অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশ ইন—মানবতার সঙ্গে লঙ্ঘিত হচ্ছে আইনও
গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশ ইন’ বা জোর করে মানুষ ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনা চলছে। ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন সীমান্তে এমন ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যাসহ নানা কারণে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা সবসময়ই ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এর মধ্যে মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বিজেপি সরকার আসার পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন—বাংলাদেশ থেকে এসে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের আর পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেওয়া হবে না। এরপর থেকেই সীমান্তে পুশ ইনের অভিযোগ বাড়তে থাকে এবং এ নিয়ে সীমান্ত উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, জুনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ২০টি পুশ ইন চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে কয়েকশ মানুষ জড়িত ছিল। বেশ কিছু জায়গায় দেখা গেছে, নারী ও শিশুদের নো-ম্যানস ল্যান্ডে (সীমান্তের শূন্যরেখায়) অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় আইনকেই লঙ্ঘন করে। মানুষকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে রাখা একটি মানবিক সংকট তৈরি করে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন জটিল পরিস্থিতিতে আজ সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিজিবি ও বিএসএফের চার দিনব্যাপী ৫৭তম উচ্চ পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন। সেখানে সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে ভারত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আইন আসলে কী বলে? আইনগতভাবে একজন অনুপ্রবেশকারীকে কীভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা?
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে কী হয়?
ভারতে কোনো বিদেশি নাগরিক বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া প্রবেশ করলে, কিংবা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত দেশটির ‘দ্য ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬’ এবং ‘পাসপোর্ট অ্যাক্ট, ১৯৬৭’ অনুযায়ী মামলা হয়। দোষী প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে কাউকে আটক করার পর ভারতীয় আইন অনুযায়ী তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার সম্পন্ন করতে হয়।
সাজা শেষ হওয়া বন্দিদের জেলের ভাষায় 'জান খালাস কয়েদি' বলা হয়। সাজা শেষ হলে কোনো বিদেশিকে সরাসরি সীমান্তে এনে ঠেলে দেওয়া (পুশ ইন) দেশটির আইন অনুযায়ী স্বীকৃত প্রক্রিয়া নয়।
সাধারণত ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা আউট পাস ইস্যু করা হয়। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের আইনে কী আছে?
বাংলাদেশেও কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে প্রবেশ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
‘দ্য ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬’ অনুযায়ী অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থানের দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে আটকের পর সংশ্লিষ্ট থানায় ‘দ্য ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬’ ও ‘পাসপোর্ট অ্যাক্ট, ১৯২০’-এর অধীনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
দেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করতে হয়। বিচার শেষে আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে তাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
সাজা শেষ হলেও ট্রাভেল ডকুমেন্ট তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারেই ‘বিশেষ হেফাজতে’ (ডিটেনশন) থাকতে হয়। প্রথমে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলে ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করা হয়। এরপর বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
তবে সীমান্ত পার হওয়ার সময়ই কেউ ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ‘ফ্ল্যাগ মিটিং (পতাকা বৈঠক)’-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো হয়। এটিকে সাধারণত ‘পুশ ব্যাক’ বলা হয়।
আন্তর্জাতিক আইনে যা বলা আছে
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে আটক করলে তার পরিচয় যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সীমান্তে বলপ্রয়োগ বা পুশ ইনের মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও লঙ্ঘন।
‘ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সনদ।
এই সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিয়ে আলোচনা করে। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বা কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে খামখেয়ালি বা বেআইনিভাবে আটকে রাখতে পারবে না। আটকের কারণ জানাতে হবে এবং দ্রুত বিচারকের সামনে হাজির করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা বা জোর করে পুশ ইন করা এই ধারার পরিপন্থী।
‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস, ১৯৬৩ (ভিসিসিআর)’-এ ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই স্বাক্ষর করেছে। এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হলে তাৎক্ষণিকভাবে আটককারী দেশকে তার দেশের দূতাবাস বা হাইকমিশনকে জানাতে হবে। যতক্ষণ না আটক ব্যক্তির দেশের দূতাবাস তার নাগরিকত্ব নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ তাকে জোর করে ফেরত পাঠানো বা সীমান্তে ঠেলে দেওয়া এই আন্তর্জাতিক সনদেরও পরিপন্থী।
‘কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস, ১৯৬১’ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র কাউকে এমনভাবে একতরফা বহিষ্কার করতে পারে না যাতে ওই ব্যক্তি 'রাষ্ট্রহীন' হয়ে পড়েন।
বিশ্বব্যাপী পুশইনের একটা বড় অজুহাত হলো 'নথিবিহীন' বা 'কথিত নাগরিক' দাবি করা। এই কনভেনশন বলছে, নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কাউকে আন্তর্জাতিক সীমান্তে অলিখিত বা পরিচয়হীন অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না।
সীমান্ত বাস্তবতা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে তাৎক্ষণিক পুশ ইন না করে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি-বিএসএফ) নথিপত্র যাচাই ও পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান পুশ ইনগুলোতে সেই 'কমন প্র্যাকটিস' বা আইন মানা হচ্ছে না। অথচ ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষদের জোর করে পুশ ইন করার ঘটনা ঘটছে। এটা বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের দ্বিচারিতা।
বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত কখনোই নিশ্ছিদ্র ছিল না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই সীমান্ত এলাকার মানুষের আত্মীয়স্বজন ও জমিজমা দুই পারেই আছে। অনেক সময় অসচেতনভাবে বা গৃহপালিত পশু আনতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সীমান্তে চলে যায়। নিয়ম অনুযায়ী, বিএসএফের উচিত এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে তাৎক্ষণিক পুশ ইন না করে বা গুলি না চালিয়ে তাদের আটকে রাখা এবং বিজিবির সঙ্গে নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নেগোসিয়েট করা। কিন্তু এই ধরনের একতরফা পুশ ইন স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কের এক ধরনের লঙ্ঘন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান বলেন, ভারত যেভাবে রাতের আঁধারে জোর করে বা অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) চেষ্টা করছে, তা দুই দেশের স্বাভাবিক সীমান্ত প্রোটোকল, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
বিজিবির অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, বিজিবির মূল দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের সীমান্ত যেন কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয় তা নিশ্চিত করা। সীমান্তে যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বা আগ্রাসনে বাধা দেওয়া বিজিবির আইনি কর্তব্য এবং বর্তমানে তারা সঠিক কাজটিই করছে। যাদেরকে জোর করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তারা যদি বাংলাদেশি হয়েও থাকে, তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রমাণ উপস্থাপনের দায় সম্পূর্ণ ভারতের। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ভারত যদি কাউকে ফেরত পাঠাতে চায়, তবে স্বীকৃত পারাপার কেন্দ্র, ইমিগ্রেশন ও বৈধ প্রবেশপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।