এক্সপ্লেইনার

আর্টেমিসের তোলা চাঁদের ছবিগুলো যে কারণে ‘গুরুত্বপূর্ণ’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মানুষ শেষবার চাঁদের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলেছিল ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো–১৭ মিশনে। তখন পৃথিবী ছিল পুরোপুরি অ্যানালগ। ক্যামেরার ফিল্ম হাতে করে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরতো নভোচারীরা। ল্যাবে সেই ফিল্ম ডেভেলপ না হওয়া পর্যন্ত পৃথিবীবাসী জানতে পারতো না—তারা কী দেখেছেন।

আজ সেই দৃশ্য বদলে গেছে। অ্যাপোলো যুগের সেই সাদাকালো ছবি আর অ্যানালগ দিন পেছনে ফেলে এবারের অভিজ্ঞতা ছিল ডিজিটাল বিপ্লবের।

নাসার আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীরা ডিজিটাল ক্যামেরা ও আইফোনে একের পর এক ছবি তুলে সরাসরি পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে গেছে মানুষের কাছে এবং সৃষ্টি করেছে নতুন বিস্ময়।

১ এপ্রিল যাত্রা শুরুর পর ৬ এপ্রিল চাঁদের ‘অন্ধকার অংশ’ দিয়ে ঘুরে আসার সময় চাঁদ, পৃথিবী এবং মহাকাশযানের ভেতরের জীবনের অসাধারণ সব ছবি তুলেছেন নভোচারীরা।

ওরিয়ন ক্যাপসুলের ৫টি জানালা দিয়ে একইসঙ্গে চাঁদ ও পৃথিবী—দুই জগতকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলে তাদের মহাজাগতিক ফটোশ্যুট।

চাঁদের কোল ঘেঁষে আর্টেমিস-২ মিশনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কিছু ছবি ও তার গুরুত্ব তুলে ধরে টাইম ম্যাগাজিন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

চাঁদের অদেখা মুখ

আপনি যদি কখনও চাঁদে না গিয়ে থাকেন, তবে চাঁদের এই অংশটি দেখতে পাবেন না। পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না চাঁদের এমন একটি অংশের ছবি তুলেছেন আর্টিমিস-২ এর নভোচারীরা।

চাঁদ
পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না চাঁদের এই দূরবর্তী অংশ। ছবি: নাসা

ছবির ওপরের অংশে রয়েছে বিশাল অববাহিকা বা সাগর, যা সব সময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। ছবির নিচের দিকে থেকে অর্ধেকটা হলো চাঁদের সেই ‘দূরবর্তী অংশ’ বা ‘অন্ধকার অংশ’, যা পৃথিবী থেকে দেখা যায় না।

ছবির মাঝখানের কালো অংশটি হলো ওরিয়েন্টাল বেসিন, যা একটি প্রাচীন ছয়শ মাইল প্রশস্ত লাভা প্রবাহ। চাঁদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুই অংশকে যুক্ত করেছে এই লাভা প্রবাহ।

আলোছায়ার রেখা—‘দ্য টার্মিনেটর’

চাঁদের দূর প্রান্ত প্রদক্ষিণের তিন ঘণ্টার মাথায় নভোচারীরা উঁচু কোণ থেকে একটি চমৎকার ছবিটি তোলেন।

আলোছায়ার রেখা
চাঁদের আলোকরেখা, যার নাম ‘দ্য টার্মিনেটর’। ছবি: নাসা

ছবিতে ওপরের বাম দিকে যেখানে চাঁদের অন্ধকার ও আলোকিত অংশ আলাদা হয়েছে, সেই অংশটির নাম ‘দ্য টার্মিনেটর’ বা আলোকরেখা।

সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোর কারণে চাঁদের খাড়া পাহাড় আর গর্তগুলোর দীর্ঘ ছায়া তৈরি হয়েছে, যা দৃশ্যটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

চাঁদের রুক্ষ ভূখণ্ডও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই ছবিতে। এ ধরনের ছবি অ্যাপোলো যুগে নভোচারীদের অবতরণের সময় ভূখণ্ডটি বুঝতে সাহায্য করেছিল।

মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ

পৃথিবী থেকে আমরা যখন সূর্যগ্রহণ দেখি, তখন সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। কিন্তু ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে দেখা এই সূর্যগ্রহণ ছিল একদম ভিন্ন। সেখানে চাঁদের বিশাল কালচে অবয়বের পেছনে ঢাকা পড়েছিল সূর্য।

ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে দেখা এই সূর্যগ্রহণ
ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে দেখা ৫৪ মিনিটের সূর্যগ্রহণ

পৃথিবী থেকে দেখা সূর্যগ্রহণের মতো আলোছটা এখানে খুব কম দেখা যায়। পৃথিবী থেকে পূর্ণ গ্রাস সূর্যগ্রহণ যেখানে মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, সেখানে নভোচারীরা টানা ৫৪ মিনিট ধরে এই দৃশ্য উপভোগ করেছেন।

