বিজ্ঞান

বৃষ্টির শব্দে সাড়া দেয় বীজ

রবিউল কমল
রবিউল কমল

আমরা ঘুমিয়ে গেলে কে জাগিয়ে তোলে? নিশ্চয়ই মা, না হলে বাবা। কিন্তু বীজ ঘুমিয়ে গেলে তাকে কে জাগাবে? সে যদি না জাগে তাহলেতো চারা জন্মাবে না! চারা না হলে গাছ হবে না! আর গাছ না হলে আমরা অক্সিজেন পাব কীভাবে? এই সমস্যার সমাধান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, বৃষ্টির টাপুরটাপুর শব্দে সাড়া দেয় বীজ!

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৃষ্টির ফোঁটার কারণে তৈরি হওয়া কম্পনে সাড়া দেয় গাছের বীজ। শুধু তাই নয় সেই কম্পনের শব্দে তারা সুপ্ত অবস্থা থেকে জেগে ওঠে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃষ্টির টাপুরটুপুর শব্দ মানুষকে আরামে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে উৎসাহ যোগায়। তবে ধানের বীজের ক্ষেত্রে এই শব্দ উল্টো প্রভাব ফেলে। ধানের বীজ বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস বুঝতে পেরে দ্রুত অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।

ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির যন্ত্রপ্রকৌশলী নিকোলাস মাক্রিস ও ক্যাডিন নাভারো এই গবেষণা করেন। তাদের গবেষণা প্রথমবার সরাসরি প্রমাণ করেছে, বীজ ও ছোট চারা প্রকৃতির শব্দ বা কম্পনে সাড়া দেয় ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

মাক্রিস বলেন, এই গবেষণা বলছে, বীজের শব্দ বুঝতে পারার এই ক্ষমতা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। বৃষ্টির শব্দের শক্তিই একটি বীজের বৃদ্ধির গতি বাড়াতে যথেষ্ট।

পুরো গবেষণাটি একটি ছবির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন তারা। ছবিতে দেখানো হয়েছে, বৃষ্টি ফোঁটার শব্দ ও কম্পনে কীভাবে একটি ধানের বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

অবশ্য উদ্ভিদের মানুষের মতো কান নেই, তাই তারা মানুষের মতো শব্দ শোনে না। তবে গবেষণাটি বলছে, যে কম্পন মানুষের কানে শব্দ হিসেবে ধরা পড়ে, সেই একই কম্পনে বীজ সাড়া দেয়।

এ বিষয়ে একাধিক পরীক্ষা করেন গবেষকরা। তারা অল্প পানিভর্তি পাত্রে প্রায় ৮ হাজার ধানের বীজ রাখেন। পানির গভীরতা ছিল প্রায় ৩ সেন্টিমিটার। এরপর ছয় দিন ধরে কিছু বীজের ওপর বিভিন্ন উচ্চতা থেকে পানির ফোঁটা ফেলা হয়।

বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টির তীব্রতা অনুকরণ করতে তারা ফোঁটার আকার ও উচ্চতা পরিবর্তন করেন। একই সঙ্গে বীজের অবস্থানও বদলান, যেন গভীরতা ও দূরত্ব কীভাবে অঙ্কুরোদ্গমে প্রভাব ফেলে তা বোঝা যায়।

ওই গবেষণায় একটি হাইড্রোফোন যন্ত্র দিয়ে ফোঁটার কারণে তৈরি হওয়া শব্দ-কম্পন রেকর্ড করা হয়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, পরীক্ষায় তৈরি হওয়া কম্পন প্রকৃত বৃষ্টির ফোঁটার মতোই ছিল।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব বীজের ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো কম্পন প্রয়োগ করা হয়েছিল, সেগুলো অন্য বীজের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ দ্রুত অঙ্কুরিত হয়েছে। অন্য বীজগুলো একই পরিবেশে থাকলেও তাদের ওপর কৃত্রিম বৃষ্টির প্রভাব দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই অভিযোজনের পেছনে কাজ করছে ‘স্ট্যাটোলিথ’ নামের বিশেষ অঙ্গাণু। এগুলো উদ্ভিদের কিছু কোষের নিচের দিকে জমা থাকে এবং মাধ্যাকর্ষণের দিক বুঝতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমেই শিকড় নিচের দিকে এবং কাণ্ড ওপরের দিকে বাড়ে।

বৃষ্টির ফোঁটার তৈরি শব্দতরঙ্গ পানি ও সম্ভবত মাটির মধ্য দিয়ে এক ধরনের শক্তি তৈরি করতে পারে। এই শক্তি স্ট্যাটোলিথগুলোকে নাড়া দেয় এবং বীজের বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

আসলেই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বীজ পানির ফোঁটার কাছাকাছি ছিল, সেগুলোর অঙ্কুরোদ্গম সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল। বিশেষ করে সেখানে স্ট্যাটোলিথের নড়াচড়া সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, তুলনামূলক মাটির ওপরে থাকা বীজ বেশি সাড়া দেয়। কারণ সেগুলো আর্দ্রতা শোষণ ও বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবেশে থাকে।

পানির নিচে শব্দের কম্পন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। কারণ পানির ঘনত্ব বাতাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় চাপতরঙ্গ আরও জোরালো হয় এবং সহজে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পানির নিচে বৃষ্টির শব্দ অনেক বেশি জোরে শোনা যায়।

তুলনা হিসেবে বলা যায়, অল্প পানিতে বৃষ্টির যে শব্দ তৈরি হয়, তার চাপ কয়েকশ প্যাসকেলের মধ্যে থাকে। অন্যদিকে ১ মিটার দূরত্বে মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথনের চাপ সাধারণত ০.০০৫ থেকে ০.০৫ প্যাসকেলের মধ্যে।

গবেষকদের ধারণা, অন্য ধরনের উদ্ভিদের বীজও পরিবেশের শব্দে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। গবেষণার জন্য ধানকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো এর মাধ্যাকর্ষণ-নির্ভর বৃদ্ধি পদ্ধতি অনেক উদ্ভিদের সঙ্গে মিলে যায়।

ধান বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য। আবার এটি পানির মধ্যে জন্মায় বলেই এ ধরনের পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত ছিল।
এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে সায়েনটিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে।