যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: কোন দেশে কত প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি কেমন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েলও। এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানে এই সংঘাতের সূচনা হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। পাশাপাশি লেবাননেও যুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্ট উন্মোচিত হয়, যা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আকার দেয়।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইরানে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে লেবানন, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের পাল্টা হামলার ফলে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে।
কোন দেশে হতাহত কত?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে তিন হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে এক হাজার ৭০১ জনই বেসামরিক নাগরিক, যাদের মধ্যে ২৫৪ জন শিশু।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯০০ জন নিহত এবং ২০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজে নিহত ১০৪ জন এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা স্পষ্ট নয়।
লেবানন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গত ২ মার্চ থেকে চলা ইসরায়েলি হামলায় ১২৯ শিশুসহ অন্তত ১ হাজার ৫৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
একই তারিখ থেকে হিজবুল্লাহর ৪০০ জনেরও বেশি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে রয়টার্সকে দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি লেবানন কর্তৃপক্ষের দেওয়া মোট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লেবানিজ সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই প্রাণ হারিয়েছেন দক্ষিণ লেবাননে। এর বাইরে দক্ষিণ লেবাননে দুটি পৃথক ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার তিনজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।
সংকটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরাকে অন্তত ১১৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আছেন বেসামরিক নাগরিক, ইরানের অনুসারী শিয়া পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের সদস্য, মার্কিন মিত্র কুর্দি যোদ্ধা, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য। বন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, ইরাকি বন্দরের কাছে ট্যাংকারে হামলায় একজন বিদেশি ক্রু নিহত হন।
এদিকে ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরান এবং লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে দেশটিতে ২৩ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবাননে তাদের ১১ সেনাসদস্য নিহত হন। এর বাইরে গত ২২ মার্চ লেবানন সীমান্তের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর মিসফায়ারে এক ইসরায়েলি কৃষক নিহত হন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরাকের ওপর একটি মার্কিন সামরিক জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ছয়জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। অন্য সাতজন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে নিহত হন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় দুই সেনাসদস্যসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২২ মার্চ কাতারের জলসীমায় একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন কাতারি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, একজন কাতার-তুরস্ক যৌথ বাহিনীর তুর্কি সৈন্য এবং দুইজন তুর্কি প্রতিরক্ষা সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আসেলসানের টেকনিশিয়ান ছিলেন।
কুয়েত কর্তৃপক্ষ সাতজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে।
ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চার ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সুয়েদায় একটি ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে চারজন নিহত হন।
সংঘাত চলাকালে বাহরাইনে পৃথক দুটি ইরানি হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত ২৪ মার্চ জানায়, বাহরাইনে ইরানের হামলায় তাদের একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন। নিহত ওই ঠিকাদার মরক্কোর নাগরিক ছিলেন।
গত ১৩ মার্চ ওমানের সোহার প্রদেশের একটি শিল্পাঞ্চলে ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হন। এ ছাড়া, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে আল-খারজ শহরে একটি আবাসিক এলাকায় দুজন প্রাণ হারান।
এই সংঘাতের মধ্যে উত্তর ইরাকে এক ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন।
সামরিক অভিযান ও ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা এবং ইরানে হামলার নেতৃত্বদানকারী মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগের দিন ৬ এপ্রিল জানায়, তাদের বাহিনী এ পর্যন্ত ইরানের ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সেন্টকম আরও জানায়, তাদের অভিযানে ১৫৫টিরও বেশি ইরানি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গত ১ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটির বিমান বাহিনী ইরানে ১৬ হাজারেরও বেশি বোমা নিক্ষেপ করেছে। ৮০০-এরও বেশি দফায় এসব বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
আইডিএফের দাবি, ইরানের চার হাজার লক্ষ্যবস্তুর ওপর ১০ হাজার পৃথক হামলা চালিয়েছে তারা। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন সামরিক সদর দপ্তর ও শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত নয়টি উড়োজাহাজ ভূপাতিত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলবশত তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।
১২ মার্চ ইরাকের আকাশসীমায় একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মার্কিন বিমান বাহিনীর ছয় ক্রু নিহত হন। এ ছাড়া গত ৩ এপ্রিল ইরানের মধ্যাঞ্চলের আকাশে দেশটির নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযান এবং ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রুওয়াইস ও হাবশান, সৌদি আরবের রাস তানুকা ও সামরেফ এবং কুয়েতের মিনা আল-আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহর মতো তেল শোধনাগারগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কাতারের রাস লাফান এলএনজি কমপ্লেক্সে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির কারণে ‘কাতারএনার্জি’ তাদের কিছু সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মজিউর’ বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের দক্ষিণ ফার্স গ্যাসক্ষেত্র এবং ইস্পাহানের গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তু থেকে বাদ যায়নি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও। ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলেও বড় ধরনের তেজস্ক্রিয়তা বা কাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাবিলা ও বাহরাইনের আলবা অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের মোবারেকা স্টিল কোম্পানি তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো ধ্বংস হওয়ার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বন্দরগুলোর কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। আরব আমিরাতের ফুজাইরা, জেবেল আলী ও খোর ফাক্কান এবং ওমানের সোহার ও সালালাহ বন্দরের কার্যক্রম দফায় দফায় বন্ধ রাখা হয়েছে।
সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় ইয়ানবু বন্দর রপ্তানি সচল রাখার চেষ্টা করলেও সেটি হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের শহীদ হাক্কানি বন্দর এবং বাহরাইনের খলিফা বিন সালমান বন্দরেও হামলার কারণে জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাস ব্যাহত হয়েছে।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।
অন্যদিকে, লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত বিমান হামলায় দেশটির বিশাল অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি সেখানে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলছেন, লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হচ্ছে না। অর্থাৎ, ইরানে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।