থিসিস সুপারভাইজার বেছে নেওয়ার আগে যেসব বিষয় ভাবা জরুরি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

থিসিস শুরু করার সময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মাথায় প্রথমে আসে বিষয় নির্বাচন। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর অনেকেই বুঝতে পারেন, পুরো অভিজ্ঞতাটাকে সহজ বা কঠিন করে তোলে আরেকটি বিষয়—সুপারভাইজার নির্বাচন।

একই বিভাগে, একই ধরনের বিষয়ে কাজ করেও কারও থিসিসের অভিজ্ঞতা খুব ভালো হয়, আবার কারও জন্য সেটি হয়ে ওঠে মানসিক চাপের কারণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেখানে গবেষণার কাজ সবসময় খুব গুছিয়ে এগোয় না, সেখানে একজন উপযুক্ত সুপারভাইজার অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, থিসিস সুপারভাইজার বেছে নেওয়ার আগে কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গবেষণার আগ্রহ কাছাকাছি কি না

সবার আগে যেটি দেখা দরকার, আপনি যে বিষয়ে কাজ করতে চান, সেই বিষয়ে শিক্ষকের আগ্রহ বা অভিজ্ঞতা আছে কি না। ধরুন, আপনি সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। আপনি রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করতে চান, কিন্তু সুপারভাইজার মূলত জনসংযোগ নিয়ে কাজ করেন। তখন অনেক সময় গবেষণার দিকনির্দেশনা নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

তিনি কোন ধরনের গবেষণায় কাজ করতে অভ্যস্ত, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। যেমন, আপনি যদি সার্ভেভিত্তিক থিসিস করতে চান, কিন্তু তিনি মূলত অন্য ধরনের গবেষণায় অভ্যস্ত হন, তাহলে কাজের ধরন ও দিকনির্দেশনায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

আবার কেউ যদি ভবিষ্যতে পিএইচডি করতে চান বা গবেষণাভিত্তিক পেশায় যেতে চান, তাহলে গবেষণামুখী শিক্ষক তার জন্য বেশি সহায়ক হতে পারেন। তাই শুধু বিষয় না, নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও মাথায় রাখা দরকার।

শুধু পরিচিত নাম দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না

অনেক শিক্ষার্থী ভাবেন, বিভাগের সবচেয়ে পরিচিত শিক্ষক মানেই সবচেয়ে ভালো সুপারভাইজার। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন না। একজন শিক্ষক হয়তো গবেষণায় খুব দক্ষ, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সময় দেওয়ার সুযোগ কম। আবার কেউ হয়তো খুব বড় গবেষক নন, কিন্তু ধৈর্য ধরে খসড়া দেখেন, নিয়মিত মতামত দেন এবং শিক্ষার্থীদের পাশে থাকেন।

থিসিসের সময় এই বিষয়গুলোই পরে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মতামত নিয়মিত দেন কি না

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো, খসড়া জমা দেওয়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। এতে কাজের গতি কমে যায়, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হয়।

তাই আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো, শিক্ষক সাধারণত কতটা নিয়মিত মতামত দেন। সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বললে এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। কেউ কেউ খুব দ্রুত মতামত দেন, আবার কেউ অনেক ব্যস্ত থাকেন।

অনেক শিক্ষার্থী পরে আফসোস করে বলেন, ‘শুরুতে যদি একটু খোঁজ নিতাম, তাহলে হয়তো পুরো থিসিসের অভিজ্ঞতাটা এত কঠিন হতো না।’

কথা বলতে স্বস্তি লাগে কি না

থিসিসের সময় অনেক প্রশ্ন, ভুল আর সংশোধন থাকবে। তাই সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলতে স্বস্তি লাগা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পান বা কিছু বুঝতে না পারলেও চুপ থাকেন। পরে ছোট সমস্যা বড় হয়ে যায়।

সবসময় খুব কঠোর পরিবেশে কাজ করা সবার জন্য সহজ হয় না। তাই এমন কাউকে বেছে নেওয়া ভালো, যার সঙ্গে অন্তত একাডেমিকভাবে খোলামেলা কথা বলা যায়।

কাজের ধরন মিলছে কি না

সব শিক্ষকের কাজের ধরন এক রকম না। কেউ ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেন, কেউ অনেক স্বাধীনতা দেন। কেউ প্রতিটি অংশ বিস্তারিত দেখেন, আবার কেউ শুধু সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেন।

ধরুন, কেউ প্রথমবার গবেষণা করছেন। তার হয়তো বেশি দিকনির্দেশনা দরকার। আবার কেউ আগে গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে থাকলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন। তাই নিজের কাজের ধরনটাও বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।

সময় দিতে পারবেন কি না

অনেক সময় কোনো শিক্ষক প্রশাসনিক কাজ, প্রকল্প বা অন্য ব্যস্ততায় থাকেন। তখন থিসিসের শিক্ষার্থীদের সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই শুধু পরিচিত নাম দেখে না গিয়ে বাস্তবে তিনি সময় দিতে পারবেন কি না, সেটিও ভাবা জরুরি।

অনেক শিক্ষার্থী পরে বুঝতে পারেন, সুপারভাইজারের সঙ্গে দেখা করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া ভালো।

সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা শুনুন

আগে যারা ওই শিক্ষকের অধীনে কাজ করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে আসতে পারে। তারা বলতে পারবেন, শিক্ষক কেমন মতামত দেন, সময়সীমা নিয়ে কতটা কঠোর বা গবেষণার কাজে কতটা যুক্ত থাকেন।

তবে একজনের অভিজ্ঞতা শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত না। ভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। তাই কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ধারণা নেওয়াই ভালো।

সবশেষে, ‘সবচেয়ে ভালো সুপারভাইজার’ বলে সবার জন্য আলাদা কোনো উত্তর নেই। আপনার কাজের ধরন, আগ্রহ আর প্রয়োজনের সঙ্গে যিনি মানানসই, তিনিই আপনার জন্য ভালো সুপারভাইজার। কারণ ভালো সুপারভাইজার শুধু থিসিস শেষ করতেই সাহায্য করেন না, গবেষণার প্রতি আত্মবিশ্বাসও তৈরি করে দেন। তাই তাড়াহুড়া করে নয়, একটু সময় নিয়ে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।