গরমের দিনের পুষ্টিকর যেসব খাবার হারিয়ে যাচ্ছে

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

গরম মানেই একসময় ছিল কিছু বিশেষ খাবারের ঋতু। শুধু আম, তরমুজ, লিচু নয়—গরমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এমন কিছু দেশি খাবার, যেগুলো শরীর ঠান্ডা রাখত, পেট সামলাত, ক্লান্তি কাটাত, আবার একটা সংস্কৃতিও বয়ে আনত। দুপুরের পর মাটির গ্লাসে মাঠা, রোদ থেকে ফিরে বেলের শরবত, পান্তার সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা আম পোড়া, ভিজিয়ে রাখা চিড়া—এসব ছিল জীবনযাপনের অংশ।

আজ গরম বেড়েছে, হিটওয়েভ নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে কমে গেছে গরমের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো। ফ্রিজ আছে, বোতলজাত পানীয় আছে, আইসক্রিম আছে, এনার্জি ড্রিংক আছে—তবু কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই খাদ্যজ্ঞান, যা বহু প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছিল এই ভূখণ্ডের আবহাওয়া বুঝে।

এই হারিয়ে যাওয়া খাবারগুলোর গল্প আসলে শুধু স্বাদের গল্প নয়। এটা জীবনযাত্রা বদলের গল্পও।

এমন কিছু পুষ্টিকর খাবার নিয়ে কথা বলেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রেইনি চিকিৎসক অনিক সিংহ (এমবিবিএস: স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, এফসিপিএস—ইন্টারনাল মেডিসিন: শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ)।

মাঠা

একসময় দুপুরে ভাতের পর মাঠা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল বহু ঘরে। দই, পানি, লবণ—কখনো ভাজা জিরা, কখনো ধনেপাতা, কখনো সামান্য কাঁচামরিচ। এই সহজ পানীয় শুধু স্বস্তি দিত না, শরীরের পানিশূন্যতাও কিছুটা সামলাত।

গ্রামের হাটে, পুরান ঢাকার খাবারের দোকানে, এমনকি মহল্লার ছোট দোকানেও মাঠা মিলত। এখন তা প্রায় বিরল। শহরে 'লাচ্ছি' টিকে গেছে, কিন্তু মাঠা যেন হারিয়ে গেছে।

কারণটা শুধু স্বাদের বদল নয়। মাঠা বানাতে সময় লাগে, যত্ন লাগে। বোতলজাত পানীয় খুলে খাওয়া সহজ। আর সহজের কাছে পরাজিত হয়েছে ধীর যাত্রার খাদ্যসংস্কৃতি।

বেলের শরবত

গরমের দিনে বেলের শরবত একসময় ঘরের জিনিস ছিল। শুধু রোজা বা অসুস্থতার পানীয় নয়, এটা ছিল মৌসুমি অভ্যাস। বেল ফাটানো, শাঁস বের করা, ভিজিয়ে ছেঁকে শরবত বানানো—একটা ছোট্ট আচার ছিল যেন।

আজ অনেক শিশুই হয়তো বেলের শরবতের স্বাদ চেনে না। তার বদলে চেনে প্যাকেটের জুস। অথচ বেল ছিল একেবারে এই অঞ্চলের জলবায়ুভিত্তিক খাদ্যবুদ্ধির অংশ। তাপ, পেটের অস্বস্তি, গরমের ক্লান্তি—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল।

গাছ কমেছে, বাড়ির উঠোন কমেছে, রান্নাঘরের সময় কমেছে—বেলের শরবতও তাই কমেছে।

ভেজা চিড়া

চিড়া ভিজিয়ে কলা, দুধ, গুড়, কখনো দই দিয়ে খাওয়ার চল ছিল গরমে। কেউ শুধু ঠান্ডা পানি দিয়ে ভিজিয়ে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে খেত। এটা ছিল দ্রুত বানানো, হালকা, ঠান্ডা এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য ব্যবহারিক খাবার।

আজ ‘ওটস’ স্বাস্থ্যকর হিসেবে ফিরে এসেছে, কিন্তু চিড়া—যা বহু আগে থেকেই আমাদের ঘরে ছিল—তার প্রচলন কমেছে।

