যে ঈদগুলো আর ফিরে আসবে না

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

একটা সময় ঈদের আগের রাতে অনেকেরই ঘুম আসত না। এখনো আসে না। তবে কারণটা বদলে গেছে। আগে ঘুম আসত না পরদিন কী হবে সেই উত্তেজনায়। এখন ঘুম আসে না কারণ মাথার ভেতরে একটা পুরোনো স্মৃতি ভাসতে থাকে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে দাদার বাড়ির উঠোন, শিরীষ গাছের নিচে বাঁধা গরু, ভোরের আলোয় দাদির রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মশলার গন্ধ। সেই গন্ধটা আর কোথাও পাওয়া যায় না।

অনেক বাড়িতে গরু আসত ঈদের তিন-চার দিন আগে। সেটা শুধু কোরবানির প্রস্তুতি ছিল না—একটা ঘোষণা ছিল। গরু এলে মনে হতো ঈদ এসে গেছে। বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকত না, সোজা চলে যেত উঠোনে। কেউ গরুর গা চাপড়ে দেখছে, কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ নাম রাখছে।

কারো কারো বাড়িতে একটার নাম রাখা হতো মোটু। কারণ সে সত্যিই মোটাসোটা। আরেকটার নাম লালু—গায়ে লালচে আভা ছিল বলে।

ঈদের সকালে সেই নামগুলো আর কেউ মুখে আনত না। বড় হয়ে অনেকে বুঝেছে—বাচ্চারা জানত কী হতে যাচ্ছে, তারপরও নাম রাখত। এটা বোকামি ছিল না। এটা ছিল স্নেহ।

এখন অনেক জায়গায় গরু আসে ঈদের আগের রাতে। পরদিনই চলে যায়। নাম রাখার সময় নেই, জায়গাও নেই। ফ্ল্যাটের নিচে পার্কিংয়ে বাঁধা থাকে। ছায়া নেই, মাটি নেই। মোটু বা লালুর মতো গরু বোধহয় আর খুব বেশি আসে না।

কারো কারো দাদার বাড়ির ঈদ মানেই ছিল একটা নির্দিষ্ট দৃশ্য। ফজরের নামাজের পর দাদা ঘরে ঢুকতেন চুপচাপ। কাউকে ডাকতেন না। শুধু একজন একজন করে সবার কপালে হাত রাখতেন—ঘুমন্ত হলেও। কিছু বলতেন না। মনে মনে দোয়া পড়তেন, ঠোঁট একটু নড়ত। হাত সরিয়ে নেওয়ার আগে মাথায় হালকা চাপ দিতেন। সেই হাতের চাপ অনেকের এখনো মনে আছে।

দাদারা চলে গেছেন বহু বছর। এখন ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠলে মাথায় হাত রাখার মানুষ থাকে না। মানুষ উঠে দাঁত ব্রাশ করে, নাশতা করে, দিনের কাজ শুরু করে। জীবন চলতেই থাকে। তবু কোনো কোনো সকালে বুকের ভেতরে হঠাৎ চাপ লাগে—যেন সেই পুরোনো হাতের স্পর্শটা এখনো কোথাও রয়ে গেছে।

নানাবাড়ির ঈদ ছিল আরেক জগৎ। সেখানে মানুষ আসত দূর-দূরান্ত থেকে। মামা, খালা, ফুফাতো কিংবা খালাতো ভাইবোন—দুই-তিন দিন আগে থেকেই বাড়ি ভরে যেত। রাতে ঘুমানোর জায়গা কম পড়ত, কিন্তু অভিযোগ থাকত না। কেউ মেঝেতে, কেউ বারান্দায়, কেউ চাটাই পেতে ঘুমিয়ে পড়ত। ভোরে উঠে দেখা যেত কেউ উঠোনে বসে দাঁত মাজছে, কেউ কুয়ো থেকে পানি তুলছে।

নানিরা রান্না একা করতেন না। পাড়ার মহিলারাও এসে যোগ দিতেন। সবাই মিলে রান্না হতো। সেটা সাহায্য ছিল না, একটা অনুষ্ঠান ছিল। রান্না করতে করতে গল্প চলত, হাসি চলত, কখনো কখনো ছোটখাটো মনোমালিন্যও হতো। কিন্তু সন্ধ্যার আগেই সব ঠিক হয়ে যেত।

এখন সেই বাড়িগুলোর অনেকগুলোতেই তালা ঝোলে। পাড়ার মানুষ ছড়িয়ে গেছে কোথায় কোথায়। যে রান্নাঘর একসময় ধোঁয়া আর কোলাহলে ভরা থাকত, সেখানে এখন মাকড়সার জাল।

সালামি নিয়েও ছিল আলাদা এক উত্তেজনা। তবে সেটা শুধু টাকার জন্য ছিল না। ঈদের সকালে যত বেশি বড়দের সালাম করা যায়, তত ভালো। চাচা, ফুপু, চাচি, দূরের আত্মীয়—সবাইকে। কেউ ১০ টাকা দিতেন, কেউ ২০, কেউ আবার ৫০। বিকেলে বসে হিসাব হতো কার কত জমল।

