আর্টেমিস-২

নভোচারীরা ফিরছেন শনিবার ভোরে, যেসব ঝুঁকির কথা জানাল নাসা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযান তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওরিয়ন স্পেসক্রাফট এখন প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল শনিবার এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

চাঁদে মানুষের পরবর্তী পদযাত্রা (আর্টেমিস-৩) সফল করার জন্য এই অবতরণটি নাসার কাছে একটি বিশাল পরীক্ষা।

নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রকৌশলী, প্রত্যেক প্রযুক্তিবিদ—যারা ওরিয়ন স্পেসক্রাফটটিতে কাজ করেছেন, আগামীকালের দিনটি আপনাদের। নভোচারীরা তাদের কাজ করেছেন, এখন আমাদের পালা।’

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ অবতরণের পর এটিই হবে প্রথম চাঁদ থেকে ফিরে আসা কোনো মনুষ্যবাহী মহাকাশযানের ফিরে আসার ঘটনা।

মহাকাশযানটি কখন ও কোথায় অবতরণ করবে, এই ফেরার পথে নভোচারীদের শেষ মুহূর্তের অনুভূতি কেমন এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—এসব কিছু নিয়ে আজ শুক্রবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

কখন ও কোথায় অবতরণ

নাসার তথ্য অনুযায়ী, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি (যাকে নভোচারীরা 'ইন্টিগ্রিটি' নাম দিয়েছেন) ১১ এপ্রিল গ্রিনিচ সময় রাত ১২টা ৭ মিনিট বা বাংলাদেশ সময় শনিবার ১১ এপ্রিল ভোর ৬টা ৭ মিনিট নাগাদ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

নাসার উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নভোচারীদের উদ্ধার করে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি মার্থা-তে নিয়ে যাবে।

nasa
আর্টেমিস-২ যেভাবে পৃথিবীতে প্রবেশ করবে। ছবি: নাসা

তবে অবতরণের জন্য কিছু আবহাওয়া সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে, যেমন ঢেউয়ের উচ্চতা ১ দশমিক ৮ মিটারের কম হতে হবে, বাতাসের গতি হতে হবে ঘণ্টায় ৪৬ কিলোমিটারের নিচে এবং ৩০ নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো বৃষ্টি বা বজ্রপাত না থাকা।

পৃথিবীতে ফেরার প্রক্রিয়া

মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক ওয়েবসাইট স্পেস ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি যখন বায়ুমণ্ডলে আঘাত করবে, তখন এর গতি থাকবে ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। এই গতিতে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও পৌঁছাতে ২০ মিনিটের কম সময় লাগবে।

 

এ প্রক্রিয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে।

বিচ্ছিন্ন হওয়া

অবতরণের ৪২ মিনিট আগে সার্ভিস মডিউলটি ক্যাপসুল থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং সেটি বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। শুধু ক্রু মডিউলটি (যেখানে নভোচারীরা আছেন) পৃথিবীতে নামবে।

গতি কমানো

ওরিয়ন ক্যাপসুলটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে গতি নাটকীয়ভাবে কমে যায়। ঘণ্টায় ৩৮ হাজার ৩৬৭ কিলোমিটার থেকে কমে ঘণ্টায় ৫২৩ কিলোমিটারে নেমে আসবে।

প্যারাসুট

এরপর ১১টি প্যারাসুট ধাপে ধাপে খুলে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্যাপসুলের গতি কমিয়ে ঘণ্টায় মাত্র ৩২ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হবে। এরপর এটি মৃদুভাবে সাগরে আছড়ে পড়বে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় থেকে মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে তার অবতরণস্থল পর্যন্ত ৩ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে।

ঝুঁকি—হিট শিল্ড

চাঁদ থেকে ফেরার সময় ক্যাপসুলটি যখন বায়ুমণ্ডলে আছড়ে পড়বে, তখন বাতাসের চাপে এর বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা গলিত লাভার চেয়েও বেশি গরম।

