‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর দোলাচলে

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটলসের গান ‘নরওয়েজিয়ান উড’ যতবারই শুনেছি, ততবারই আমার মনে পড়ে কিছু চরিত্রের কথা—তোরু ওয়াতানাবে, নাওকো আর মিডোরি। চরিত্রগুলোর লেখক জাপানের হারুকি মুরাকামি, যিনি তার লেখায় জাদুবাস্তবতা, রহস্য কিংবা পরাবাস্তব উপাদানের জন্য পরিচিত। হারুকি মুরাকামির সাহিত্যজগতে ‘নরওয়েজিয়ান উড’ এক ব্যতিক্রমী নাম। লেখক মুরাকামি নিজেও বিটলসের গান ‘নরওয়েজিয়ান উড’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বইটির নামকরণ করেন।

আমরা যদি মুরাকামি সম্পর্কে ধারণা রাখি, তাহলে নিশ্চয়ই জেনে থাকব—এই লেখক পশ্চিমা সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত, তার নিজের লেখনীতে জাপানিজ আর পশ্চিমা সংস্কৃতির মিশেল রেখেছেন। তবে ‘নরওয়েজিয়ান উড’ নামটি বিটলস ব্যান্ডের গানটি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শুধু নামকরণই করা হয়েছে।

আমি উপন্যাসটি পড়েছিলাম কেন্টাকির লেক্সিংটন শহরে থাকাকালীন, ঘুঘু ডাকা কোনো এক নিঃশব্দ দুপুরে। যারা মুরাকামির লেখা পড়েছেন, তাদের অনেকেরই এমন দাবি—বইগুলোর একেকটি চরিত্র কিছুটা হতাশা, একাকীত্ব, আর নৈশব্দ জাগিয়ে তোলে। গ্রীষ্মে কেন্টাকির দিনগুলোও অনেকটা এমনই কেটেছে, বইটি পড়ে। বইটি শেষ করার পরও মনে হয়েছে—কিছু চরিত্র কোথাও আমাদের আশপাশেই রয়ে গেছে, চুপচাপ আর নীরব হয়ে।

হয়তো আমার মতোই এই উপন্যাসের কথক তোরু ওয়াতানাবে, উড়োজাহাজের ভেতর বিটলসের গানটি শুনে হঠাৎ ফিরে যায় তার ছাত্রজীবনের স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির কেন্দ্রে রয়েছে বন্ধু কিজুকির আত্মহত্যা এবং কিজুকির প্রেমিকা নাওকোর সঙ্গে তার অসম্পূর্ণ সম্পর্ক। নাওকো চরিত্রটি মানসিকভাবে ভঙ্গুর। এখানে আমরা দেখতে পাই তোরু যতই চেষ্টা করে তাকে বোঝার, কিন্তু নাওকো কোনোভাবেই তার হতাশাগুলো থেকে বেরোতে পারে না। মুরাকামি এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই কিছু মানুষের মধ্যে হতাশা স্বভাবজাত।

মুরাকামি এই উপন্যাস সম্পর্কে কোনো একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা যারা সব সময়েই মনে করি মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক থাকবে, কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়। হতাশার মাত্রা কিছু মানুষের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই স্বভাবজাত হয়ে থাকে, যা লেখক নাওকো চরিত্রটির মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন।

গল্পটি এগোতে থাকে নানা স্মৃতির মধ্য দিয়ে। এই উপন্যাস মূলত হারানো মানুষের গল্প। যারা কাউকে হারিয়েছে, যারা মানসিক শূন্যতার ভেতর দিয়ে গেছে। উপন্যাসটির বিষণ্ণতা অনেকের জন্য ভারী লাগতে পারে। এখানে আশাবাদের আলো ক্ষীণ, বাস্তবতা নির্মম। একইসঙ্গে নাওকোর চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানসিক অসুস্থতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

তার বিপরীতে আসে মিডোরি, প্রাণবন্ত ও জীবনমুখী এক তরুণী। মিডোরির জীবনেও সংগ্রাম রয়েছে। মিডোরির দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় তার অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে। পরিবারে বড় বোন আর একটি বইয়ের দোকান—এ নিয়েই মিডোরির নিত্যদিন প্রবাহিত হতে থাকে। কিন্তু এই চরিত্রটি হতাশা বা শোক দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় না। দুটো পুরোপুরি বিপরীত চরিত্র দিয়ে লেখক তোরুর জীবনের দুই বিপরীত মেরুকে দেখিয়েছেন। নাওকো, একদিকে যেমন স্মৃতি ও বিষণ্ণতা, অন্যদিকে মিডোরি, তোরুর বর্তমান ও সম্ভাবনা।

উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর জাদুবাস্তবতার ভাষা ও আবহ। স্বাভাবিকভাবেই মুরাকামির লেখনী গভীর, মানবমনের বিভিন্ন কল্পনা, চাওয়া এবং না পাওয়ার মিশ্রণ, যা আমরা তার অন্যান্য উপন্যাস, যেমন: ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এও দেখতে পাই। টোকিওর ছাত্রজীবন, ডরমিটরি, ক্যাফে, হাঁটার পথ, বুকশপ—সবকিছুতেই আছে এক ধরনের নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য। উঠে এসেছে জাপানের সেই সময়কালের ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কথাও।

শেষ পর্যন্ত ‘নরওয়েজিয়ান উড’ আমাদের কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয় না। এই উপন্যাসে মুরাকামি দেখাতে চেয়েছেন, জীবনের সব ক্ষত সারে না। তবুও মানুষ গ্রিক মিথলজির চরিত্র সিসিফাসের মতোন বেঁচে থাকে। তোরু, নাওকো কিংবা মিডোরি—তারা কেউই নিখুঁত নয়। আর সেখানেই চরিত্রগুলো আমাদের আপন হয়ে ওঠে।

শেষমেশ এই উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিঃসঙ্গতা ব্যক্তিগত হলেও তা একান্ত নয়। কোথাও, কোনো বইয়ের পাতায়, কেউ না কেউ ঠিক আমাদের মতো করেই অনুভব করছে। আর সেই উপলব্ধিটুকুই ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।