মা দিবস

মা, আমার মা

স্নিগ্ধা বাউল
স্নিগ্ধা বাউল

পৌরাণিক গল্পে পড়েছিলাম একবার কৈলাসে বসে গণেশ আর কার্তিককে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আসার প্রতিযোগিতা দেওয়া হলো; কার্তিকের বাহন হলো ময়ূর, গণেশের বাহন ইঁদুর। কার্তিক তার বাহনে চড়ে যখন যাত্রা শুরু করে তখনো গণেশ ভাবছে কী করবে! বিচক্ষণ গণেশের মাথায় আসে, তার কাছে তো পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হলো তার মা। ময়ূরে চড়ে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে কার্তিক যখন কৈলাসে ফিরে আসে তখন দেখে গণেশ মায়ের কোলে বিজয়ীর বেশে বসে আছে। মা এবং মা হচ্ছে আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। মা তেমন করেই আমার পৃথিবী। ঠিক পৃথিবী নয় একেবারে মহাবিশ্বই। আমি ও মা, সম্ভবত প্রবল আকর্ষণে প্রদক্ষিণ করছি পরস্পরকে। বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে আমরা হয়ে উঠেছি পরম বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সুহৃদ।

অন্য অনেক মায়ের মতো আমার মা সন্তানদের নামের কাছে নিজের নাম হারিয়ে ফেলেছে। কখনো ঝুমুরের মা তো কখনো বেলার মা। মায়ের নাম উচ্চারণ করা যাবে না যুগে নিজের মায়ের নাম জানতে অনেক সময় লেগেছে। যখন বিদেশে পড়তে গেলাম অবাক হয়ে দেখি, কোথাও মায়ের নাম ছাড়া আর কোনো পরিচিতি প্রয়োজন হয়নি। অথচ এখানে মায়ের নাম অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। আমার মা মিনতি বাউল; আগে নাম ছিল মিনতি দেবনাথ। সুভদ্রা নাথ ও চানমোহন দেবনাথের কনিষ্ঠ মেয়ে।

মা বেশ লম্বা, কাটা কাটা নাক ও টানা চোখ। তার তিনটা রূপার কাঁটা ছিল। তিনটা চুলের কাঁটাই অনেকটা লম্বাটে ইউ আকৃতির, যার মাথায় আবার চারটা রূপার বল। তিন চারে বারোটা বল একসঙ্গে ঝনঝনিয়ে উঠলে আনন্দ লাগতো। কোথাও যাওয়ার আগে একগাছি আলগা চুল খোপায় গুঁজে মা কাঁটাগুলো বসিয়ে দিতেন। আমার আটপৌড়ে মাকে দেখতে অবিকল সারদা দেবীর মতো লাগতো।

যেদিন রূপার কাঁটায় তেঁতুল ও বালি দিয়ে ঘষে মাজতো বুঝে নিতাম মা কোথাও যাবে। এক সময় পারিবারিক সংকটে মা তার শখের কাঁটাগুলো বিক্রি করে দেয়। মা ছিল লাকড়ি জ্বলা চুলার পাশে ঝকঝকে মুখ, যেখানে আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যায় অবলীলায়। ভাতের স্বাদ, আদর্শ লিপির অক্ষর আমার মা।

মা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। পারিবারিক চাপ কিংবা অনটনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার হয়নি। কিন্তু জীবন বাস্তবতায় কী প্রদীপ্ত ও প্রাজ্ঞ তার অবস্থানে।

আদর্শলিপি পড়ার সময় সবচেয়ে বেশি জটিল লাগতে শুরু করে ‘ঈ’ অক্ষর। মা কেমন করে হাতের আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শিখিয়ে দিলেন সেই জটিল অক্ষরের খেলা; তখনই জেনেছি আমার মা সব পারে।

যেবার আমার গুটিবসন্ত হলো, মা আমাকে কী যত্নে রাখলেন! সবাই দূরে সরে গেলেও মা একদমই দূরে যায়নি। তখন জেনেছিলাম, মায়েদের কোনো প্রতিষেধক প্রয়োজন হয় না!

মায়ের একটা রুদ্ররূপ ছিল, যার ভুক্তভোগী সবচেয়ে আমি। বেলুনি, বিছানা ঝাড়ুনি, বসার পিঁড়ি, চিরুনি, ডাল ঘুটনি কিংবা ঘরের ঝাড়ু সম্ভবত কোনোকিছু বাদ যায়নি আমার পিঠে। এই বড়বেলায় একদিন মাকে বললাম, ‘আগের সবগুলো মার এখন তোমাকে ফেরত দিই?’ মা হেসে বলেছিল, ‘মারছিলাম বলেতো মানুষ হয়েছিস!’