খাবারের মধ্যেও শ্রেণিবোধ কাজ করে। কিছু খাবার ‘গ্রাম্য’ তকমা পেয়ে হারিয়ে যায়। চিড়ার ক্ষেত্রেও হয়তো তা হয়েছে।

পান্তা

পহেলা বৈশাখে পান্তা নিয়ে অনেক উদযাপন হয়ে থাকে এখন। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে গরমে পান্তা খাওয়ার অভ্যাস প্রায় উধাও।

অথচ কৃষিজীবী সমাজে পান্তা ছিল কার্যকর গরমের খাবার। ভেজা ভাত, পানি, লবণ—সরল হলেও তৃপ্তিদায়ক। রোদে কাজ করা মানুষের জন্য এটা ছিল বাস্তবেই উপকারী এক খাবার।

আজ পান্তা প্রায় প্রতীক হয়ে গেছে। পোস্টারে আছে, রেস্টুরেন্টের মেনুতে আছে, কিন্তু বাড়ির সকালের টেবিলে কম। যখন কোনো খাবার ব্যবহার থেকে সরে গিয়ে কেবল সাংস্কৃতিক চিহ্নে পরিণত হয়, তখন তার জীবন্ত ভূমিকা কমে যায়।

কাঁচা আম পোড়া/ আমপানা

গরমে কাঁচা আম পোড়া দিয়ে শরবত বানানোর চল ছিল বহু অঞ্চলে। কেউ বলত ‘আমপোড়া শরবত’, কেউ বলত ‘আমঝোল’।

চুলায় বা কয়লায় আম পুড়িয়ে তার শাঁস, লবণ, চিনি, কখনো বিট লবণ মিশিয়ে বানানো হতো এই পানীয়।

এটা এখনো আছে, কিন্তু আগের মতো নেই। কারণ এই খাবার দোকান-নির্ভর নয়, ঘর-নির্ভর। আর আমরা ঘরে কম বানাই। এ ধরনের খাবার হারায় তখনই, যখন সময়ের চাপে শুধু নৈমিত্তিক খাবারগুলোই আমরা খাই।

তালের শাঁস, তালমিছরি, তালপানা

আগে গরমে রাস্তার ধারে তালশাঁস দেখা যেত। বরফশীতল না, কিন্তু নিজস্ব ঠান্ডা অনুভূতি ছিল। তালপানা বা তালরসের ব্যবহারও ছিল কোথাও কোথাও।

এখন শহুরে ফলবাজারে এগুলো খুব কম চোখে পড়ে। কারণ এগুলো সংরক্ষণ-নির্ভর পণ্য নয়। দ্রুত বিক্রি করতে হয়, যত্ন লাগে, মৌসুমি ফল।

মৌসুমি জিনিসই এখন বাজারে টেকানো কষ্টকর। কারণ বাজার এখন চায় সারা বছরের পণ্য।

ঘোল

ঘোল একসময় গরমের অপরিহার্য পানীয় ছিল। বিশেষ করে দুপুরে। অনেক পুরোনো খাবারের দোকানে ঘোল মানে ছিল ঠান্ডা অনুভূতি ও স্বস্তি।

এখন ঘোল শব্দটাই অনেকের কাছে অচেনা। কিন্তু তার জায়গা নিয়েছে ব্রান্ডেড লাচ্ছি কিংবা সফট ড্রিংক। এটা শুধু খাদ্য প্রতিস্থাপন নয়, সংস্কৃতির প্রতিস্থাপনও।

শসা-লবণ, তরমুজ-গুড়, ছোট ছোট অভ্যাস

হারিয়ে যেতে বসা সব খাবারই খুব যে বড় কিছু, তা নয়। কিছু ছিল ছোট অভ্যাস।

রোদ থেকে ফিরে শসা কেটে লবণ দিয়ে খাওয়া। বাঙ্গির সঙ্গে সামান্য গুড়। কাঁচা তেঁতুল ভিজিয়ে শরবত। ধনেপাতা-পুদিনা বাটা দিয়ে পাতলা ঠান্ডা পানীয়।

এসব আজ ‘রেসিপি’ হয়ে গেছে, অভ্যাসের জায়গায় আর নেই। এটাই বদল।

কেন হারাচ্ছে?

