ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের পথে: পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তার বিশ্বাস ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে এগোচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মস্কোয় সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে ইউক্রেনে বিজয়ের অঙ্গীকার করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পুতিন বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি শেষের দিকে যাচ্ছে।’ ইউরোপে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসতেও তিনি আগ্রহী বলে জানান। এ ক্ষেত্রে তার পছন্দের আলোচনাসঙ্গী হিসেবে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ট শ্রোডারের নাম উল্লেখ করেন।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর মস্কো ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ১৯৬২ সালের কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সবচেয়ে গভীর সংকটে পড়ে। সেসময় বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। তবে পুতিন বারবার বলে আসছেন, মস্কো যাকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলছে, তার সব লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
ক্রেমলিনে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পশ্চিমা ‘গ্লোবালিস্ট’ নেতাদের দায়ী করেন। তার অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের পর ন্যাটোকে পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পশ্চিমারা। কিন্তু পরে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বলয়ে টানার চেষ্টা করা হয়।
পুতিনের এ বক্তব্য আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে পালিত ৯ মে জাতীয় ছুটির দিনের কুচকাওয়াজের কয়েক ঘণ্টা পর। প্রতিবছরের এ আয়োজনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিককে স্মরণ করা হয়।
তবে এবারের কুচকাওয়াজ ছিল অনেকটাই সীমিত। সাধারণত রেড স্কয়ারে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক ও অন্যান্য ভারী সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হলেও এবার ক্রেমলিনের দেয়ালের বিপরীতে বড় পর্দায় সামরিক সরঞ্জামের ভিডিওচিত্র দেখানো হয়।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে রুশ বাহিনী। রাশিয়ায় ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর অংশগ্রহণের সময়কাল থেকেও এ যুদ্ধ দীর্ঘ হয়েছে।
১৯৯৯ সালের শেষ দিন থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা পুতিন বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে মস্কোয় বাড়তে থাকা উদ্বেগের মুখে রয়েছেন। এ যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের রুশ অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
এ পর্যন্ত রুশ বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন দুর্গনগরীগুলোর একটি প্রতিরক্ষা লাইনে অবস্থান করছে। চলতি বছরে রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর হলেও দেশটি এখনও ইউক্রেনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে একতরফাভাবে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরকে দায়ী করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যা মস্কো ও কিয়েভ উভয়ই সমর্থন করে। পাশাপাশি দুই পক্ষ এক হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই এটি থেমে যাক। প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সেনা মারা যাচ্ছে। এটা পাগলামি।’ তিনি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানোর আশাও প্রকাশ করেন।
এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কোনো খবর মস্কো বা কিয়েভ—কোনো পক্ষ থেকেই পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তনিও কস্তা গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার আলোচনার ‘সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
তবে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি কি না—এমন প্রশ্নে পুতিন বলেন, তার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হচ্ছেন শ্রোডার।
ইউরোপীয় নেতারা বরাবরই বলে আসছেন, ইউক্রেনে রাশিয়াকে পরাজিত করতে হবে। তাদের দাবি, যুদ্ধে জয়ী হতে দিলে পুতিন ভবিষ্যতে ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশেও হামলা চালাতে পারেন। যদিও রাশিয়া এসব অভিযোগকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া পুতিনের মতে, ইউক্রেনকে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোই যুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুতিন বলেন, স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই এমন বৈঠক সম্ভব।

