তোলে আরও দৃঢ় ও সহনশীল।
পরিবারের বাইরে থাকা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনা রহমান ঐশ্বর্য বলেন, ঈদ বা নববর্ষের মতো উৎসবে যৌথ পরিবারের অভিজ্ঞতা অন্যরকম আনন্দময়।
তার ভাষায়, 'এমন উৎসবের সময় একক পরিবারে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে অনেক সময় মন খারাপ লাগে। উৎসব উপভোগ করতে বিস্তৃত পরিবার দরকার।'
যারা একসময় যৌথ পরিবারে থেকেছেন, পরে একক পরিবার করেছেন তাদের কাছে সেই স্মৃতিগুলো আজীবন স্মৃতিতে রয়ে যায়।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন তাহারিমও এখন একটি একক পরিবারের সদস্য। তার বক্তব্য, প্রায়ই কাজিনদের সঙ্গে কাটানো শৈশবের সেরা মুহূর্তগুলো মনে পড়ে।
যখন তার বাবা-মা যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারে চলে যান, তখন তাহারিমের বয়স ছিল পাঁচ বছর। যৌথ পরিবারে পাওয়া আপন অনুভূতির কথা মনে করে তিনি বলেন, 'আমার বন্ধুর পরিধি খুব বড় নয়। আমার পৃথিবী এই কয়েকজন মানুষকে ঘিরেই। আমার বিস্তৃত পরিবারের সদস্যরাও তাদের মধ্যে পড়ে। কাজিনদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমি খুব ভালোবাসি। আমার চাচা-খালারা খুব স্নেহশীল। তাদের সঙ্গে কাটানো পারিবারিক রাতগুলো আমার ভীষণ মনে পড়ে।'
যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী জেনিফার কামাল জীবনের ১৪ বছর যৌথ পরিবারে কাটিয়েছেন। অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, 'বড় পরিবারের ভিড়ে বড় হতে হতে এক ধরনের আনন্দময় বিশৃঙ্খলার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে ফেলি।'
একক পরিবার শান্তিপূর্ণ হতে পারে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও বেশি দেয়। কিন্তু যৌথ পরিবার তার সমস্ত কোলাহল সত্ত্বেও যে সংযোগ ও আপন অনুভূতি দেয়, তা অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না।
অনুবাদ করেছেন সৈয়দা সুবাহ আলম