কিন্তু আসলে টাকাটা বড় ছিল না। বড় ছিল সেই মুহূর্তটা। বড়রা মাথায় হাত রেখে বলতেন, ‘বড় হও।’ এই কথাটার দাম তখন বোঝা যেত না।

এখন অনেক চাচা থাকেন দেশের বাইরে, কেউ চট্টগ্রামে, কেউ ঢাকায়। ঈদের দিন বিকাশে টাকা চলে আসে। ফোনে নোটিফিকেশন ভেসে ওঠে। টাকাটা ঠিকই আসে। মাথায় হাত রেখে ‘বড় হও’ বলার মানুষটা আসে না।

Eid
ছবি: সংগৃহীত

গ্রামের ঈদে একটা বিষয় ছিল— গোলমাল। কিন্তু সেটা বিরক্তির গোলমাল ছিল না। সেটা ছিল প্রাণের শব্দ।

উঠোনে কোরবানি হচ্ছে, পাশে বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। কেউ তাদের সরানোর চেষ্টা করছে, কেউ শুনছে না। ভেতরে রান্নাঘরে কড়াইয়ের শব্দ উঠছে। পুরুষেরা গোশত ভাগ করছেন, কে কতটুকু পাবে তা নিয়ে মৃদু তর্ক চলছে। পাড়ার ছেলেরাও এসে দাঁড়িয়েছে—তারাও কিছু একটা করতে চায়। দূরে মসজিদের মাইকে তখনো দোয়া পড়া হচ্ছে। সবকিছু একসঙ্গে চলত, একই ফ্রেমে।

এখন ঈদের দিন অনেক বেশি শান্ত। ফ্ল্যাটবাড়িতে শব্দ কম। প্রতিবেশী কে, সেটাও অনেকে জানে না। উঠোন নেই, তাই সেই বিশৃঙ্খলাও নেই। সবকিছু গোছানো, পরিপাটি। পরিপাটি জিনিস দেখতে সুন্দর লাগে। কিন্তু সব সুন্দর জিনিস মনে থেকে যায় না।

ছোটবেলার ঈদের কথা মনে করতে গেলে প্রথমে অনেকের চোখে ছবি ভেসে ওঠে না। আগে আসে গন্ধ।

ভোরে মাটির উঠোনে পানি ছিটানোর গন্ধ। একটু ভেজা, একটু কাঁচা মাটির গন্ধ। রান্নাঘরের ধোঁয়া, যা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ত। আতরের বোতল খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসা তীব্র ঘ্রাণ। এমনকি কাঁচা মাংসের গন্ধও।

আরেকটা জিনিস আছে, যেটা নিয়ে খুব কম কথা হয়। ঈদের দিন বিকেলে, যখন খাওয়াদাওয়া শেষ, মেহমানেরা চলে গেছেন, বাচ্চারা ক্লান্ত—তখন বাড়ির বয়স্ক মানুষগুলো বারান্দায় বসে থাকতেন চুপচাপ। হাতে এক কাপ চা, চোখ দূরে কোথাও।

সেই সময়টায় কেউ খুব একটা বিরক্ত করত না তাদের। সবাই বুঝত—এই সময়টা তাদের নিজের।

বড় হওয়ার পর অনেকে বুঝতে পারে, সেই চুপচাপ বসে থাকাটার ভেতরেও হয়তো স্মৃতি ছিল। হয়তো তারাও তখন ভাবতেন আরও পুরোনো কোনো ঈদের কথা। তাদের দাদা-নানাদের কথা। তাদের হারিয়ে যাওয়া উঠোনের কথা।

প্রতি প্রজন্মই কিছু না কিছু হারায়। শুধু হারানোর জিনিসগুলো বদলে যায়।

এখনো ঈদের চাঁদ উঠলে কেউ কেউ ছাদে যায় একা। কিছুক্ষণ ফোন বন্ধ রাখে। শহরের আলোর ফাঁকে চাঁদটা খোঁজে। পেয়েও যায়। তারপর চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।

হয়তো তখন মনে পড়ে কোনো পুরোনো উঠোনের কথা। কোনো গরুর নাম। কোনো রান্নাঘরের গন্ধ। কিংবা মাথায় হাত রাখা কারো কথা।

এগুলো আর ফিরবে না—এটা সবাই কমবেশি জানে। কিন্তু জানলেই কষ্ট কমে যায় না। মানুষ এই কষ্টটা নিয়েই ঈদ করে, প্রতিবছর।

চাঁদটা একই আছে। শুধু মানুষের চারপাশটা বদলে গেছে, বদলে গেছে তাদের পৃথিবী। তবু চাঁদের দিকে তাকিয়ে সেই পুরোনো দিনের একটু ছোঁয়া খোঁজার চেষ্টাটা বোধহয় কোনোদিন থামবে না।