বিদ্রোহী কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে ইরানে ‘গৃহযুদ্ধের’ পরিকল্পনা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর
টানা পাঁচ দিন ধরে ইরানে সম্মিলিতভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাদের মূল লক্ষ্য ইরানের শাসক পরিবর্তন। হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও পশ্চিমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভেঙে পড়েনি দেশটির শাসন ব্যবস্থা।
নতুন নেতা নিয়োগের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিবেশী
দেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলের কয়েকটি এলাকায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। সব মিলিয়ে, ‘শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে’ ইরানকে গোলযোগের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনায় জেরুসালেম-ওয়াশিংটনের তেমন সাফল্য আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন ‘চাল’ চেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী কুর্দি সংগঠনগুলোর হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিচ্ছে।
উদ্দেশ্য, ইরানে অরাজকতা সৃষ্টি করে ও ভেতর-বাইরে থেকে শাসকগোষ্ঠীকে নাস্তানাবুদ করা।
এমনটাই দাবি করা হয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বুধবারের প্রতিবেদনে।
কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা
সূত্রদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সরকারবিরোধী সংগঠন ও কুর্দি নেতাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে ‘সামরিক সহায়তা’ দেওয়াই এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য।
ইরান-ইরাক সীমান্তে ইরানের কুর্দি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাজারো যোদ্ধা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তান ইরানের বিদ্রোহী কুর্দিদের মূল ঘাঁটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কুর্দিদের বেশ কয়েকটি সংগঠন বিবৃতি দিয়ে হামলাকারীদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা ইরানের সেনাবাহিনীকে সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
এমন পরিস্থিতিতে কুর্দি সংগঠনগুলোর ওপর হামলা শুরু করেছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। বিপ্লবী বাহিনী গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা সশস্ত্র কুর্দিদের সবচেয়ে বড় সংগঠনটির বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
একইদিনে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কুর্দিস্তান গণতান্ত্রিক দলের (কেডিপিআই) সভাপতি মুস্তফা হিজরির সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের কুর্দিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী যাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের মধ্যে কেডিপিআই অন্যতম।
এর আগে ইরাকের কুর্দি নেতাদের সঙ্গেও গত রোববার আলোচনা করেন ট্রাম্প। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও কুর্দিরা সম্মিলিতভাবে স্থল অভিযানকে এগিয়ে নিতে পারে, তা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও এই আলোচনার বিষয়ে অবগত আছেন এমন এক সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে এসব তথ্য জানিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস সবার আগে এ বিষয়টি জানায়।
কয়েকদিনের মধ্যেই কুর্দিদের অভিযান শুরু
আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করবে ইরানের কুর্দিরা। এমন প্রত্যাশার কথা সিএনএনকে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ কুর্দি কর্মকর্তা।
এখন পর্যন্ত পাঁচ দিনের যুদ্ধে কোনো স্থল অভিযান চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ঘাটতি পূরণেই কুর্দিদের শরণাপন্ন হচ্ছে এই দুই শক্তিধর দেশ।
এক কুর্দি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সামনে বড় সুযোগ আসছে।’
তিনি অভিযানের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়েও আলোচনা করেন। জানান, তারা মার্কিন ও ইসরায়েলিদের পক্ষ থেকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
কুর্দিস্তানকে ঘিরে যত পরিকল্পনা
ইরানের কুর্দি সংগঠনগুলোকে অস্ত্র দিতে হলে ইরাকি কুর্দিদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইরাকের কুর্দিস্তানের ভেতর দিয়ে অস্ত্র পাঠানোর প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মত দেন।
