যুক্তরাষ্ট্রে সোশ্যাল সায়েন্সে ফুল ফান্ডিং: অনিশ্চয়তার সময়েও সম্ভাবনার পথ

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

যুক্তরাষ্ট্রে সোশ্যাল সায়েন্সে পিএইচডি করতে ফুল ফান্ডিং পাওয়া একসময় তুলনামূলকভাবে কম প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট সংকোচন, স্টেট ফান্ড কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব মিলিয়ে পরিস্থিতি বদলেছে। তাই বলে সুযোগ যে বন্ধ হয়ে গেছে—এমনটা মোটেও নয়। হয়তো আপনাকে আরও কৌশলী হতে হবে। চলমান পরিস্থিতিতেও এটা সত্য যে, যারা শুরু থেকেই একেবারে সব নির্দেশনা মেনে আবেদন করেন, তাদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ফুল ফান্ডিং হয়ে থাকে।

আপনাকে আগে বুঝতে হবে, সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ফুল ফান্ডিং বলতে কী বোঝায়। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন স্কলারশিপ, উত্তর আমেরিকার ক্ষেত্রে টিউশন ওয়েভার এবং আপনার থাকা-খাওয়ার জন্য এই ফান্ডিং। সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফুল ফান্ডিং আসে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ) বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ) হিসেবে। অর্থাৎ শুধু ভালো একাডেমিক ফলাফল যথেষ্ট নয়, আপনাকে হতে হবে গবেষণায় সক্রিয় এবং বিভাগে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেখানে স্টেট বাজেট কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফান্ডিং প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। তবু শক্তিশালী গবেষণাকাজ থাকলে সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ধরা যাক, আপনি কমিউনিকেশন বা মিডিয়া স্টাডিজে কাজ করতে চান। তাহলে সেখানকার সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সাম্প্রতিক গবেষণা-কাজ পড়া এবং আপনার গবেষণা প্রস্তাবকে সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। ফান্ডিং কাটের সময়ে বিভাগগুলো এমন প্রার্থী চায়, যারা প্রথম বছর থেকেই ক্লাস নিতে বা গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হতে পারবে। তাই কোয়ানটিটেটিভ ও কোয়ালিটেটিভ—এই দুই ধরনের রিসার্চ মেথডে দক্ষতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। তবে আপনার যদি কোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা নাও থাকে, সেই বিষয়টি সততার সঙ্গে স্টেটমেন্ট অব পারপাসে (এসওপি) বলে নেওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে, কনফারেন্স প্রেজেন্টেশন, জার্নাল পাবলিকেশন বা চলমান গবেষণা প্রকল্পে সম্পৃক্ততা আবেদনপত্রে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার।

প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আপনি নিশ্চয়ই সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেখানকার কারিকুলামে আগ্রহী নন। আবার এই প্রতিটি স্কুলও মানে ভালো—এমনটাও নয়। প্রথমেই ইউএস নিউজ কিংবা কিউএস গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিংয়ে দেখা প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং বিশেষ করে আপনার বিভাগের র‍্যাঙ্ক কেমন। তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে আপনি আপনার বিভাগ বা স্কুলের র‍্যাঙ্ক দেখবেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং থেকেও আপনার নিজের বিভাগ, যেখানে আপনি আগামী ৫ বছরে নিজেকে গড়ে তুলবেন, তার মান দেখা বেশি প্রয়োজন। আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি ধারণা হলো—যত টপ টায়ারের বিশ্ববিদ্যালয়, তত ভালো।

অবশ্যই বড় স্কুলগুলোর সুযোগ-সুবিধা, ফান্ডিং পরিমাণ এবং পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু এখানে একজন শিক্ষার্থীর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন অধ্যাপকের কাজের ক্ষেত্রে। সে নিজে কতটা গবেষণায় ভালো করতে পারবে, কতটা শিখতে পারবে। তাই বাস্তবতা হলো, শুধু র‍্যাঙ্কিং ভালো হলেই সেখানে আপনার গবেষণাকাজ খুব ভালো হবে—এমনটা নাও হতে পারে। বরঞ্চ আপনি গুরুত্ব দিন, যেই বিশ্ববিদ্যালয়েই আপনি পড়ছেন না কেন, সেখান থেকেই ভালো মতোন গবেষণা শিখে নেওয়া এবং ভালো মানের গবেষণা করা। এবং এই ক্ষেত্রে আপনি যতটা সতর্ক থাকবেন, বিশ্ববিদ্যালয়, আপনার বিভাগ সম্পর্কে খোঁজ নিবেন, ততটা আপনি গুছিয়ে কাজ করতে পারবেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন আপনার ফান্ডিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। একইসঙ্গে টপ, মিড-টায়ার ও উদীয়মান—এই তিন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

