যেভাবে প্রতি বছর নীরবে বদলে যায় বাবা-মায়ের ঈদ
যেকোনো বাবা-মাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ঈদ তাদের কাছে কী অর্থ বহন করে, উত্তরটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে তাদের সন্তানের বয়সের ওপর। বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে সন্তানের জীবনের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে সঙ্গেই এই উদযাপন অনেকটা নিঃশব্দেই বদলে যায়।
প্রথম সন্তানকে ঈদের পোশাক পরানোর উত্তেজনা, কিশোর বয়সী সন্তানের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মিশ্র অনুভূতি, বিদেশে পড়াশোনা করা সন্তানের অনুপস্থিতিতে ঈদ উদযাপনের বেদনা কিংবা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে প্রথম ঈদ উদযাপনের সময় আবেগের পরিবর্তন—এই মুহূর্তগুলো নীরবে বাবা-মায়ের ঈদ উদযাপনের ধরনকে বদলে দেয়।
বাবা-মা হওয়ার পর প্রথম ঈদ জীবনের একটি বড় মাইলফলক হয়ে ওঠে। উৎসবটি হঠাৎ করেই ভিন্ন অর্থ বহন করতে শুরু করে।
‘আমার মেয়ের জন্মের পর আমার কাছে ঈদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়,’ বলছিলেন এক সন্তানের মা আতিয়া তানজুম (৩০)। ‘তার প্রথম ঈদের পোশাক কেনা, তাকে প্রস্তুত করা এবং তার সঙ্গে মিলিয়ে সাজা—এই মুহূর্তগুলো আমার চিরকাল মনে থাকবে।’
প্যারেন্টহুডের শুরুর সময়টা সন্তানের চোখ দিয়ে ভিন্নভাবে উৎসবকে আবিষ্কার করতে শেখায়। তার প্রতি দায়িত্ববোধ এবং তার পছন্দমতো সবকিছু করার বিষয়টি পরে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। এমন অসংখ্য আবেগঘন মুহূর্ত ঈদকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
‘আমাদের মেয়ের কারণে আমরা একটি ছোট ঐতিহ্য শুরু করেছি—আমরা বছরের একটি ঈদ বিদেশে উদযাপন করি এবং সেই ভ্রমণের পরিকল্পনা তাকে কেন্দ্র করেই করা হয়,’ যোগ করেন আতিয়া।
বাবা-মায়েরা প্রায়ই নিজেদেরকে সন্তানের চোখ দিয়ে ভিন্নভাবে উৎসবকে আবিষ্কার করতে দেখেন। কিন্তু সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদ উদযাপনের গতিশীলতাও তাদের বয়স অনুযায়ী বদলে যায়। যে সন্তান একসময় বাবা-মায়ের পাশ ছেড়ে যেতে চাইত না, সে-ই একসময় নিজের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত কিশোরে পরিণত হয়।
‘এখন আমার ছেলের বয়স ১৬ বছর। আর ঈদের সকালটাই আমাদের সঙ্গে তার কাটানোর একমাত্র সময়,’ হাসতে হাসতে বলছিলেন দুই কিশোর সন্তানের মা শারমিন সুলতানা। ‘ঈদের নামাজের পর সে দ্রুত রেডি হয়, আমাদের সঙ্গে ছবি তোলে, তার ঈদের সালামি নেয়, তারপর বাকিদিন বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে চলে যায়, আমাদের চোখের আড়ালে।’
এই পর্যায়টি অনেক বাবা-মায়ের জন্য মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আসে: সন্তানের স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গর্ব, তবে একইসঙ্গে একটি সূক্ষ্ম দূরত্বের অনুভূতিও।
‘ওরা যখন ছোট ছিল, আমরা সারাদিন বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম বা একসঙ্গে সিনেমা দেখতাম। কিন্তু এখন ওদের জগৎ শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,’ বলেন শারমিন। ‘আমি বুঝি বড় হওয়া এমনই হয়। কিন্তু তবুও মাঝেমধ্যে সেই পুরোনো দিনগুলো মিস করি।’
