প্লুটো কেন গ্রহ নয়

রবিউল কমল
রবিউল কমল

তোমরা নিশ্চয়ই জানো, প্লুটো কোনো গ্রহ নয়। অথচ একসময় প্লুটোকে সৌরজগতের একটি গ্রহ হিসেবে ধরা হতো। স্কুলে শেখানো হতো, প্লুটো সৌরজগতের নবম গ্রহ। তাহলে প্লুটোকে কেন গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো? এর পেছনে আছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আবার আছে বিতর্ক। চলো আমরা আজ সেই গল্প শুনি।

প্লুটো কেন ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট হলো

২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনোমিকাল ইউনিয়নের (আইএইউ) সদস্যদের ভোটে প্লুটোর মর্যাদা ‘গ্রহ’ থেকে ‘ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট’ করা হয়। আইএইউ প্রস্তাবনা-৫ এর ‘সৌরজগতে গ্রহের সংজ্ঞা’ অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

একসময় সৌরজগতের নবম গ্রহ প্লুটোকে এখন কুইপার বেল্ট বস্তু হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। সৌজন্যে: নাসা/জেএইচইউএপিএল/এসডব্লিউআরআই
প্লুটোকে এখন কুইপার বেল্ট বস্তু হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। সৌজন্যে: নাসা/জেএইচইউএপিএল/এসডব্লিউআরআই

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্লুটোকে কেন পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা হলো? এই ভোটের প্রয়োজনই বা কেন হলো? আর প্লুটো কি সত্যিই গ্রহ?

প্লুটোর গল্পটা বেশ মজার।

অনেক আগের কথা, ১৮শ শতকে বিজ্ঞানীরা আকাশে গ্রহগুলোর চলাফেরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন তারা লক্ষ্য করেন, একটি গ্রহের (ইউরেনাস) কক্ষপথ ঠিকমতো চলছে না। অর্থাৎ, সেটি একটু এদিক–ওদিক সরে যাচ্ছে। এই অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই আরও কোনো অজানা ও অচেনা বড় বস্তু সেখানে আছে, যা ইউরেনাসকে টানছে।

এই ভাবনা থেকেই পরে একটি নতুন বস্তু খুঁজে পাওয়া যায়, যার নাম দেওয়া হয় প্লুটো। এই আবিষ্কার আমাদের ‘গ্রহ’ সম্পর্কে আগের ধারণা বদলে দেয়। পাশাপাশি, সৌরজগত কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
এবার চলো দেখি, প্লুটো আসলে কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল সে গল্পটা বিশদভাবে জানি।

প্লুটোর আবিষ্কারক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবোর। ছবিটি প্লুটো আবিষ্কারে ব্যবহৃত জাইস ব্লিঙ্ক কম্পারেটর যন্ত্রের সামনে তোলা। সৌজন্যে: লোয়েল অবজারভেটরি আর্কাইভস
প্লুটোর আবিষ্কারক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবোর। সৌজন্যে: লোয়েল অবজারভেটরি আর্কাইভস

প্লুটো আবিষ্কার

১৭শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল বড় বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন, যাকে বলা হয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। তখন বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেন মহাবিশ্ব নিয়ম-নীতি মেনে চলে।

এই সময় জোহানেস কেপলার গ্রহগুলোর চলাফেরার নিয়ম বা সূত্র আবিষ্কার করেন। পরে আইজ্যাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করেন। এই দুই আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য খুব শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

তখন মানুষের বিশ্বাস ছিল, সৌরজগত একদম নিখুঁত ঘড়ির মতো কাজ করে। সব গ্রহ ঠিক নিয়মে, ঠিক পথে ঘুরে চলছে। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সেই ধারণায় সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।

১৮২১ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা বড় আকারের অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেন। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহ ইউরেনাস তার নির্দিষ্ট কক্ষপথ ঠিকমতো মেনে চলছিল না। অর্থাৎ, সেটি গণনা অনুযায়ী ঠিক জায়গায় থাকছিল না।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস ক্রিস্টি ও রবার্ট হ্যারিংটন ১৯৭৮ সালে প্লুটোর বৃহত্তম উপগ্রহ ক্যারন আবিষ্কার করেছিলেন। সেই ফটোগ্রাফিক প্লেটটির সঙ্গে দেখা যাচ্ছে জেমস ক্রিস্টিকে। সৌজন্যে: ইউ.এস. নেভাল অবজারভেটরি
জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস ক্রিস্টি ও রবার্ট হ্যারিংটন ১৯৭৮ সালে প্লুটোর বৃহত্তম উপগ্রহ ক্যারন আবিষ্কার করেছিলেন। সৌজন্যে: ইউ.এস. নেভাল অবজারভেটরি

এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস বোভার্ড। তিনি ইউরেনাসের অবস্থান নিয়ে একটি টেবিল তৈরি করেন। সেখানে দেখা যায়, ইউরেনাস বারবার তার পূর্বানুমান করা পথ থেকে সরে যাচ্ছে। এটা তাকে এক ধরনের ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেয়। কারণ গ্রহগুলোর গতি যদি ঠিক নিয়মে চলে, তাহলে এমন হওয়ার কথা নয়।

তাই বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন, ইউরেনাসকে কেউ যেন অদৃশ্যভাবে টানছে। হতে পারে, তার বাইরে আরেকটি বড় গ্রহ আছে, যা এখনো আমরা দেখতে পাইনি।

এই ধারণা থেকে শুরু হয় আরেকটি বড় অনুসন্ধান। দুইজন গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন কাউচ অ্যাডামস ও আরবেইন লে ভেরিয়ার গণনা করে অনুমান করেন, সেই অদেখা গ্রহটি কোথায় থাকতে পারে। তাদের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় খোঁজ শুরু করেন।

শেষ পর্যন্ত ১৮৪৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জোহান গালে ও হেনরিখ ডি’আরেস্ট সেই নতুন গ্রহটি খুঁজে পান। এর নাম দেওয়া হয় ‘নেপচুন’।

কুইপার বেল্টের একটি কম্পিউটার মডেল। সৌজন্যে: নাসা
কুইপার বেল্টের একটি কম্পিউটার মডেল। সৌজন্যে: নাসা

নেপচুন আবিষ্কারের পর মনে হয়েছিল ইউরেনাসের সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি! দেখা গেল, নেপচুন থাকার পরও ইউরেনাসের কক্ষপথে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার থেকে গেছে। অর্থাৎ, এখনো কিছু না কিছু অদেখা প্রভাব কাজ করছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করতে শুরু করেন।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে কাজ করেন পার্সিভাল লোয়েল। তিনি মনে করেন, নেপচুনের বাইরে আরও একটি বড় গ্রহ আছে। সেই অজানা গ্রহই ইউরেনাসের কক্ষপথে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। তিনি এই সম্ভাব্য গ্রহের নাম দেন ‘প্লানেট এক্স’।

১৯০৬ সালে তিনি এই অদেখা গ্রহটি খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছর চেষ্টা করেও কোনো সফলতা পাননি। ১৯১৬ সালে তার মৃত্যু হয়।

এরপর তার প্রতিষ্ঠিত মানমন্দিরে কাজ চালিয়ে যান ভেস্টো স্লিফার। তিনি নিশ্চিত কোনো ফল পাচ্ছিলেন না।

২০০৬ সালের সাধারণ সভায় আইএইউ সদস্যরা ভোট দেন এবং প্লুটোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সৌজন্যে: আইএইউ/রবার্ট হার্ট
২০০৬ সালের সাধারণ সভায় আইএইউ সদস্যরা ভোট দেন এবং প্লুটোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সৌজন্যে: আইএইউ/রবার্ট হার্ট

১৯২৯ সালে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্লাইড টমবগকে। তিনি ছিলেন তরুণ ও খুব পরিশ্রমী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। রাতে আকাশের ছবি তুলতেন এবং দিনে সেই ছবিগুলো তুলনা করতেন। এই কাজের জন্য ব্যবহার করতেন একটি বিশেষ যন্ত্র, যার নাম ‘ব্লিঙ্ক কম্পারেটর’।

এই যন্ত্রের সাহায্যে দুটি ছবি দ্রুত পাল্টে দেখা যেত। এতে আকাশের স্থির তারাগুলো একই জায়গায় থাকত, কিন্তু যদি কোনো বস্তু চলমান থাকে, তাহলে সেটি একটু সরে গেছে বলে দেখা যেত।

অনেক মাস খোঁজার পর ১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি একটি ছোট চলমান বিন্দু দেখতে পান। এটি জেমিনি নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে ছিল। এই ছোট বিন্দুই ছিল সেই বহুদিন ধরে খোঁজা ‘প্লানেট এক্স’। এর নাম রাখা হয় ‘প্লুটো’।
অর্থাৎ, বহু বছরের অনুসন্ধান, গণনা আর পর্যবেক্ষণের ফলেই সৌরজগতের এই নতুন সদস্য আবিষ্কৃত হয়।

প্লুটোর নামকরণ

সাবেক এই গ্রহটির নাম রাখা হয় রোমান পাতাল দেবতা প্লুটোর নামে। কিন্তু শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল এটি সত্যিই বড় গ্রহ কি না। এতে খুবই ক্ষীণ আলোয় দেখা যেত এবং বড় টেলিস্কোপেও এর আকার স্পষ্ট ছিল না।

