যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল-সহানুভূতি সর্বকালের সর্বনিম্ন, যেভাবে এমন হলো?
কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,/ আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।—বাংলাদেশের জাতীয় কবির এমন আপ্তবাণী সম্প্রতি মার্কিন মানসে প্রতিফলিত হতে দেখা গেল দেশটির প্রধান মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ে।
বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক রাজশক্তি যখন বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ভূ-মধ্যসাগরতীরের আরবভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রটিই মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্তির সর্বোচ্চ মাত্রা দেখিয়ে আসছে।
জন্মলগ্নের ‘দুর্বলতা’ কাটিয়ে ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যে ‘একক’ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলেও মনে করেন তারা। ইসরায়েল তার জাতীয় জীবনের ‘স্বর্ণ যুগ’-এ পা দিয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। কিন্তু, এমন বাস্তবতায় এলো এক ‘বিপরীত’ সংবাদ। তাও আবার সেই ইসরায়েলকেই নিয়ে।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ ইসরায়েল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পরিচালিত এক জরিপের ফলাফল তুলে ধরে। এতে জানানো হয়, ২০০৩ সালের পর থেকে মার্কিন জনমনে ইসরায়েলিদের প্রতি সহানুভূতি কমে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়—জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৪১ শতাংশ মার্কিনি বলেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় তারা ফিলিস্তিনের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
জরিপ-তথ্য অনুসারে—এক বছর আগে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন ৪৬ শতাংশ এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন ৩৩ শতাংশ মার্কিনি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের রক্তক্ষয়ী হামলার আগে ৫৪ শতাংশ মার্কিনি ইসরায়েলের প্রতি ও ৩১ শতাংশ মার্কিনি ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার কথা বলেছিলেন।
আর যদি গত ২৪ বছরের জরিপ ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে ইসরায়েলকে নিয়ে মার্কিন জনমনে ক্রমশ ‘বিরূপ’ ভাব তৈরি হচ্ছে।
গ্যালাপ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মার্কিনিদের কাছে ইসরায়েল বেশ গুরুত্ব পেয়ে এসেছিল। ২০১৯ সালে এসে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের প্রতি মার্কিনিদের মনভাবে যে বিশাল ফারাক ছিল তা কমতে শুরু করে। এরপর ইসরায়েলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাবনায় শুরু হয় ‘ভাটার টান’।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর পরিচালিত জরিপগুলোয় দেখা যায়, ইসরায়েলিরা ক্রমশ মার্কিনিদের সহানুভূতি হারাচ্ছে।
এরপর গত ২ বছরে ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজায় গণহত্যা চালায়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেয়। আবার যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালায় সেই যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে গাজায় যুদ্ধবিরতিও আসে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েলের একক শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটেও গ্যালাপ-জরিপেও দেখা গেল—ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন মনোভাবে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন ৫৭ শতাংশ বাসিন্দা স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ২০০৩ সালে গ্যালাপের পরিচালিত জরিপের ফলাফলের তুলনায় এটি সর্বোচ্চ।
নতুন জরিপে যুক্তরাষ্ট্রে ৪১ শতাংশ স্বতন্ত্র রাজনীতিবিদ ফিলিস্তিনের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল থাকার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ বলেছে যে তারা ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।
অথচ, স্বতন্ত্র রাজনীতিবিদরা গত দুই দশক ধরে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার কথা বলে আসছিলেন।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নিয়ে বিরোধী ডেমোক্র্যেটদের মনোভাব খুব একটা বদলায়নি বলেও গ্যালাপ প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। এতে বলা হয়—বর্তমানে ৬৫ শতাংশ ডেমোক্র্যেট বলেছেন যে, তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। সেই জরিপে ১৭ শতাংশ ডেমোক্র্যেট বলেছেন, তারা ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।
২০২৩ সালের পর ডেমোক্র্যেটদের সমর্থন ভীষণভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে ভাবনার পরিবর্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এখনো ৭০ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। তবে, ২০২৪ সালের তুলনায় তা ১০ শতাংশ কম। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম রিপাবলিকানদের মনে ইসরায়েলপ্রীতি এত কম দেখা গেল।
বয়স হিসেবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—জরিপে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সের মার্কিনিরা ফিলিস্তিনের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল থাকার কথা জানিয়েছেন। এই বয়সের মার্কিনিদের মধ্যে ২৩ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল—এটি সর্বকালের সর্বনিম্ন।
২ যুগেই ‘বাঁক বদল’ কেন?