এই প্রচণ্ড তাপ থেকে নভোচারীদের বাঁচাতে ওরিয়নে 'অ্যাভকোট' নামে উপাদানে তৈরি হিট শিল্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এটি নিজে পুড়ে গিয়ে ভেতরের তাপকে বাইরে বের করে দেয়।

nasa
আর্টেমিস ১ পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর ক্রু মডিউল থেকে অপসারণ করা ওরিয়ন মহাকাশযানের তাপ ঢালটি দেখা যাচ্ছে। ছবি: নাসা

২০২২ সালে আর্টেমিস-১ মিশনের সময় দেখা গিয়েছিল এই শিল্ড থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উপাদান খসে পড়েছে। যদিও নাসা আত্মবিশ্বাসী যে তারা সমস্যাটি সমাধান করেছে, তবুও কিছু বিশেষজ্ঞ এটিকে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।

ব্ল্যাকআউট পিরিয়ড

বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় উত্তপ্ত গ্যাসের কারণে ক্যাপসুলের চারদিকে আয়োনাইজড প্লাজমার একটি স্তর তৈরি হয়। এর ফলে প্রায় ৩ থেকে ৬ মিনিট পৃথিবী থেকে নভোচারীদের সঙ্গে কোনো রেডিও যোগাযোগ থাকবে না। এই সময়ে নভোচারীরা সম্পূর্ণ একা থাকবেন এবং হিট শিল্ডটি তার সবচেয়ে কঠিন কাজ সম্পন্ন করবে।

যে সময়টা নভোচারীদের জন্য কষ্টকর

মহাকাশযানটি তীব্র বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় দ্রুত গতি কমার কারণে নভোচারীরা প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় শক্তির সম্মুখীন হন। এই শক্তি সাধারণত পৃথিবীতে আমাদের অনুভূত স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের তিন থেকে সাত গুণ পর্যন্ত হতে পারে।

মহাকর্ষীয় টান যত বেশি হয়, একজন ব্যক্তি নিজেকে তত ভারী অনুভব করেন। যদি মহাকর্ষীয় বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের পাঁচগুণ হয়, তাহলে একজন মহাকাশচারী যার স্বাভাবিক ওজন ১০০ কেজি, তিনি নিজেকে ৫০০ কেজি ওজনের মনে করবেন।

nasa
আর্টেমিস-২ অভিযানের চার ক্রু। ছবি: নাসা

প্রবেশের সময় ক্যাপসুলটি কাঁপতে ও গতি কমাতে থাকলে ক্রুরা তাদের আসনে শক্ত করে বাঁধা থাকেন। এই অভিজ্ঞতাটি শারীরিকভাবে কষ্টকর। মানুষ অল্প সময়ের জন্য এটি সহ্য করতে পারে।

একনজরে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সময়সূচি (জিএমটি হিসেবে)

১৫টা ৩৫ মিনিট (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ৯টা ৩৫)—নভোচারীদের ঘুম থেকে জাগানো।
২৩টা ৩৩ মিনিট (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৫টা ৩৩)—সার্ভিস মডিউল থেকে ক্যাপসুল আলাদা হওয়া।
২৩টা ৫৩ মিনিট (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৫টা ৫৩)—বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ এবং রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া।
০০:০৭ (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৬টা ০৭)—প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ
২টা ৩০ মিনিট (বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা)—সংবাদ সম্মেলন।

সরাসরি দেখবেন যেভাবে

নাসা প্লাস, নাসা অ্যাপ এবং নাসার অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

নভোচারীরা যা বললেন

পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, ‘একটি আগুনের গোলার ওপর চড়ে বায়ুমণ্ডল দিয়ে আসাটা সত্যিই গভীর এক অনুভূতি।’

অন্যদিকে নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন মহাকাশ থেকে পৃথিবীর রূপ দেখে বলেছেন, ‘আমরা শূন্য মহাকাশে এক ভঙ্গুর গ্রহে বাস করি। পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করা আমাদের পরম সৌভাগ্য।’

 

কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান বিশ্ববাসীর উদ্দেশে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা অন্তর থেকে চেয়েছিলাম যেন পুরো পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায় এবং আমরা যেন মনে রাখি যে এটি একটি সুন্দর গ্রহ ও মহাবিশ্বের এক বিশেষ জায়গা। আমাদের যা আছে তা আমাদের সবারই আগলে রাখা উচিত।’

nasa
ছবি: নাসা