বৈরী আবহাওয়ায় টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না এলএনজি জাহাজ, চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট

অরুণ বিকাশ দে
অরুণ বিকাশ দে

আবারও তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মঙ্গলবার রাত থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ জট।

হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর হাজারো গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েছেন। ধীরগতির হয়ে পড়েছে গণপরিবহন ও অন্যান্য যান চলাচলও।

নগরীর আসকার দিঘীর পাড় এলাকার বাসিন্দা সুস্মিতা পাল বুধবার সারাদিন রান্নার জন্য গ্যাসের অপেক্ষায় ছিলেন। রাতে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সকাল থেকে কোনো গ্যাস নেই। বিকেল ৩টার দিকে কয়েক মিনিটের জন্য এসেছিল, এরপর আবার চলে গেছে। আজ সারাদিন কিছুই রান্না করতে পারিনি।

আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি সংকট ছড়িয়ে পড়েছে নগরীর পরিবহন খাতেও। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে।

অক্সিজেন এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আব্দুল গফুর বলেন, সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও বিকেল পর্যন্ত তার পালা আসেনি।

তিনি বলেন, চাপ এত কম যে একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি সময় লাগছে। লাইনও প্রায় এগোচ্ছেই না।

আজ বৃহস্পতিবার সকালেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। আসকার দীঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা শুভেচ্ছা ঘোষ বলেন, সকাল থেকে চুলায় গ্যাস না থাকায় সন্তানের জন্য নাশতাও তৈরি করতে পারেননি।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বুধবার সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ১৮০ থেকে ১৯০ এমএমসিএফডিতে। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, আগের সংকটগুলোর মতো এবার মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেনি। সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।

তারা জানান, নতুন করে আসা একটি এলএনজিবাহী জাহাজ প্রচণ্ড বাতাসের কারণে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) মো. শোয়েব বলেন, টার্মিনালে নিরাপদে এলএনজিবাহী জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতিবেগ ২০ নটের নিচে থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমানে মহেশখালীতে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ ভেড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি জানান, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ এমএমসিএফডি হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৪০০ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছে।

শোয়েব বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে জাহাজটি নিরাপদে টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫০ এমএমসিএফডিতে উঠবে। এতে চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কমে আসবে।

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রফিক খান বলেন, বুধবার বিকেলে তাদের গ্যাসপ্রাপ্তির পরিমাণ কমে ১৯০ এমএমসিএফডিতে নেমে যায়। ‘সময়ের সঙ্গে সরবরাহ আরও কমছে। কখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা পুরোপুরি সাগরের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে,’ বলেন তিনি।

এর আগে গত ২১ জুলাই থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ একই ধরনের গ্যাস সংকটে ভুগেছিল চট্টগ্রাম। তখন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর একটিতে বয়লার সমস্যার কারণে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আংশিকভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বন্দরনগরীর বাসিন্দারা।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘সাগর উত্তাল রয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি করতে বলা হয়েছে।’