আপনার কাজ ও অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে এসওপি

এসওপি আপনার পুরো পোর্টফোলিওর, আপনার কাজের আগ্রহের সবকিছুর বৃত্তান্ত। তবে অবশ্যই তা হতে হবে সীমিত শব্দে। খুব নির্দিষ্টভাবে, আপনি কোন বিষয়ে, কোন মেথডে গবেষণা করতে চান, এই নির্দিষ্ট বিষয়ে আগ্রহের কারণ কী। একইসঙ্গে কোন অধ্যাপকের কাজ আপনাকে অনুপ্রাণিত করে, কেন এবং সব শেষে এই শিক্ষা থেকে আপনি নিজেকে আগামীতে কোথায় দেখতে চান এবং এই সবকিছুই আপনাকে লিখতে হবে নির্দিষ্ট শব্দ সংখ্যার মধ্যে, এবং একটি গল্পের মতোন। এটিও অবশ্য নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন: অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশন স্কুলের ওয়েবসাইটেই বলা আছে, সেখানকার এসওপি হতে হবে খুব ফর্মাল। আবার কিছু বিভাগ পছন্দ করে, আপনার এসওপি হবে অনেকটা গল্পের মতোন। তাই কোথাও আবেদনের আগে খুব ভালো করে ওয়েবসাইট বারবার পড়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো কিছু জানার থাকলে সরাসরি গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ডিরেক্টরকে মেইল করা প্রয়োজন। এমনকি যেই প্রফেসরের সঙ্গে আপনি কাজ করতে চান বা যার গবেষণা আর্টিকেল আপনি পড়েছেন, সেই প্রফেসরকেও আপনি ইমেইল করতে পারেন।

প্রফেসরকে মেইল পাঠানো আসলেই কি প্রয়োজন

সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উত্তরটা হলো, না। কেননা এখানকার স্কুলগুলোর ফান্ডিং পুরোটাই আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফান্ড থেকে। ফলে, এই স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের একটা সুবিধা হলো, কিছুটা সময় নিয়ে কোর্সওয়ার্ক শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, আপনি আসলে কোন প্রফেসরকে সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচন করতে চান। তবে, এও ঠিক, যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। অধ্যাপক যদি নানা ব্যস্ততায় আপনার ইমেইলের উত্তর নাও দেয়, আপনি আপনার গবেষণার আগ্রহ, বা ওনার নাম যে এসওপি’তে উল্লেখ করছেন, সেটা জানিয়ে রাখা অবশ্যই ইতিবাচক। এবং অনেক ক্ষেত্রেই অধ্যাপক আগ্রহী হয়ে আপনার সঙ্গে অনলাইন মিটিং করতে পারেন, যেটা অবশ্যই আপনার জন্য ইতিবাচক। এবং এসব মিটিংয়ে খেয়াল রাখুন আপনি কতটা নির্দিষ্ট করে কথা বলছেন। আপনার আলোচনার মূল বিষয়টাই হবে আপনার গবেষণা মেথডকেন্দ্রিক।

সময়ের মধ্যে এলওআর

এক্ষেত্রেও আপনাকে সময়ের মধ্যে লেটার অব রেকমেন্ডেশন (এলওআর) জোগাড় করে ফেলতে হবে। আপনি যেই শিক্ষকের ওপর আস্থা রাখতে পারেন, যার কোর্সে আপনি ভালো করেছেন এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, যার সঙ্গে আপনার ভালো একটা যোগাযোগ রয়েছে, তার থেকেই এলওআর চাইতে পারেন। কেননা আবেদন প্রক্রিয়ায় এটি খুবই গুরুত্ব বহন করে। এবং আপনি নিজেই সময় নিয়ে সেই শিক্ষককে রিমাইন্ডার দিন, যে আপনার ডেডলাইনগুলো কবে, যাতে করে কোনো লেটার বাদ না থেকে যায়। একইসঙ্গে এটা আপনারই দায়িত্ব, শিক্ষককে মাস তিনেক আগে রেফারেন্স লেটারের বিষয়ে জানানো। শেষ মুহূর্তে জানানো মানে, আপনি ব্যক্তিকে বিরক্ত করছেন, এবং তিনি হয়তো তাড়াহুড়োয় আপনাকে সেই লেটারটি নাও দিতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষার আবেদন কোনো দ্রুত বিষয় নয়। এর জন্যও প্রয়োজন লেগে থাকে, অধ্যবসায় এবং প্রায় মাস খানেকের মতো সময়। এই কাজগুলো যদি আপনি শৃঙ্খলার সঙ্গে করতে পারেন, এই ফান্ডিং নিয়ে টানাপোড়েনের সময়েও আপনি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল ফান্ডিং পেতে পারেন। তাই নিজের কাজের ওপর আস্থা রাখুন এবং কাজটা করে যান।