প্রথম কারণ, নগরজীবনের গতি। যে খাবার বানাতে সময় লাগে, সেগুলো টিকে থাকতে পারছে না।

দ্বিতীয় কারণ, বাজার। যা প্যাকেটজাত করা যায়, তা টিকে যায়। যা হাতে বানাতে হয়, তা হারায়।

তৃতীয় কারণ, অভিজ্ঞতা না থাকা। অনেক তরুণ জানেই না গরমে মাঠা বা আমপোড়া শরবত কেন খাওয়া হতো।

চতুর্থ কারণ, খাদ্যকে আধুনিকতার মানদণ্ডে মাপা। দেশি খাবারকে পুরোনো ভাবা, বিদেশি বা প্রসেসড জিনিসকে উন্নত ভাবা—এই মানসিকতাও ভূমিকা রেখেছে।

খাবারগুলো ফিরছে অন্য নামে

মজার বিষয় হলো, যেসব খাবার হারাচ্ছে, সেগুলো অন্য নামে আবার ফিরে আসছে।

মাঠা ‘প্রোবায়োটিক ড্রিংক’ হয়ে ফিরছে। চিড়া ‘ফ্ল্যাটেনড রাইস বোল’ হয়ে ফিরছে। বেলের শরবত ‘ডিটক্স’ নামে জায়গা পাচ্ছে। পান্তা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

অর্থাৎ, খাবারগুলো হারিয়ে যায়নি পুরোপুরি। আমরা হয়তো নিজেদের মাটির জিনিস চিনতে ভুলে গেছি।

খাদ্য, জলবায়ু আর লোকজ জ্ঞান

আজ যখন গরমকে শুধু আবহাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তখন মনে রাখা দরকার—মানুষ বহুদিন ধরেই গরমের সঙ্গে বাঁচার উপায় বানিয়েছে। খাবার ছিল তার বড় অংশ।

লোকজ খাদ্যজ্ঞান কোনো কুসংস্কার ছিল না। অনেক সময় তা ছিল পরিবেশ-অভিযোজন। যে ভূখণ্ডে গরম বেশি, সেখানে হালকা, পানিসমৃদ্ধ, ফারমেন্টেড বা ঠান্ডা প্রকৃতির খাবার তৈরি হওয়াটা অকারণে নয়। এই জ্ঞান হারানো মানে শুধু স্বাদ হারানো নয়, টিকে থাকার বুদ্ধিও হারানো।

ফিরে দেখা কি সম্ভব?

হয়তো সব ফিরবে না। কিন্তু কিছু ফিরতে পারে।

গরমে ঘরে একদিন মাঠা বানানো। এক গ্লাস বেলের শরবত। কোনো এক সকালে ভেজা চিড়া। দুপুরের খাবারের পর কাঁচা আম পোড়া। এগুলো নস্টালজিয়া নয়, খাবার পুনরুদ্ধার ও আবার প্রচলনের মাধ্যমও হতে পারে।

খাবার ফিরিয়ে আনা মানে শুধু রেসিপি ফিরিয়ে আনা নয়—একটা জীবনদৃষ্টি ফিরিয়ে আনা। যে দৃষ্টি জানত, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই শুধু যন্ত্র দিয়ে হয় না, খাদ্য দিয়েও হয়।

আজকের দিনে গরম আগের চেয়ে তীব্র। কিন্তু আমাদের খাবারের স্মৃতি যেন উল্টো দুর্বল। যে মাঠা, ঘোল, বেলের শরবত, পান্তা, চিড়া দিয়ে মানুষ একসময় গরমের দিন পার করত, সেগুলো এখন স্মৃতির কোণে। তাই হারিয়ে যাওয়া এই খাবারগুলোকে ফিরে দেখার সময় এসেছে, কারণ এগুলো শুধু পুরোনো দিনের স্বাদ নয়—এগুলো এই অঞ্চলের জলবায়ু, জীবনযাপন আর বেঁচে থাকার জ্ঞানের অংশ।