সূর্যগ্রহণ।
সূর্যগ্রহণের আরেকটি দৃশ্য, বাম পাশে শুক্রগ্রহ। ছবি: নাসা 

একই দৃশ্যের আরও একটি ছবি তুলেছেন নভোচারীরা। যেখানে পাশেই দেখা যাচ্ছিল উজ্জ্বল শুক্র গ্রহকে।

চাঁদের মায়াবী টান

মিশনের পঞ্চম দিনে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে নভোচারীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলের জানালা দিয়ে এমন একটি মুহূর্ত ধারণ করেন, যখন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে চাঁদের নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণের সীমানায় প্রবেশ করছিল আর্টিমিস-২।

চাঁদ
চাঁদের নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণের সীমানায় প্রবেশ করছে আর্টিমিস-২। ছবি: নাসা

এ সময় চাঁদের টান ধীরে ধীরে পৃথিবীর টানকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে এবং আর্টিমিস-২ কে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিল।

চন্দ্রদিগন্তে ‘পৃথিবীর উদয়’

৬ এপ্রিল, সন্ধ্যা ৭টা ৩২ মিনিটে চন্দ্রাভিযানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি দৃশ্য ধারণ করেন নভোচারীরা।

পৃথিবী
চাঁদের দিগন্ত চিরে উদিত নীল-সাদা পৃথিবী।  ৬ এপ্রিল, সন্ধ্যা ৭টা ৩২ মিনিটে তোলা। ছবি: নাসা

চাঁদের দিগন্ত চিরে উদিত হচ্ছিল নীল-সাদা পৃথিবীর এক সরু ফালি। চাঁদের অমসৃণ দিগন্তের কারণে পৃথিবীর কিছুটা অংশ ঢাকা পড়েছিল। ছবিতে দুই মহাজাগতিক বস্তুর উত্তর মেরু বামে ও দক্ষিণ মেরু ডান দিকে রয়েছে, যা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে।

অ্যাপোলো ৮ এর বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির আধুনিক সংস্করণ বলা যায় এটিকে। ছবিতে দৃশ্যমান পৃথিবীর অংশটি অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের।  

চাঁদের গহ্বর

পৃথিবী থেকে দেখা যায় না চাঁদের দূরবর্তী অংশের এমন আরও একটি ছবি তুলেছেন নভোচারীরা।

‘ভ্যাভিলভ ক্রেটার’
‘ভ্যাভিলভ ক্রেটার’ বা চাঁদের গহ্বর। ছবি: নাসা

ছবিটির কেন্দ্রে রয়েছে ‘ভ্যাভিলভ ক্রেটার’ বা উল্কাপাতের কারণে সৃষ্ট বড় গর্ত। এর ডান পাশে অপেক্ষাকৃত সমতল অংশটির নাম ‘হার্টজস্প্রাং বেসিন’। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বেসিনটিও অনেক আগে উল্কাপাতের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। লাভা প্রবাহের ফলে এটি তুলনামূলকভাবে সমতল।

সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোতে দীর্ঘ ছায়াসহ ভূখণ্ডটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রেকর্ড ভাঙ্গার ইতিহাস

চাঁদের ভূপৃষ্ঠ থেকে তখন মাত্র চার হাজার ৬৭ মাইল দূরে ছিলেন আর্টিমিস-২ এর নভোচারীরা। চাঁদের এতো কাছ থেকে ঘুরে আসা, ইতিহাসে রেকর্ড।

ভিক্টর গ্লোভার ও স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কচ জানালার কাছে তন্ময় হয়ে সেই চাঁদকে দেখছিলেন।
ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ জানালা দিয়ে চাঁদকে দেখছেন। ছবি: নাসা

আর্টিমিস-২ এর পাইলট ভিক্টর গ্লোভার ও স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কচ জানালার কাছে তন্ময় হয়ে সেই চাঁদকে দেখছিলেন।

পৃথিবীর বিদায়—‘আর্থসেট’

‘আর্থরাইজ’ এর বিপরীত দৃশ্য এটি। 

চাঁদের ওপরে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে পৃথিবী।
চাঁদের ওপরে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে পৃথিবী। ছবি: নাসা

 যেখানে চাঁদের ওপরে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে পৃথিবী। নভোচারীদের কাছে এটি ছিল একটি গভীর আবেগময় মুহূর্ত।  

কেন ছবিগুলো গুরুত্বপূর্ণ

চাঁদের দূরবর্তী বা অন্ধকার অংশের খুব কাছ থেকে তোলা এই ছবিগুলো শুধু সুন্দর দৃশ্যই নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার।

সূর্যের আলো যে কোণে পড়ছে, তাতে চাঁদের ভূখণ্ড কেমন তা বোঝা সহজ হচ্ছে এসব ছবির মাধ্যমে।

‘ভ্যাভিলভ ক্রেটার’ থেকে শুরু করে ৫৪ মিনিটের সূর্যগ্রহণের মতো বিরল দৃশ্যের ছবি বিজ্ঞানীদের জানার তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

একইসঙ্গে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ এর দূরত্বের রেকর্ড ভেঙে নতুন এক মহাকাশ যুগের সূচনা করেছে আর্টিমিস-২।