ইরান যুদ্ধ: কেন তেহরানের পাশে নেই মস্কো?
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুগপৎ হামলার আজ ষষ্ঠ দিন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরেই রাশিয়া এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।
এক বিবৃতিতে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া এই হামলাকে ‘জাতিসংঘের একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ আখ্যা দেয়।
তেহরানের খুব বেশি ভালো বন্ধু নেই। তবে তাদের মধ্যে যে রাশিয়া অন্যতম, সে ব্যাপারে তেমন কোনো সন্দেহ নেই। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন হলে রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত আসতে পারে।
তাহলে কেন ‘বন্ধু’ ইরানের পাশে নেই ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া? কেন তেহরানকে উদ্ধার করতে রাশিয়ার রাজনৈতিক পেশীশক্তি, সুখোই যুদ্ধবিমান ও অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে না?
এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয়েছে জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে।
রাশিয়া-ইরান অংশীদারিত্ব
আজারবাইজানভিত্তিক রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাজিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘মস্কো-তেহরান বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক প্রকল্পে এক অপরকে সহায়তা দিচ্ছে। এসব প্রকল্প রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা (নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর) এমন একটি প্রকল্প। ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর রাশিয়ার সব ঐতিহাসিক যোগাযোগ পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এই প্রকল্পের সাফল্য তাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।’
২০০০ সালে সাত হাজার ২০০ কিলোমিটার (চার হাজার ৪৭৩ মাইল) দীর্ঘ এই বহুমুখী সড়ক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়া, ভারত ও ইরান চুক্তিবদ্ধ হয়। এই পথ আজারবাইজানের মধ্য দিয়েও যাওয়ার কথা রয়েছে।
সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের মতে, প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া, রাশিয়াকে সহজলভ্য ‘শাহেদ ড্রোন’ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে ইরান।
২০২৩ সাল থেকে এই ড্রোন মোতায়েনের পর ইউক্রেন যুদ্ধের ‘চেহারা বদলে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসেস (সিএনএ) নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক জুলিয়ান ওয়ালার।
ডয়চে ভেলেকে ওয়ালার বলেন, ‘রাশিয়ার যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে ইরান। উৎপাদনের বেশিরভাগ অংশ রাশিয়াতে হলেও ড্রোনের ডিজাইনকে আরও উন্নত করেছে ইরান।’
জানা গেছে, ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে রাশিয়া। এমন কী, তেহরানে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর খবরও শোনা যায়।
স্মাজিন বলেন, ‘তবে রাশিয়া-ইরানের অংশীদারিত্ব টিকে থাকলেও তাদের মধ্যে আদর্শগত মিল নেই। রুশ রাজনীতিকরা ইরানকে খুব একটা পছন্দ করেন না। কিন্তু তারা তেহরানকে একটি নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ উভয় দেশই আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে। তুরস্ক বা মিশরের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। পশ্চিম চাপ দিলে ওই দেশ দুইটি নিমিষেই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেবে।’
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ইউরোপ-রাশিয়া পরিচালক গ্রেগোয়ের রুসের মত, কোনো কোনো দিক দিয়ে মস্কোর ‘গুরুর’ ভূমিকা পালন করে এসেছে তেহরান।
‘দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে ইরানের। তারা রাশিয়াকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে,’ বলেন তিনি।
ইরানের হিসাবে ভুল?