কিশোর বয়সের স্বাধীনতা স্বাভাবিক পরিবর্তন আনলেও, সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলো আসে যখন সন্তান পড়াশোনা বা চাকরির জন্য পুরোপুরি বাড়ি ছেড়ে যায়। কোনো সন্তান পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে যাওয়ার পর প্রথম ঈদটি অস্বস্তিকরভাবে নীরব মনে হতে পারে।
‘নাইনা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা লাগত,’ স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন মালেকা নাসরিন। তার বড় মেয়ে নাইনা কয়েক বছর আগে মাস্টার্স করতে যুক্তরাজ্যে গিয়েছে। ‘সে সবকিছু পরিকল্পনা করত--কী খাওয়া হবে, কোন আত্মীয়ের বাড়িতে আগে যাওয়া হবে এবং কী রঙের পোশাক কিনে মিলিয়ে পরা হবে...কিন্তু এখন সবকিছু অসম্পূর্ণ মনে হয়।’
আমাদের কাছে স্মার্ট প্রযুক্তি আছে এবং আমরা সংযুক্তই থাকি। কিন্তু এটি কখনোই শারীরিক উপস্থিতির বিকল্প হতে পারে না।
বাবা-মায়ের জীবনের আরেকটি আবেগঘন মোড় আসে যখন তাদের মেয়ের বিয়ে হয়। মেয়ের বিয়ের পর প্রথম ঈদ পরিবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় এবং তাদের উপলব্ধি করায় কত ছোট হলেও কতটা ভিন্ন হয়ে গেছে সবকিছু।
‘এটি আমার মেয়েকে ছাড়া বাড়িতে প্রথম ঈদ এবং এই বাস্তবতা আমার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কঠিন,’ বলেন তিন সন্তানের মা ফারহানা আক্তার। ‘প্রতিবছর তার চুল ঠিক করতে এবং তাকে প্রস্তুত করতে অনেক সময় ব্যয় করতাম। এই বছর এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আমাকে খুব আবেগপ্রবণ করে তুলছে।’
একই শহরে থাকলে বিবাহিত মেয়েদের জন্য ঈদের সময় বাবা-মায়ের কাছে আসা সহজ হয়। তবুও উৎসবের ছন্দ হঠাৎ করেই বদলে যায় ঠিকই।
‘সে ঈদের দিনে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে আমাদের এখানে আসবে। তাকে দেখতে পারব বলে আমিও খুবই উচ্ছ্বসিত। কারণ আমি তার মধ্যে নিজের বিয়ের সময়ের প্রতিচ্ছবি দেখি। কিন্তু তবুও আমার মনের এক কোণে একটি অনুভূতি রয়ে গেছে যে, কয়েক মাসের মধ্যেই আমার মেয়ে আমাদের কাছে অতিথি হয়ে যাবে।’
মিশ্র আবেগ থাকা সত্ত্বেও যখন দাদা-দাদি বা নানা-নানি জীবনের অংশ হন, তখন চিত্রটি কিছুটা বদলে যায়। ‘আমার নাতির জন্মের পর ঈদ আবার একটু প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে,’ হাসিমুখে বলেন আবদুল হান্নান মিয়া (৬৫)।
‘আমার পরিবারের তিন প্রজন্ম একসঙ্গে ঈদের নামাজে যায়। এটি যেন জীবনের এক অন্যরকম পূর্ণতার মুহূর্ত,’ যোগ করেন তিনি। দাদা-দাদি বা নানা-নানি আবার নতুন করে তরুণ বাবা-মায়ের মতো উত্তেজনা অনুভব করেন।
যে একই উৎসবে একসময় গভীর রাতে ছোট হাতে মেহেদি লাগানো হতো এবং সকালে একসঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়া হতো, এখন সেই উৎসবেই বিদেশ থেকে ফোনের অপেক্ষায় থাকা বা অতিথির মতো আপ্যায়নের জন্য প্লেট সাজানো হয়।
ঈদ বদলায়নি, কিন্তু বাবা-মায়ের জীবন প্রতি বছর বদলায়। হয়তো এটাই বাবা-মায়ের জন্য ঈদের নীরব সৌন্দর্য।