মা দিবস

ধূসর রঙের মা

কিযী তাহ্‌নিন
কিযী তাহ্‌নিন

গেল কতদিন ধরে আমি সংসার শব্দের অর্থ খুঁজছি। যে অর্থ আমাকে সংসারের শাঁসটুকু, রসটুকু বুঝিয়ে দেবে। সেদিন এলোমেলো শুনতে থাকা এক গানে এসে মন থমকালো—‘খুনসুটির এ সংসারে তাও এক হাঁড়িতে ভাত’। ওইটাই, সংসার মানে এক হাঁড়িতে ভাত। খুনসুটির হোক, কিংবা অবিশ্বাসের, প্রেমের কিংবা নামমাত্র সংসারে সেই ভাতের হাঁড়ি আঁকড়ে সামলে যে তুলতুলে আঁচল জড়ানো চরিত্র সামনে চলে আসে, তা আমাকে অস্বস্তি দেয়। মা।

মা কেন অস্বস্তি দেবে! মা হবে শান্তির, মা হবে বিবেকের দূত, সঞ্চয়ের পুঁটলি, আনন্দের ঝর্ণাধারা! মা হবে মমতার এবং স্বস্তির। তার মুখে জমে থাকা ঘামের ফোঁটার সাথে শিশিরবিন্দুর মিল খুঁজে পাবে সাহিত্য-শিল্প।

তবু আমার মায়েদের ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে। আস্ত ডিমের খোসার মতো চুরমার করে ভেতরের কুসুমটুকু হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে—মা কেমন?

‘তিনি আমার আশ্রয়, তিনিই আমার ঝড়।’ অরুন্ধতী রায় লিখেছিলেন মাকে এমন করে, মাদার মেরি কামস টু মি-তে। তিনি আতশকাঁচের তলায় আতিপাতি মাকে দেখেছেন। তিনি আসলে শুধু তার মাকে দেখেননি,  মাতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে যে চরিত্র মেরি রায়, তাকে খুঁজেছেন।

আর আমি ভাবছিলাম, মায়েদের শরীর থেকে ‘মা’ ঘ্রাণ মুছে দিয়ে যদি তাদের নিয়ে আরও সাহিত্য রচনা হতো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের ভাণ্ডারে আরও ফসল জমা হতো। সংসারের এক হাঁড়িতে ভাত, পুরনো টিনের কৌটায় সঞ্চয়ের জমানো টাকা, সবার খাওয়া শেষে বেঁচে যাওয়া মাছের শেষ টুকরোর কাঁটা চিবোনো লক্ষ্মী মা, শূন্য ভাঁড়ারে জাদুবলে শস্য ফোলানো মমতাময়ী মা—আমরা এমন করেই মাকে দেখে যাই। জীবনে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, শিল্পে।

এমন করে দেখা স্বস্তির, এমন করে দেখলে সব দায় শুকনো বালির মতো শরীর থেকে, মন থেকে ঝরে পড়ে। আত্মার দায়মুক্তি হয়। আমরা সকল ভালো নিজের পাতে নিয়ে নেই, আর মায়েদের এক স্বস্তিময় আত্মত্যাগী পুতুলের ছাঁচে ফেলে দেই।

কী হতো মায়েরা যদি অস্বস্তির চরিত্র হয়ে উঠত? জীবনে যা দেখেও আমরা আড়াল করি, তেমন? গল্পে, সিনেমায়, শিল্পে? সেই মা, যার মায়ের চরিত্রের বাইরে গিয়ে বড় মাছের মাথাটা চেটেপুটে খেতে ইচ্ছে করে, সবার আগে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, বৃষ্টিতে খুব ভিজে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে এবং সব ইচ্ছে হারাতে হারাতে যে ক্রোধ, অসূয়া, বিদ্রোহ, হতাশা তাকে ঘিরে ধরে—তাকে টেনে এনে সকলের সামনে দাঁড় করিয়ে অস্বস্তিকর এক চরিত্রে পরিণত করতে আমরা ভয় পাই। আমাদের ভাগে কম পড়ে যাবে যে।

আমি জানি, সকলে জানে, মায়েরা এমনই। মায়েরা প্রার্থনার মতন, অতল এবং অটল। মায়েরা বটগাছের মতন, ছায়া দেয়, নিজে পোড়ে। মায়েরা নদীর মতন, ভেসে যায়, তবু বাঁচিয়ে দিয়ে যায়। মা এমন যে, ‘যেখানেই আমি যাই দুটি নির্নিমেষ চোখ পিছনে ছুটছে, পিছলে পড়ছে না একবারও, সরে যাচ্ছে না, এমনকি পলক ফেলছে না কখনও—যেন মানুষের চোখ নয়।’ (মাতৃহননের নান্দীপাঠ—আবদুল মান্নান সৈয়দ)।

মানুষের চোখ, মায়ের চোখের আড়ালে যে মানুষের চোখ, সাধারণ চোখ তা দেখতে ইচ্ছে করে। মায়েরা মায়েদের মতন হবে, সে প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু মায়েরা মানুষের মতন হতে পারবে না—সে কার নিয়ম!

মায়েদের মানুষ হতে দিলে, তাদের কাঁধ দুটো, পা দুটো হয়তো আরেকটু কম ক্লান্ত হতো। তাদের চোখের ভাঁজ বিলম্বিত হতো, হাত দুটো আরেকটু আদর পেত, আলো পেত। ফুটন্ত হাঁড়ির ভাতে হাত পোড়ানোর দায় যদি সংসারের সবার মিলেমিশে হতো, মায়ের জন্য হয়তো একটা আলাদা বিকেল থাকতো। মায়ের চরিত্রে একটু ধূসর রং থাকার অনুমতি দিলে, মা হয়তো সেই আলাদা বিকেলে তার আকাশে কিছু রঙিন ঘুড়ির সন্ধান পেত। মায়েদের যদি মানুষ হওয়ার অনুমতি মিলত, তবে আরও কত সুখের গল্পের সন্ধান পেতাম আমরা।