এত কিছুর পরও, বিশেষজ্ঞরা একমত, চলমান সংঘাতে রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
ওয়ালার বলেন, ‘দুই দেশ কোনো ভাবেই একে অপরের সুরক্ষা-মিত্র নয়।’
কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের অলিখিত ‘একে অপরকে হামলা না করার’ বোঝাপড়া চালু আছে। এর ফলে, ইচ্ছে থাকলেও ‘ইসরায়েলের শত্রু’ ইরানকে সহায়তা দিতে পারছে না ক্রেমলিন।
আন্তর্জাতিকসম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজতাবা হাশেমি ডয়চে ভেলেকে বলেন, তেহরান মস্কোর কাছ থেকে ‘দৃশ্যমান রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা’ পাওয়ার আশা করেছিল।
ওই বিশেষজ্ঞ মত দেন, ‘ইরান ভেবেছিল রাশিয়া তাদের প্রতি সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে নেবে। শুধু মৌখিক সমর্থন নয়, সামরিক বা অন্য কোনো উপায়ে ইরানের শত্রুদের স্পষ্ট বার্তা দেবে, যাতে আর হামলা না আসে।’
তবে এ ক্ষেত্রে ইরানের হিসাবে ভুল ছিল বলে জানান হাশেমি।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ও চীনের হাতে আরও বড় বড় সমস্যা করছে। ইরানকে তারা অস্ত্র দিয়ে সহায়তার দায় সেরেছে।’
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মোহাম্মদ ঘেইদি বিশ্বাস করেন, ইরানের নেতারা রাশিয়ার কাছ থেকে সমর্থন না পেয়ে বিস্মিত হননি।
তার মতে, তেহরানে দীর্ঘদিন ধরেই মস্কোর বন্ধুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের এক উক্তির উল্লেখ দেন ঘেইদি।
আহমাদিনেজাদ একবার বলেছিলেন, ‘রাশিয়া সব সময় ইরানকে গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়েছে।’
বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে বলেছিলেন, ‘যেসব দেশকে আমরা বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করতাম, তারা আমাদেরকে যুদ্ধের সময় কোনো ধরনের সহায়তা করেনি।’
ইরান যুদ্ধে মস্কোর লাভ-লোকসান
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক রুস মনে করেন, ইরানে যুদ্ধ দীর্ঘায়ত হলে মস্কোর জন্য বিষয়টি সুবিধাজনক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে “অক্সিজেন” দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু ইরানে যুদ্ধ দীর্ঘসময় ধরে চললে সবার মনোযোগ তেহরানের দিকে স্থির থাকবে। এটা এমন একটি সংঘাত যা খুব সহজেই অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
‘পাশাপাশি, ওয়াশিংটনের পক্ষে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে কূটনীতিক ও সামরিক সমর্থন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না—মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী তাদের প্রাধান্য মধ্যপ্রাচ্যের দিকেই থাকবে,’ যোগ করেন তিনি।
রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাও বয়ে আনতে পারে এই যুদ্ধ।
ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস ওই প্রণালি দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হয়। এর ফলে, বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে ওই দুই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির দাম।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনএ’র জুলিয়ান ওয়ালার বলেন, ‘যদি এক মাস, বা এমন কী এক বছর ধরে তেল-গ্যাসের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে তা তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক রাশিয়ার জন্য সুখবর নিয়ে আসতে পারে।’
এমন পরিস্থিতিতে তেল রপ্তানি থেকে বাড়তি আয় করতে পারবে রাশিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য রুশ নাগরিকদের ওপর যেসব কর আরোপ করেছেন পুতিন, সেগুলো ধীরে ধীরে উঠিয়ে নিতে পারবেন।
তারপরও, ইরানে সরকারের পতন হলে তা রাশিয়ার অবস্থানের প্রতি বড় হুমকি তৈরি করবে।
বিশ্লেষক রুস বলেন, মস্কো নিজেকে পরাশক্তি হিসেবে দেখাতে পছন্দ করে।
‘রাশিয়া, ইরান, চীন ও সিরিয়ার মতো কয়েকটি দেশ বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে পশ্চিমা দেশগুলোকে হটাতে আগ্রহী,’ বলেন তিনি।
রুস মত দেন, ‘কিন্তু এর আগে এই গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা এত দ্রুত কমার নজির নেই। এতে সার্বিকভাবে রাশিয়ার প্রভাব কমবে।’
রাশিয়া-ইরান মৈত্রী ভবিষ্যৎ কি?
হাশেমি বিশ্বাস করেন, এই সংঘাতে রাশিয়ার কাছ থেকে সমর্থন না পেলেও দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরবে না।
‘রাশিয়া ও চীন পশ্চিমের সঙ্গে দরকষাকষির টেবিলে সুবিধা আদায় করে নিতে ইরানকে ভূ-রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টি এমন হয়েছে। এর ফলে, ইরানের বর্তমান শাসক যদি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার তুলনায় পরবর্তী শাসকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে বেশি নজর দেবে ক্রেমলিন।’
‘চীনও একই পথে হাঁটবে, কারণ সে ক্ষেত্রে তেহরানে তাদের প্রভাব কিছুটা হলেও অটুট থাকবে। তবে তারা উভয়ই জানে, ইরানের বর্তমান ধর্মভিত্তিক শাসকদের পতন হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন আসবে,’ ব্যাখ্যা দেন তিনি।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ঘেইদি মত দেন, ইরানের বর্তমান শাসক তবুও রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ, দুইটি দেশের সঙ্গেই পশ্চিমের সম্পর্ক তিক্ত।
এ যেন যেকোনো মূল্যে ‘শত্রুর শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব’ টিকিয়ে রাখার আরেক নজির।
‘তেহরান এই অংশীদারিত্ব হারানোর ঝুঁকি নেবে না। বিশেষত, মস্কোর হাতে যতদিন পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা থাকছে, ততদিন পর্যন্ত,’ বলেন তিনি।




