ঈদ আনন্দ

ঈদের একাল-সেকাল

রবিউল কমল
রবিউল কমল

ঈদ এলেই চারদিকে অন্যরকম আনন্দ শুরু হয়। নতুন জামা, গরুর হাট, মজার রান্না, আত্মীয়দের আসা-যাওয়া, সব মিলিয়ে জমে ওঠে উৎসব। কিন্তু জানো কি, আজ থেকে ৩০–৪০ বছর আগে কোরবানির ঈদের আনন্দ  ছিল একটু অন্যরকম?

তখন ছিল না মোবাইল ফোন, অনলাইন গরুর হাট কিংবা ফেসবুকে গরুর ছবি পোস্ট করার ঝামেলা! সেই সময়ের ঈদ আর আজকের ঈদের মধ্যে আছে অনেক পার্থক্য। চলো, ঘুরে আসি কোরবানির ঈদের একাল-সেকালের গল্পে।

আগে কোরবানির গরু কিনতে যাওয়া ছিল বিশাল এক অভিযান। বাবা, চাচা, দাদা—সবাই মিলে ভোরে হাটে যেতেন। হাট ছিল কাদামাখা মাঠে। চারদিকে শুধু গরু আর গরু!

কেউ গরুর শিং দেখে, কেউ দাঁত দেখে, কেউ আবার লেজ ধরে পরীক্ষা করত। আর দরদাম! উফ!
একজন বলছে, পঞ্চাশ হাজার!

আরেকজন বলছে, না না, এত দাম হবে না!

শিশুরা তখন গরুর পেছন পেছন ঘুরত। কেউ ভয় পেত, কেউ সাহস করে গরুর গায়ে হাত বুলাত।
এরপর গরু কিনে বাড়িতে আনা হতো। তখন শুরু হতো আনন্দের আরেক পর্ব, সবাই মিলে গরুর নাম রাখা!

কারো গরুর নাম ‘কালা মানিক’, কারো ‘সুলতান’, কারও ‘লালু’… আরও কত কত নাম!

কয়েকদিনে গরুটা খুব আপন হয়ে যেত। বিশেষ করে শিশুকিশোরদের কথা বলতেই হবে। কেউ কলা খাওয়াত, কেউ ঘাস এনে দিত, কেউ আবার গরুর সঙ্গে ছবি তুলতে চাইত—যদিও তখন খুব কম মানুষের কাছে ক্যামেরা ছিল।

আজকাল কোরবানির মাংস ফ্রিজে রেখে অনেকদিন খাওয়া যায়। কিন্তু আগে গ্রামের অনেক বাড়িতে ফ্রিজ ছিল না। তাই মাংস দ্রুত আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো।

কোরবানির পরপরই কেউ থালা নিয়ে আসত, কেউ হাঁড়ি নিয়ে। সবাই মিলে আনন্দ করতে করতে মাংস কুড়াতো।

শিশুরা প্রতিবেশীদের বাড়িতে, আত্মীয়দের বাড়িতে মাংস পৌঁছে দিত। এসময় তাদের খুশি ছিল দেখার মতো, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে!

আগে যৌথ পরিবার বেশি ছিল। তাই ঈদে পুরো বাড়ি আত্মীয়-স্বজনে গমগম করত। রান্নাঘরে বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হতো। দাদিরা রান্না করতেন, আর শিশুরা রান্নাঘরের পাশে ঘুরঘুর করত। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল গরম ভুনা ও কলিজা ভাজি!

তবে এখনকার ঈদ অনেক বদলে গেছে। এখন কেউ কেউ ঘরে বসেই মোবাইলে গরু দেখে কিনে ফেলে! অনলাইনে ভিডিও দেখে গরু পছন্দ করা যায়। অথচ আগে গরুর হাটে যেতে হতো। এখন অনেক সময় গরুই চলে আসে বাসার নিচে। সবাই মিলে হাট থেকে গরু কেনার সেই আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে।

আবার এখন ঈদ মানেই ছবি তোলা!

গরুর সঙ্গে সেলফি, নতুন জামার ছবি, রান্নার ছবি—সবই ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যায়।

আগে মানুষ ঈদের শুভেচ্ছা দিতে বাড়িতে যেত। এখন অনেকে মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়েই কাজ শেষ করে।

আগে বেশিরভাগ মানুষ বাড়ির উঠোনে কোরবানি দিত। এখন শহরে অনেকেই অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। তাই নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানি করা হয়।

শিশুরা আগের মতো গরুর সঙ্গে অনেক সময় কাটাতে পারে না। তবে এখন অনেক জায়গায় শিশুদের জন্য ছোট ছোট পশুর খামার দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

তাহলে কি এখন ঈদের আনন্দ কমে গেছে। একদমই না!

সেকালের ঈদে ছিল সরল আনন্দ।

একালের ঈদে আছে প্রযুক্তির মজা।

আগে মানুষ একসঙ্গে বেশি সময় কাটাত। এখন মানুষ ব্যস্ত, কিন্তু প্রযুক্তির কারণে দূরের মানুষও ভিডিও কলে একে অন্যকে দেখতে পারে।

তাই দুই সময়ের ঈদের আছে আলাদা সৌন্দর্য।