২০০২ সাল থেকে ২০২৬ সাল। ইতিহাসের পাতায় মাত্র দুই যুগ। এই সময়টুকুর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে মার্কিন-মানসে দেখা গেল এক বিশাল বাঁক বদলের ঘটনা। এক সময় জনসমর্থনের শীর্ষে থাকা ইসরায়েল এখন সহানুভূতি হারিয়ে সর্বকালের সর্বনিম্নে অবস্থান করছে।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতিসংঘের অসংখ্য নিন্দা-নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেই রাষ্ট্রের প্রতি একক ও এক পাক্ষিক সমর্থন দিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিনিদের মনে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি কমে যাওয়া নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনাম দেয়—‘ইসরায়েল যেভাবে আমেরিকানদের হারালো’।
এতে বলা হয়—ইসরায়েলের ওপর মার্কিনিরা নাখোশ। তাদের সম্পর্কে তিক্তভাব জন্ম নিয়েছে।
গ্যালাপের জরিপ প্রকাশের একদিন পর তথা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল অপ্রত্যাশিতভাবে ইরান আক্রমণ করে বসে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলাকালে ইসরায়েল ইরানের ওপর এমন হামলা শুরু করে। পরে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
গ্যালাপ-জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে বলা হয়, ইসরায়েলের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের প্রবল সমর্থন আছে। তারপরও, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গর্ব করে বলেন, তিনি মার্কিন নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারেন।
২০০১ সালে গোপনে ধারণ করা তার এক বক্তব্যের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়—নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘আমি আমেরিকাকে চিনি। আমেরিকার মনোভাব সহজে বদলে দেওয়া যায়।’
বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সহানুভূতিতে ধস নেমেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে ইসরায়েল তার প্রধান মিত্রকে হারাতে বসেছে। কেননা, লাখ লাখ মার্কিনি দেখেছে ইসরায়েল গাজায় কিভাবে গণহত্যা চালিয়েছে। তারা আরও দেখেছে ইসরায়েল কিভাবে দখলকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে। তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে। ইসরায়েল কিভাবে ফিলিস্তিনে জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছে, তা আর কারও অজানা নয়।
মার্কিনিরা আরও জানে যে, বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি আজ রাষ্ট্রহীন। তাদের কোনো প্রকার মানবাধিকারের নিশ্চয়তা নেই। অথচ, ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে সেখানে অভিবাসী ইহুদিদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এক সমথক জেনিফার ওয়েলশের ভাষ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সমাজমাধ্যমে প্রভাববিস্তারকারী এই ইনটেরিয়র ডিজাইনার বলেছেন—‘আমার স্বামী সবসময়ই বলে থাকেন যে, “ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে ঠিক কী ঘটছে তা আমি জানি না। কিন্তু, এটা জানি যে আমি সেসব রাজনীতিককে অপছন্দ করি তারা সবাই ইসরায়েলের পক্ষে কথা বলেন”।’
জেনিফার যখনই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে কিছু পড়েন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে ইসরায়েল একটি গণহত্যাকারী দেশে পরিণত হয়েছে। আর এমন একটি ঘটনা থেকে ইসরায়েল সম্পর্কে মার্কিন জনমানসে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।
ইতিহাস বলেছে—তেল আবিবের পক্ষে ওয়াশিংটনের চরম পক্ষপাতিত্বের পেছনে জনসমর্থনের কথা বলা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলই ইসরায়েলের সব অন্যায়কে নিজেদের ক্ষমতাবলে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে, তাও জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে। এখন যেন সেই জনসমর্থনই চলে যাচ্ছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই—আটলান্টিকের পশ্চিমপারের যে মহাক্ষমতাধর দেশটির একতরফা সমর্থন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন অবজ্ঞা করে মধ্যপ্রাচ্যে গণহত্যা-দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল, সেই দেশেই ‘ব্রাত্য’ হতে চলেছে তেল আবিব।





