লোডশেডিং আর জ্বালানি সংকটেও সৌরবিদ্যুতে স্বস্তি

আহসান হাবিব
আহসান হাবিব

লোডশেডিংয়ের সময়টায় কারখানাগুলো ডিজেল জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু অনেক কারখানা যখন তেল জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনও কিছু প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এর পেছনের কারণ হলো, কারখানার ছাদে স্থাপন করা সোলার প্যানেল।

তৈরি পোশাক খাতের এরকমই একটি প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপ। গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কারখানার ছাদগুলোকে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করেছে। ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তারা ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্যানেল স্থাপন করেছে।

প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশ বড় হলেও এখন এর সুফল পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, ‘এখন আমরা বেশ ভালো সুবিধা পাচ্ছি। লোডশেডিংয়ের সময় এটা চমৎকার ব্যাকআপ দিচ্ছে।’

হা-মীমের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু কারখানার সেলাই মেশিনগুলোকেই সচল রাখছে না। যখন তাদের নিজেদের চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তখন ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে চলে যায়। এতে কারখানার বিদ্যুৎ বিলও কমে আসে।

solar
এআই দিয়ে তৈরি ইনফোগ্রাফ

এ কে আজাদ জানান, সৌরবিদ্যুৎ না থাকলে তাদের গ্রুপকে এখন বড় ধরনের সংকটে পড়তে হতো। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের উৎপাদন খাতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সম্প্রতি কারখানার কাছের পাম্পগুলো থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ইতিমধ্যে দেশের বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কারখানাগুলো এই উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে পারছে।

কেপিজেড ও প্যাসিফিক জিনসের অভিজ্ঞতা

দেশের সবচেয়ে বড় রুফটপ সোলার প্যানেল রয়েছে চট্টগ্রামের কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে (কেপিজেড)। ইয়ংওয়ান করপোরেশন পরিচালিত ২০২০ সালে স্থাপিত এই প্ল্যান্ট থেকে বর্তমানে ৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এটি দিয়ে কেপিজেডের ভেতরের কারখানাগুলোর পিক আওয়ারের চাহিদা মেটানো হচ্ছে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ পিডিবির কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

কেপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, ‘যুদ্ধ বা লোডশেডিংয়ের কারণে সৃষ্ট ডিজেল সংকটে আমরা ভুগছি না। আমাদের অনেক কারখানা রাতে কম চলে, ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা যায়। সেদিক থেকে সৌরবিদ্যুৎ আমাদের ভালো মুনাফা দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ালে শিল্পকারখানাগুলো লোডশেডিং ও ডিজেল সংকট থেকে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় বাজারগুলোতে ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) কারখানার প্রতি বেশি ঝুঁকছেন, তাই এটি ক্রয়াদেশ বাড়াতেও সাহায্য করবে।

তবে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সব কারখানা সৌরবিদ্যুতের শতভাগ সুবিধা নিতে পারছে না। চট্টগ্রামের প্যাসিফিক জিনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এম তানভীর জানান, তাদের কারখানার দিনের বেলায় মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মেটায় সোলার প্যানেল।

লোডশেডিংয়ের সময় এখনো তাদেরকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এরপরও সৌরবিদ্যুৎ থাকায় অন্য কারখানার তুলনায় তার জ্বালানি খরচ কম হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তানভীরের ধারণা, দেশের বিভিন্ন খাতের কারখানাগুলোতে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার স্ট্যান্ডবাই (বিকল্প) জেনারেটর রয়েছে, যার সবই ডিজেলে চলে। এগুলো যদি দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা চলে, তবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, সাধারণত কারখানাগুলোর ব্যাকআপের জন্য এক থেকে দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলে এই চাহিদার বড় অংশই মেটানো সম্ভব। এতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।

পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫১ শতাংশই এসেছে জীবাশ্ম ছাড়া অন্য জ্বালানি থেকে (নন-ফসিল ফুয়েল)।

কম্বোডিয়া তাদের মোট বিদ্যুতের ৬২ শতাংশই পায় নবায়নযোগ্য উৎস, বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ থেকে। এর ফলে তাদের বস্ত্র খাতে কার্বন নির্গমনের হার অনেক কম। অন্যদিকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট জ্বালানি ব্যবহারে নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন শক্তির অবদান প্রায় ৪৬ শতাংশ।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য উৎসের অবদান মাত্র ৩ শতাংশ।

উদ্যোক্তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে প্রধান বাধা হলো এর উচ্চ খরচ। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে শুরুতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয় এবং যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্কও অনেক বেশি।

বর্তমানে শিল্পে ব্যবহৃত (ইন্ডাস্ট্রি-গ্রেড) লিথিয়াম ব্যাটারির ওপর ৫৮ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। কারখানার মালিকেরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সংকটের সময়ে দুই-তিন বছরের জন্য হলেও এই শুল্ক কমানো হলে উদ্যোক্তারা ডিজেল জেনারেটরের বদলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহী হবেন। এতে সরকারের জ্বালানি আমদানির খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব কোম্পানি সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করেছিল, তারা এখন এর সুফল পাচ্ছে, যা একটি ভালো খবর। এটি অন্যদেরও গ্রিন ট্রান্সফরমেশনে উৎসাহিত করবে।

সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে তিনি সরকারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট থেকে শিল্পকে বাঁচাতে আশপাশের আঞ্চল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আনার বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ বলেন, অনেক কারখানা জ্বালানির সংকটে ভুগছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। স্রেডা এ বিষয়ে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, যদিও আমদানি শুল্ক কমানোর বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এখতিয়ারে পড়ে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণেই তিনি বর্তমান জ্বালানি সংকটের ধাক্কা সামলাতে পেরেছেন।

সরকারের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও তিনি বলেন, এর জন্য নীতিগত ছাড় দিতে হবে। নীতিমালায় মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও পিডিবির নির্ধারিত ‘হুইলিং চার্জ’ অনেক বেশি। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, উৎপাদনকারীদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে হবে; তা না হলে এই রূপান্তর খুব বেশি এগোবে না।