ঘোড়ার কুস্তি থেকে ভূরাজনীতি, মধ্য এশিয়ার যাযাবর গেমস কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত আগস্টে বিশ্বের ব্যস্ততা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এ বছর তার ব্যতিক্রম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক অভিযান কয়েক দফা স্থগিত ও আবার শুরু হয়েছে, বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এ সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে আলোচনা হয়েছে।
এতসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যেও নজর দেওয়া হয়েছে এমন একটি আয়োজনের দিকে, যা বিশ্বের অধিকাংশ গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে জায়গা করে নেয়নি। আয়োজনটি খেলাধুলার, তবে বিশ্বকাপ নয়। সেখানে আমেরিকান ও রুশরা একই প্রতিযোগিতার মাঠে নামছেন, তবে এটি জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকও নয়।
আয়োজনটির নাম ওয়ার্ল্ড নোম্যাড গেমস বা বিশ্ব যাযাবর গেমস। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে এ সপ্তাহের শুরুতে জমকালো আয়োজনে শুরু হয়েছে ষষ্ঠ বিশ্ব যাযাবর গেমস।
কূটনীতি গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) প্রেসিডেন্ট মাইকেল ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আয়োজন শুধু মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রদর্শনী নয়। এর পেছনে রয়েছে মধ্য এশিয়াকে ঘিরে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চিত্র।
ঘোড়ার কুস্তি থেকে ছাগল নিয়ে খেলা
বিশ্ব যাযাবর গেমসকে মধ্য এশিয়ার অলিম্পিক বলা হয়। এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা প্রতিযোগিতা এখানে অনুষ্ঠিত হয়। রয়েছে প্রায় ছয় ধরনের কুস্তি, বিভিন্ন ধরনের বাজপাখি দিয়ে শিকার, ঘোড়ায় চড়ে ও সাধারণ তীরন্দাজি এবং বেশ কয়েক ধরনের ঐতিহ্যবাহী বোর্ড খেলা।
এর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ ‘কক-বোরু’। পোলো ও রাগবির কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তৈরি এই খেলায় ঘোড়ায় চড়ে থাকা খেলোয়াড়েরা একটি ছাগলের মৃতদেহ প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
অনেকের কাছে খেলাটি অপরিচিত হলেও শুধু মধ্য এশিয়ার দেশগুলোই এতে অংশ নিচ্ছে না। এবারের আয়োজনে শতাধিক দেশের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও আছে।
যুক্তরাজ্যের দলে রয়েছেন মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দল ঘোড়াকে কেন্দ্র করে দুটি প্রতিযোগিতায় নামছে, ঘোড়ার কুস্তি এবং কক-বোরু।
একই মঞ্চে পুতিন, মোদি ও পেজেশকিয়ান
ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণে বিশ্ব যাযাবর গেমসের আরেকটি দিককে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অন্য সদস্যদেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরাও অনুষ্ঠানে ছিলেন। কারণ, বিশকেকেই একই সপ্তাহে এসসিওর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চীনের নেতা শি জিনপিংয়েরও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল। তবে তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি মোকাবিলায় মনোযোগ দিতে তিনি সফর বাতিল করেন।
ফ্রোম্যানের মতে, খেলাধুলা ও চোখধাঁধানো উদ্বোধনী আয়োজনের আড়ালে মধ্য এশিয়াকে কেন্দ্র করে একটি জটিল ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে।
এসসিওকে বহু বছর ধরে পশ্চিমা জোটগুলোর সম্ভাব্য আঞ্চলিক ভারসাম্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও সংগঠনটির প্রভাব অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়, তারপরও আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারে এর স্থায়িত্ব রয়েছে। বিশকেকে এসসিও সম্মেলন ও বিশ্ব যাযাবর গেমস একই সময়ে হওয়ায় মধ্য এশিয়ার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
ইরানের সংকটে মধ্য এশিয়ার গুরুত্ব
ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় মধ্য এশিয়ার দেশগুলো একটি সূক্ষ্ম ভূমিকা পালন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ইরানকে সীমিত হলেও কিছুটা সহায়তা দিচ্ছে।
এসসিও সম্মেলনে পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি মূলত চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরলেও এর মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ইরানের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।
মধ্য এশিয়ামুখী ইরানের এই কৌশল যুদ্ধ শুরুর আগের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হলেও বর্তমান যুদ্ধ সেটিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের অস্থিতিশীলতাকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের জন্য জ্বালানি বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে।