সম্ভবত পৃথিবীর সবার সন্তানের মতো মা আমার কাছে সেরা রাঁধুনি। সত্যিই আমার ভালো রাঁধেন। সবচেয়ে বেশি স্বাদের রান্না হলো-কচুর ঘণ্ট, মুগডাল, নতুন আলুর মাছের ঝোল, পাটশাকের ঝোল, পুঁইপাতার বড়া, সজনে গাছের ছাল ভর্তা, সরিষা বাটায় কচি জালি ভাজা, কাচা কাঁঠালের এঁচোড় কিংবা পাটায় বাটা শুঁটকি ভর্তা। রেসিপিতে আমিষ কম, মা নিজেই নিরামিষাশী। মা বলে, ‘যে জীবন আমি দিতে পারবো না, তা হত্যা করবো কী করে!’ তাই আমাদের খাদ্য তালিকায় প্রাধান্য পেয়েছে নানারকম সবজি।

মায়ের সবচেয়ে প্রিয় তার পানের বাটা। এই পানের বাটা আদতে কোনো সাধারণ বাটা নয়, এতে রয়েছে ঘরের চাবি, আলমিরার চাবি, ভাঁজে খাঁজে ভাংতি টাকা। মায়ের সঞ্চয় মানে ডালের কৌটায় লুকিয়ে রাখা টাকার নোট। আর আমাদের কাজ ছিল ঘ্যানঘ্যান করে সেই টাকা বের করে আনা! মা সিনেমা দেখতে ভালোবাসতো। যেদিন সব ঝগড়া ফ্যাসাদ ভুলে মা-জেঠিমারা এক হয়ে যেত, সেই দিনটা ছিল তাদের সিনেমা দেখার দিন। সিনেমা দেখতে যাওয়ার দিনে একটু তিব্বত স্নো, আর পাউডার মেখে লাল টিপ পরতো। আটপৌড়ে শাড়ির আঁচল ছেড়ে কুচি দিয়ে শাড়ি পরতো।

মা কী পছন্দ করে তা আমরা কোনোদিনই জানতে চাইনি। কিংবা মা কোনোদিন বুঝতে দেয়নি। বড়ো হয়ে খেয়াল করলাম মিষ্টি খেতে পছন্দ করে। তাও আবার আমাদের অঞ্চলের বিশেষ মিষ্টি, আমিত্তি। কোনো একদিন মা বলেছিল, তেঁতুল ভর্তায় জিভে জল আসে না, যতটা আসে চ্যাপা শুঁটকির ভর্তায়। সেই থেকে একটু ভর্তা তার জন্য আলাদা রাখি।

মায়ের সই বলতে কোনো গল্প নেই। তবুও ফাগুন মাসের দুপুরে এক পাতা কুড়ানি, পাড়ায় শাড়ি বেচতে আসা বোনেরা, কালো সাবানের ফেরিওয়ালি কিংবা আমাদের ভগবতী পিসিমাকে দেখেছি মায়ের সঙ্গে দুঃখ ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে। তারা অবলীলায় বলে যেত নিজেদের কথা। আর মা বলে কম, কিন্তু শোনে বেশি।

মা শ্রীমতি মিনতি দেবী গল্প বলতে ভালোবাসতো। তার এই গুণ আমি পেয়েছি। পড়ার বিষয়ে মা ছিল কঠোর, আর খাওয়ার বিষয়ে কোমল। মায়ের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম।

মায়ের একটা নিজের বাড়ি ছিল, আমাদের মামার বাড়ি। সেই বাড়ির কত কত গল্প বলত। আমরা মাকে রাগিয়ে দিতে বলতাম, ‘তোমার বাবার বাড়িতে কেবল হাতি ও ঘোড়া ছাড়া সব ছিল; তাই না মা!’ এ কথায় মৃদু হাসতো।

মা মানেই অপেক্ষা। বাবার অপেক্ষায়, দাদার অপেক্ষায়, এরপর আমার অপেক্ষায়। আরও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মেঘের মতো সন্তানদের নিয়ে।

হাঁড়ির শেষ ভাতের দানার স্বাদই সম্ভবত মা, কঠিন জঠরে ঠাসা সময়গুলোর অভিব্যক্তি মা। আঁচলের গন্ধে মৌ মৌ জীবনের গল্প সম্ভবত প্রতিটি মা। আমার মা জীবনের খুঁটি, একজন সাথী, আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

নির্লিপ্ত চোখে চুনের পানিতে ভিজিয়ে রাখে যে জীবন, সে জানে না তার তলার গভীর পাথরের বুনন।

মা ও বাবা আজ একসঙ্গে জীবনের ধূসর সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দাদাকে, মানে তাদের প্রথম সন্তান আমাদের ছেঁড়ে চলে গেছে অনেক দূরে! এখন আমার মা সন্তানহারা, যার কাছে জীবনের গল্প কেবল নিরুত্তর এক প্রান্তর। আমি তাই আচমকা ঘুম ভাঙলে আলতো বিড়ালের মতো মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি, যেন রোদ বৃষ্টি যাই আসুক দিন শেষে টিকে থাকবো মায়ের কাছেই।