কোরবানি ঈদের আনন্দ কোথায় বেশি—শহর নাকি গ্রামে?
‘যখন গ্রামে ঈদ করতাম, তখন আত্মীয়দের বাড়িতে মাংস পাঠানো হতো। তারাও আমাদের বাড়িতে মাংস দিতে আসত। মাংসের সঙ্গে একটু সেমাই মুখে দিতে দিতে গল্প হতো—কে কোথায়, কয়টায় ঈদের নামাজ পড়েছে, কার গরু বা খাসি কোরবানির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল...কিন্তু ঢাকায় সেই আমেজটা তেমন নেই। শহর ও গ্রামে ঈদের পার্থক্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বয়সের প্রভাব। শৈশব ও কৈশোরের আনন্দ-উত্তেজনা পরিণত বয়সে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বাবা বেঁচে থাকতে গ্রামে ঈদ করতাম। এখন আর কোরবানির ঈদে বাড়ি যাওয়া হয় না। সবমিলিয়ে আমার কাছে গ্রাম ও শহরের ঈদের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে।’
ঈদ নিয়ে এই স্মৃতির কথা বলছিলেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী নুসরাত জাবীন বিভা।
ঈদ একটি আনন্দের দিন। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সবাই কোরবানির আত্মত্যাগের মহিমায় অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতি বছর নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি আদায় করে থাকেন। শহুরে জনজীবনে অভ্যস্ত মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ এক রকম, আবার যারা গ্রামের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, তাদের কাছে ঈদের আনন্দ ভিন্ন রকম। কিন্তু উৎসব মানেই তো আনন্দ। তাহলে এই আনন্দের ভিন্নতা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তরে সংবাদকর্মী মারুফ ইসলাম বলেন, ‘গ্রাম এবং শহর—দুই জায়গাতেই ঈদ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার। গত বছরের কোরবানির ঈদ ঢাকাতেই করেছি। তবে আমার কাছে গ্রামের ঈদই বেশি ভালো লাগে। যেহেতু গ্রামে বড় হয়েছি, সেটাও হয়তো ভালো লাগার একটি কারণ। শহরের ঈদে প্রাণ খুঁজে পাই না। হয়তো এখানে শেকড়ের টান অনুভব করি না। আত্মীয়স্বজন নেই, পাড়া-প্রতিবেশী নেই। কর্মসূত্রে পরিচিত কিছু মানুষ রয়েছেন। কিন্তু তাদের চেহারাতেও যেন শেকড় হারানোর অনুভূতি, এক ধরনের প্রাণহীনতা। এসব কারণেই আমার কাছে শহরের ঈদ ঠিক ঈদের মতো মনে হয় না। আবার যে মানুষ শহরেই বেড়ে উঠেছে, তার কাছে হয়তো এই শহরের ঈদই ভালো লাগে। আসলে এটি যার যার অনুভূতির ব্যাপার।’
বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। বেশিরভাগ মনে করেন, গ্রামে কোরবানির ঈদের আনন্দ বেশি। এই বিষয়ে বেশকিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে গ্রামের ঈদের আনন্দ শহুরে ঈদের আনন্দকে ছাপিয়ে যায়।
কোরবানির পশু কেনা
গ্রামাঞ্চলে সাধারণত অনেকেই বাড়িতে গরু বা ছাগল লালন-পালন করেন। তাই কোরবানির পশু কেনার সময় এলাকার পরিচিত মানুষের কাছ থেকে কিংবা বিভিন্ন গরু-ছাগলের হাটে গিয়ে সহজেই পশু কেনা যায়। এজন্য আলাদা করে খুব বেশি ধকল পোহাতে হয় না। গ্রামে গরু বা ছাগল কেনার অভিজ্ঞতাও আলাদা। কারণ সেখানে পশুগুলো অনেক সময় প্রাকৃতিক পরিবেশে লালন-পালন করা হয়।
অন্যদিকে, শহরে নির্দিষ্ট পশুর হাট থেকে গরু-ছাগল কিনতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমেই কেনাবেচা সম্পন্ন হয়। এছাড়া শহরের হাটে আনা অনেক গরুকেই মোটাতাজাকরণের বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানো হয়। ফলে পশুর স্বাস্থ্য ও মান যাচাইয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
গরুর আকারের পার্থক্য
শহরের ঈদ মানেই যেন বিশাল আকারের গরুর কোরবানি, আর গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ছোট বা মাঝারি আকারের গরুই বেশি কোরবানি দেওয়া হয়।
কোরবানির পশু কেনার পর যত্নআত্তি
