সাক্ষাৎকার

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার

পিনাকী রায়
পিনাকী রায়

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বড় এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, চলতি বছরের ১১ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন হবে। 

দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের কারিগরি দল চুক্তি নবায়নে কাজ করছে। দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।

তিনি জানান, চুক্তিতে নতুন বাস্তবতা ও অতিরিক্ত গ্যারান্টি ক্লজ (নিশ্চয়তার শর্ত) যুক্ত করার বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।

গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিবাচক থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ প্রকল্পের উদ্যোগ নেন।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের দিকে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষ হলেও পরবর্তী সরকারগুলো এটি বাস্তবায়নে এগোয়নি। কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি, তা স্পষ্ট নয়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি আবার চালু করে।

মন্ত্রী জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

এ্যানি জানান, প্রকল্পটির জন্য নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে। প্রয়োজন হলে নির্মাণকাজ শুরুর আগে আরও সমীক্ষাও চালানো হবে। আগামী বাজেটে এ জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যারাজ নির্মাণে সাত বছর সময় লাগতে পারে। সে হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।

মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নিজস্ব অর্থায়নেই এ প্রকল্প শেষ করা সম্ভব। অতীতে দেশ থেকে যে বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে, তার তুলনায় এই অর্থ খুব বেশি নয়।

প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্ষায় বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকটে ভোগা ২৪ থেকে ২৬ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষের জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মায় একটি জলাধার (রিজার্ভার) তৈরি হবে, যেখানে পানি সংরক্ষণ করে কৃষি ও মাছ চাষে ব্যবহার করা যাবে।

ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্প। এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন নেই।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা

তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়নের আগ্রহ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে অর্থ লাগবে, তা পদ্মা ব্যারাজের প্রায় অর্ধেক। তাহলে কেন বিদেশি ঋণ নিতে হবে?

তিনি জানান, একনেক সভায় প্রকল্প প্রস্তাব তোলার আগে আরও বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে।

খাল খনন কর্মসূচি

২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।

তিনি জানান, দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী গত ১৬ মার্চ দিনাজপুরের শাহপাড়া খালে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও নিজ নিজ এলাকায় খাল খনন কার্যক্রম শুরু করেন।

মন্ত্রী বলেন, প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নিয়ে ১৮০ দিনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৬৬৬টি খালের ৮০০ কিলোমিটারের বেশি খনন করা হয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটারের লক্ষ্য ছাড়িয়ে ২৪ থেকে ২৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত খাল খনন করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ্যানি বলেন, সত্তরের দশকের শেষের দিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন কর্মসূচি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে সহায়তা মিলবে।

তিনি বলেন, খালগুলো পুনরুদ্ধার হলে কৃষকরা সেচে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করতে পারবেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় বাড়তে শুরু করবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, সঠিক পদ্ধতিতে খনন না হলে বর্ষায় অনেক খাল আবার ভরাট হয়ে যেতে পারে।

এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এবং ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (ওয়ারপো) এ বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, খালের সঙ্গে নদীর সংযোগ সচল রাখা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার উপায় নিয়েও কাজ হচ্ছে। এই কর্মসূচি সফল করতে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় মানুষকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

নদী ও খালের দূষণ, বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের জলাশয় রক্ষার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, খাল খনন কর্মসূচি জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে পারে।

তিনি জানান, বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করতে বিশ্বব্যাংক, জাইকা (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করছি।

মন্ত্রী আরও বলেন, খালের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অপরিকল্পিত কালভার্ট সরিয়ে ফেলা হবে।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর অনেক খাল দখল করে বাড়িঘর, দোকানপাট ও বাজার নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাছ চাষের জন্য খালে বাঁধও দিয়েছেন। খাল খননের পাশাপাশি সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দখল হওয়া জায়গা উদ্ধার করা হবে।

এ্যানি বলেন, কিছু বাধা আসতে পারে। তবে সেগুলো মোকাবিলা করতেই হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।