পরে দেখা যায়, প্লুটো সম্ভবত পৃথিবী বা মঙ্গলের চেয়েও ছোট।

১৯৭৮ সালে জেমস ক্রিস্টি প্লুটোর সবচেয়ে বড় চাঁদ চ্যারন আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে জানা যায়, প্লুটোর ভর অনেক কম, এমনকি পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও ছোট।

প্লুটো সূর্য থেকে অনেক দূরে কুইপার বেল্টে অবস্থিত। হাজার হাজার পরিচিত বস্তু এটিকে প্রদক্ষিণ করে, যার অর্থ হলো প্লুটো এই অঞ্চলের মহাকর্ষীয়ভাবে প্রভাবশালী বস্তু নয়।  সৌজন্যে: নাসা, ইএসএ, এবং জি. বেকন
প্লুটো সূর্য থেকে অনেক দূরে কুইপার বেল্টে অবস্থিত।  সৌজন্যে: নাসা, ইএসএ, এবং জি. বেকন

নতুন আবিষ্কার বদলে দিলো সব

১৯৯০ দশকে সিসিডি ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে দেখা যায়, নেপচুনের বাইরে প্লুটোর মতো আরও অনেক বস্তু আছে। এগুলোকে বলা হয় কুইপার বেল্ট অবজেক্টস। প্লুটো ছিল এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

এরপর আবিষ্কৃত হয় কোয়ার, সেডনা, মেকমেক এবং এরিস।

তখন প্রশ্ন ওঠে, যদি প্লুটো গ্রহ হয়, তাহলে এগুলোও কি গ্রহ?

সমস্যা সমাধানে ২০০৬ সালে আইইউ গ্রহের নতুন সংজ্ঞা ঠিক করে। আগে ‘গ্রহ’ বলতে কেবল বড় কোনো মহাজাগতিক বস্তু বোঝানো হতো। কিন্তু তখন থেকে তারা নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ঠিক করে দেয়।

এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো বস্তুকে গ্রহ হতে হলে ৩টি শর্ত পূরণ করতে হবে—গ্রহ হতে হলে সৌরজগতের কেন্দ্র সূর্যকে ঘিরে কক্ষপথে ঘুরতে হবে। নিজে থেকে ভাসমান কোনো বস্তু হলে চলবে না।

লোয়েল অবজারভেটরি, প্লুটো ডোম, ফ্ল্যাগস্টাফ, অ্যারিজোনা। আমেরিকার ঐতিহাসিক সমীক্ষা ভবন। ছবি: সংগৃহীত
লোয়েল অবজারভেটরি, প্লুটো ডোম, ফ্ল্যাগস্টাফ, অ্যারিজোনা। আমেরিকার ঐতিহাসিক সমীক্ষা ভবন। ছবি: সংগৃহীত

দ্বিতীয়ত নিজের ভরের কারণে আকার প্রায় গোলাকার হতে হবে। সাধারণত যদি কোনো বস্তু অনেক বড় হয়, তার নিজের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে সেটি গোলাকার আকৃতি নেয়। তাই গ্রহ হতে হলে এই ‘প্রায় গোল’ আকৃতি থাকতে হবে।

তৃতীয়ত নিজের কক্ষপথের আশপাশ পরিষ্কার করতে হবে। এর মানে হলো, গ্রহটি তার কক্ষপথের আশপাশে থাকা ছোট ছোট পাথর, ধূলিকণা বা অন্যান্য বস্তুকে নিজের মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে সরিয়ে দেবে বা নিয়ন্ত্রণ করবে।

সমস্যা হলো, প্লুটো এই তৃতীয় শর্তটি পূরণ করতে পারে না। কারণ তার কক্ষপথে এখনো অনেক বরফ ও ছোট বস্তু ঘুরে বেড়ায়।

এ কারণেই ২০০৬ সালে প্লুটোকে ‘গ্রহ’ না বলে ‘ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

বিতর্ক এখনও চলছে

অনেকে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। কেউ বলেন, যদি প্লুটো গ্রহ না হয়, তাহলে কুইপার বেল্টের আরও অনেক বস্তুও গ্রহ হওয়া উচিত।

কেউ আবার বলেন, আবেগগত কারণে প্লুটোকে গ্রহ হিসেবেই রাখা উচিত, কারণ দীর্ঘদিন তাকে আমরা গ্রহ হিসেবে জেনে এসেছি।

আর কিছু বিজ্ঞানী বলেন, পৃথিবী বা বৃহস্পতিও পুরোপুরি এই সংজ্ঞা মেনে চলে না।

প্লুটোকে গ্রহ থেকে বাদ দেওয়া মানে এটির প্রয়োজন নেই ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। বরং এটি আমাদের সৌরজগতের ইতিহাস, গঠন এবং গ্রহ কী, এই ধারণাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।