গ্রামাঞ্চলে পশু কেনার পর থেকেই যেন উৎসবের আমেজ শুরু হয়। পরিবারের শিশুরা আনন্দ-উত্তেজনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোরবানির গরু বা খাসিটি বাড়ির আঙিনায় রাখা হবে, নাকি পাশের কোনো ফাঁকা জায়গায়, এ নিয়েও চলে নানা আলোচনা। বাড়িতে আনার পর কে আগে গরু বা ছাগলকে ঘাস বা খড় খাওয়াবে, কে আগে তার গায়ে হাত বুলাবে—এসব নিয়েও সবার মধ্যে আগ্রহ থাকে।
পরিবারের কর্তা ব্যক্তি পশু কিনতে যাওয়ার পর থেকেই শিশুরা বারবার দরজার দোরগোড়ায় উঁকিঝুঁকি মারে, কখন আসবে তাদের কাঙ্ক্ষিত নতুন অতিথি। সব মিলিয়ে এক নির্মল আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
শহরের দৃশ্যপটটি এক্ষেত্রে বেশ ভিন্ন। শহরে কোরবানির পশু কিনে এনে সাধারণত বাসার নিচের গ্যারেজে রাখা হয় এবং ঈদের দিন পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্ব অনেক সময় দারোয়ান বা কেয়ারটেকারের ওপর থাকে। ফলে কোরবানির পশুর সঙ্গে শহুরে শিশুদের সম্পৃক্ততা বা ঘনিষ্ঠতা তেমনিভাবে তৈরি হয় না। আনন্দের অনুভূতির জায়গায়ও কিছুটা ব্যবধান থেকে যায়। পশু আনার পর হয়তো একবার দেখে আসা বা পরে আরও কয়েকবার দেখা, এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে।
গ্রামে কাঁঠালপাতা থাকে গাছের ডালে, আর শহরে ঝুলে থাকে রাস্তার ধারে
কোরবানির পশুকে খাওয়ানোর জন্য গ্রামে আলাদা করে ঘাস, খড় বা কাঁঠালপাতা কেনার প্রয়োজন হয় না। কারণ নিজেদের বাড়িতে বা আশেপাশেই এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। শিশুদের দেখা যায়, কেউ কাঁঠালপাতা এনে ছাগলের সামনে ধরছে, আবার কেউ খড় এনে গরুর সামনে দিচ্ছে। তাদের চোখেমুখে থাকে একদিকে গরু-ছাগলের কাছে যাওয়া ভয়, অন্যদিকে কাছে যেতে পারার আনন্দ ও বিজয়ের হাসি। ঈদের আগ পর্যন্ত কোরবানির পশুটি যেন পরিবারের একজন সদস্য হয়ে ওঠে; পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে পশুটিকে ঘিরে দিনের অনেকটা সময় কাটায়।
শহরে পশুখাদ্য কেনার কোনো বিকল্প থাকে না। ঈদের আগে বিভিন্ন জায়গায় পশুখাদ্য বিক্রি করা হয়, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় খাবার এনে কোরবানির পশুকে খাওয়াতে হয়। এসব কাজে শিশুদের বা পরিবারের অন্য সদস্যদের খুব একটা অংশগ্রহণ দেখা যায় না। হয়তো শহুরে ব্যস্ততাই তাদের আবেগকে অনেকটা আড়াল করে দেয়।
কোরবানি সম্পন্ন করতে সবার অংশগ্রহণ
এই জায়গাটিতেও গ্রাম ও শহরের ঈদ আনন্দের মধ্যে রয়েছে একটি বড় পার্থক্য। গ্রামে কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর কসাই বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা কোরবানির মাংস প্রসেসিং শুরু করেন। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। ছোট-বড় অনেকেই আগ্রহ নিয়ে বটি বা চাকু নিয়ে যে যেটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, মাংস কাটার কাজে বসে যায়। মাংস ঠিকঠাকভাবে কাটা হচ্ছে কি না সেটা মূল বিষয় নয়, অংশগ্রহণটাই যেন এক আনন্দের বিষয়।
শুধু তাই নয়, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরাও হাতে-হাতে কাজ এগিয়ে নিতে একে অন্যের পাশে দাঁড়ান। কোরবানির ঈদের দিনে কমবেশি সবারই ব্যস্ততা থাকে। তবে এই আন্তরিকতা পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
শহরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত কসাই পুরো মাংস প্রসেস করে দিয়ে থাকেন।
এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. তাসাক খারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গ্রামে কোরবানির আলাদা আনন্দ ও আন্তরিকতা থাকে। সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে এবং একে অপরকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। শহরের তুলনায় গ্রামে কোরবানির পরিবেশ বেশি স্বাভাবিক ও সামাজিক মনে হয় আমার কাছে। এছাড়াও, কোরবানির মাংস আমাদের গ্রামের সব পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়ার একটি সুন্দর সংস্কৃতি রয়েছে।’