কাজাখস্তান প্রায় কুয়েতের সমপরিমাণ তেল উৎপাদন করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী। তুর্কমেনিস্তানের রয়েছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত। দেশটির প্রায় পুরো গ্যাসই চীনে রপ্তানি হয়।
হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা থেকে ঝুঁকি কমাতে বিশ্বের দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে থাকায় এসব সম্পদসমৃদ্ধ মধ্য এশীয় দেশগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
রাশিয়ার অর্থনীতিরও ভরসা মধ্য এশিয়া
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রুশ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতেও মধ্য এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান। এর ফলে পশ্চিমা ইলেকট্রনিক পণ্য, মাইক্রোচিপ ও যন্ত্রপাতি শুল্ক-নজরদারি ছাড়াই এসব দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় যেতে পারছে। এতে দ্বৈত ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ইউরোপ থেকে কিরগিজস্তানে এসব পণ্যের আমদানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ৮০০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কিরগিজস্তান থেকে রাশিয়ায় এসব পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১ হাজার ২০০ শতাংশ।
ফ্রোম্যানের ভাষ্য, ইরান ও রাশিয়া উভয়ের জন্যই মধ্য এশিয়া এখন অনেকটা লাইফজ্যাকেটের মতো। এটি তাদের বর্তমান সংকট থেকে উদ্ধার করবে না, তবে ভূরাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যে টিকে থাকতে সহায়তা করবে।
চীন যেন সেই লাইফবোট
মধ্য এশিয়া যদি ইরান ও রাশিয়ার জন্য লাইফজ্যাকেট হয়ে থাকে, তাহলে চীন আরও টেকসই আশ্রয় দেওয়া একটি লাইফবোট।
বিশকেকে এসসিও সম্মেলনে শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের প্রকাশ্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বৈঠকে দুই নেতা তাদের ‘সীমাহীন’ অংশীদারত্বের প্রতি আবারও সমর্থন জানান।
ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই জোট পুতিনের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে এটি শির জন্যও সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সমপর্যায়ের অংশীদারত্ব থেকে চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক এখন অনেক বেশি নির্ভরশীলতার দিকে এগিয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসসিও বৈঠকের কয়েক দিন আগে চীন স্পষ্ট করে জানায়, ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্কের শর্ত যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হলেও চীন দ্রুত তা প্রত্যাখ্যান করে।
ফ্রোম্যানের মতে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি চীনেরই রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত শি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে নিজের প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে আলোচনায় বসানোর আগ্রহ দেখাননি।
আঞ্চলিকতা বনাম বিশ্বায়ন
ফ্রোম্যানের বিশ্লেষণে বিশ্ব যাযাবর গেমসকে বর্তমান সময়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছে।
তার মতে, এই আয়োজন ও এর চারপাশের ভূরাজনীতিতে দুটি শক্তি খণ্ডীকরণ ও বিশ্বায়নের টানাপোড়েন স্পষ্ট।
একদিকে খেলাধুলা এবং রাজনীতি দুটোই গভীরভাবে আঞ্চলিক। চীন, ইরান, রাশিয়া ও উজবেকিস্তানের খেলোয়াড়েরা ঘোড়ায় চড়ে তীরন্দাজি বা ঐতিহ্যবাহী কাজাখ বাজপাখি শিকারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। একই সময়ে তাদের নেতারা পশ্চিমা প্রভাব থেকে নিজেদের ও প্রতিবেশীদের দূরে রাখতে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলছেন।
আগের মতো বিশ্ব অর্থনীতির বিস্তৃত একীভূত ব্যবস্থার ওপর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে না। বরং নির্দিষ্ট মিত্র ও অংশীদারদের নিয়ে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।
এ কারণেই এবারের ষষ্ঠ বিশ্ব যাযাবর গেমস আগের যেকোনো আয়োজনের চেয়ে বড় হয়েছে বলে মনে করেন ফ্রোম্যান। তার মতে, অভিন্ন ভূগোল ও সংস্কৃতির ওপর দাঁড়ানো আঞ্চলিকতাই বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে।
তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে।
মধ্য এশিয়া থেকে বহু দূরের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ বিমানে চড়ে এসে নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রাচীন বোর্ড খেলা থেকে ঘোড়ার কুস্তি পর্যন্ত নানা প্রতিযোগিতায়।
ফ্রোম্যানের মতে, তাদের এই অংশগ্রহণ গত তিন দশকের উন্মুক্ততার গল্প বলে। পণ্য ও সেবার বিশ্বায়নের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও রীতিনীতিরও বিশ্বায়ন ঘটেছিল। এখন বিশ্ব যখন অতিরিক্ত বিশ্বায়ন থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসছে, তখন সেই বিশ্বায়নের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার মূল্যও মনে রাখা প্রয়োজন।