বন্যায় চট্টগ্রামের ৫৮২ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, বিপর্যস্ত আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা

সিফায়াত উল্লাহ
সিফায়াত উল্লাহ

সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানি নেমে যাওয়ার পরও যোগাযোগ ও যাতায়াত নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের মানুষ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৫ উপজেলার অন্তত ৫৮২ গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৩৯১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া প্রায় ১৮০ সেতু, কালভার্ট, স্লুইসগেট ও অন্যান্য কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে। সেখানে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে সড়কগুলোর নিচের মাটি পর্যন্ত ধুয়ে গেছে। এতে অনেক গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া। ২৯টি স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি মেরামত কাজ শুরু করা হয়।

সাতকানিয়ার ছদাহা চারা বটতল সড়ক। ছবি: সংগৃহীত
সাতকানিয়া পৌরসভার রামপুর সড়ক। ছবি: সংগৃহীত

সাতকানিয়ায় ৪০টি সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সড়কের কিছু অংশ ধসে পড়ায় ৬টি সড়ক এখনো ব্যবহারের অনুপযোগী।

বাঁশখালীতে প্রাথমিক পরিদর্শনে ৬০টি সড়কের প্রায় ১১০ কিলোমিটার জুড়ে ক্ষতিগ্রস্তের তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান-ত্রিমোহনী সড়ক এবং দস্তিজার হাট-কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন হিসেবে সড়কের অনেক জায়গায় বিশাল বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে।

অনেক স্থানে সড়কের ধসে পড়া অংশ, হেলে পড়া সেতু, গ্রামীণ সড়কের উপড়ে থাকা ইট ও ক্ষতিগ্রস্ত পিচঢালা রাস্তা দেখা গেছে।

সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বন্যার পানি নেমে গেছে। কিন্তু যাতায়াত এখনো বেশ কঠিন অবস্থায় রয়েছে। আমাদের ভাঙা সড়ক হেঁটে পার হতে হচ্ছে। বাজার কিংবা হাসপাতালে যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হচ্ছে। মোটরসাইকেলেও কিছু সড়কে যাওয়া যাচ্ছে না।'

সাতকানিয়া পৌরসভার রামপুর সড়ক
ছদাহা ইউপি-দস্তিদার হাট সড়ক। ছবি: সংগৃহীত

পরিবহন শ্রমিকরা জানান, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহন খুবই ধীরগতিতে চলছে।

বাঁশখালী ও আনোয়ারায় চলাচলকারী পিকআপ ভ্যানচালক আল আমিন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে গাড়িতে পণ্যের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। কিছু রাস্তা তো বন্ধ। আবার যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর অবস্থা এতই খারাপ যে আমাদের খুব ধীরে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। যে পথ পাড়ি দিতে আগে ৩০ মিনিট লাগত, এখন সেখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে।'

জানতে চাইলে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, বন্যার পর এ পর্যন্ত সড়কের যে ক্ষতি হয়েছে টাকায় তার ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ১৮০ কোটি।

তিনি বলেন, 'এখনও পর্যন্ত আমরা ৫৮২ সড়কের ৩৯১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এটি আরও বাড়তে পারে, কারণ বন্যাদুর্গত কিছু এলাকার রাস্তা এখনো পানির নিচে। পুরো এলাকার খবর নেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি।'

'ইতোমধ্যে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সড়কগুলো সচল করা। এরপর স্থায়ী পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে,' বলেন তিনি।

বন্যায় জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের সড়কগুলো। সেখানে প্রায় ৭৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের অন্তত ৫২ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্তের কথা জানা গেছে।

সাতকানিয়া কলেজ রোড
সাতকানিয়া কলেজ রোড। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সড়ক যোগাযোগ সচল রাখা এখন জেলার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ সচল করতে কাজ শুরু করা হয়েছে।'

স্কুল-কলেজে ক্ষয়ক্ষতি

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার ৩৮৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু স্কুলের শ্রেণীকক্ষ ও সীমানা প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কিছু স্কুল বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

চট্টগ্রামের সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে তাদের এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লাস ও পরীক্ষা কবে থেকে শুরু করা যাবে তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'প্রতিষ্ঠানভেদে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে।'

কৃষি-মৎস্য খাত

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ হাজার ৯১০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর আউশ ধান, ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ৯৬০ হেক্টর আমন বীজতলা রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, এবারের বন্যায় ৩২০ বাণিজ্যিক মৎস্য খামারসহ ১২ হাজার ২৫১ জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। এতে আনুমানিক ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।