এসব আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, কুর্দি সশস্ত্র যোদ্ধারা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখবে। এর ফলে ইরানের ভেতরের স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র-সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বড় শহরগুলোয় রাজপথে নেমে সরকার পতনের আন্দোলনে যোগ দিতে পারবে।
অপর এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, কুর্দিরা ওই অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। এতে ইরানের ক্ষমতাসীনদের সামরিক সক্ষমতা কমে আসবে।
কুর্দিদের নিয়ে ওয়াশিংটন-ইসরায়েলের পরিকল্পনা এখানেই শেষ নয়। কেউ কেউ বলছেন, কুর্দিরা ইরানের উত্তরাঞ্চলের দখল নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেখানে ইসরায়েলের জন্য ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ স্থান তৈরি করা যেতে পারে।
সিআইএ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ-আশংকা
বিশ্লেষকদের ভাষ্য: ওয়াশিংটন ও তেল আবিব উপলব্ধি করেছে—সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের শাসক পরিবর্তন খুব একটা সহজ হবে না। এ কারণে, তারা এখন চাচ্ছে দেশটির জনগণ এ কাজে এগিয়ে আসুক।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলের পেন্টাগন কর্মকর্তা ও সিএনএনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স প্লিটসাস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই কুর্দিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ইরানে সরকার পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের বেশিরভাগ মানুষের হাতেই অস্ত্র নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর পতন না হলে বা তাদেরকে বাইরে থেকে অস্ত্র সরবরাহ না করলে সরকার উৎখাত করা খুব কঠিন হবে।’
কুর্দিদের অস্ত্র দেওয়ার পরিণাম কী হতে পারে, তা পুরোপুরি ভেবেচিন্তে দেখা হয়েছে কী না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পররাষ্ট্র দপ্তরের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মকর্তা জেন গাভিটো।
গাভিটো গণমাধ্যমটিকে বলেন, ‘এতে ইরানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে। সশস্ত্র যোদ্ধাদের জবাবদিহিতা থাকে না। এই উদ্যোগের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে (ট্রাম্প প্রশাসনের) খুব একটা ধারণা নেই।’
একটি সূত্র জানান, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরাক সীমান্ত এলাকায় ইরানের সামরিক বাহিনী ও পুলিশের চৌকিগুলোয় হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এলাকা দিয়ে সশস্ত্র কুর্দিরা যাতে সহজে ইরানে ঢুকতে পারে, সেই পথ সৃষ্টির জন্যই এই উদ্যোগ।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে কুর্দিদের ‘দীর্ঘদিনের সম্পর্ক’
ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই কুর্দিদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে সিআইএর। ইরান সীমান্তের কাছাকাছি ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তানে সিআইএর স্থাপনাও আছে।
ইরাকি কুর্দিস্তানের ইরবিল শহরে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটও আছে। সেখানে আইএসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
বিদ্রোহী কুর্দিদের আশা—যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে তারা ইরাকের কুর্দিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে। তবে এটা কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
কয়েকজন বিশ্লেষক আশংকা করে বলেছেন, এবারও ইরানে মার্কিনিদের সঙ্গে কাজ করে প্রতারিত হবে কুর্দিরা।
সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুর্দি বাহিনীর ওপর ভরসা রেখেছিল ওয়াশিংটন। তাদের দায়িত্ব ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলে অস্থায়ী কারাগারে আটক হাজারো আইএস যোদ্ধাদের পাহারা দেওয়া।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সিরীয় সরকার দেশটির উত্তরাঞ্চলের দখল নিতে বড় আকারে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। সে সময় উত্তরাঞ্চল থেকে আইএসের সদস্যদের পাশাপাশি কুর্দিদের সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) বাহিনীর সদস্যদেরও তাড়িয়ে দেয় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী।
পাশাপাশি, সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর সেই কারাগার পাহারার কাজও ছেড়ে দেয় কুর্দিরা।
গত জানুয়ারিতে সিরিয়ায় নিযুক্ত বিশেষ মার্কিন দূত টম বারাক বলেছিলেন, কুর্দি এসডিএফের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রয়োজন’ ফুরিয়ে গেছে।
একই কায়দায়, ইরানেও কুর্দিদের প্রয়োজন মিটে গেলে তাদেরকেও ‘ছুঁড়ে ফেলতে’ পারে ওয়াশিংটন। এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।



