গ্যাস সংকট মেটাতে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি: বাড়বে ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আরও বেশি করে আমদানি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ জন্য নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) ভাড়া এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ভর্তুকির বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ঝুঁকিও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর পর থেকেই এলএনজির ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকার এখন এমন একটি নতুন এফএসআরইউ ভাড়া নেওয়ার কথা ভাবছে, যেটি প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। পাশাপাশি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নতুন একটি এফএসআরইউ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে চীনের ‘চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।

পেট্রোবাংলার প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) গত ২৮ জুন মাতারবাড়ীর প্রস্তাবিত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের জন্য লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক নিয়োগে আগ্রহপত্র আহ্বান করে। পরে ১৫ জুলাই ওই বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করা হয়। আগ্রহপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৭ জুলাই থেকে বাড়িয়ে ১০ আগস্ট করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে মাতারবাড়ীকে বড় এলএনজি আমদানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আরও এগিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন ক্রমেই আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন পাঁচ বছরে ২২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে এসেছে। একই সময়ে এলএনজি আমদানি ৬ দশমিক ১২ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ঘনমিটার। একই সময়ে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ঘনমিটার।

এদিকে এলএনজি আমদানির ব্যয় ২০২০-২১ অর্থবছরের ১৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি শুরু করার সময় সরকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। এরপর ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪—এই তিন অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা করে। ভর্তুকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সম্প্রতি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, আমদানি করা গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কতটা বড়। ওই টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অথচ চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি এফএসআরইউ চালু রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত গ্যাস পুনরায় সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এলএনজির প্রাপ্যতা ও পরিচালনাগত অবস্থার কারণে প্রকৃত সরবরাহ সব সময় এক রকম থাকে না। এই ঘটনা দেখিয়েছে, একটি এলএনজি স্থাপনায় সমস্যা হলেই দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

নতুন এফএসআরইউ চালু হলে আবার গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে। আর মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়াবে।

তবে এই সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির জন্য আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রাও প্রয়োজন হবে। আমদানি করা এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি।

গত বছর পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল, প্রতি ঘনমিটার আমদানি করা এলএনজির খরচ প্রায় ৬৫ টাকা। অথচ শিল্প খাতে গ্যাস বিক্রি করা হয় ৩০ টাকা এবং নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) পরিচালনাকারীদের কাছে ৩১ টাকা ৫০ পয়সা দরে। এই দামের পার্থক্য পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়, যাতে শিল্পকারখানার জন্য গ্যাসের দাম সহনীয় থাকে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে বর্তমানে যে দামে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে, সেই দাম বাস্তব উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উৎপাদন খরচ বেশি হলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। কিন্তু আরও বেশি এলএনজি আমদানি করলেও বর্তমান দামে তা শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী হবে না।

তিনি বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে মনে হচ্ছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে এলএনজি আমদানির দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, শুধু এফএসআরইউ বসালেই হবে না। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থির দামে এলএনজি আমদানি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের এলএনজি কেনা আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে বেশি কেনাকাটা করলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাই এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে এলএনজি কেনা, সেটি পরিবহন এবং গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পুরো ব্যবস্থার ব্যয়ও বহন করতে হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও স্বীকার করেছেন, এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গত সোমবার এক সংলাপে তিনি বলেন, আমরা যদি নতুন এফএসআরইউ ভাড়া করি, তাহলে সেই গ্যাস পরিবহনের জন্য পাইপলাইনও লাগবে। কিন্তু বর্তমান পাইপলাইন ব্যবস্থার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নতুন স্থাপনাগুলোকে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে অতিরিক্ত সংরক্ষণ সুবিধা ও নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে।