৬৭ শব্দের বৈশ্বিক মহাবিপর্যয় ‘বেলফোর ঘোষণা’ কী
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকস্টে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানো পরও ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেন ইহুদি ধর্মগুরু র্যাবাই ইসরয়েল ডভিড ওয়েস।
তার মতে, ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন না করার কথা বলা হয়েছে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থগুলোয়।
গত বছর ২৬ জুন তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেন, ‘কাউকে হত্যা করে, কারো জমি চুরি করে আবারও একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করার কথা (কিতাবে) নিষেধ আছে।’
তিনি জানান—‘দিন ও রাতের মধ্যে এবং সাদা ও কালোর মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি ইহুদি ধর্ম ও জায়নবাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই দুই মতবাদকে কোনো অবস্থাতেই এক করা যাবে না।’
জায়নবাদ কী?—অনলাইনে এমন প্রশ্নের খোঁজ নিয়ে জানা গেল—জায়নবাদ হচ্ছে ইহুদিদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলে একটি সার্বভৌম ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯ শতকে মূলত অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক থিওদর হারজলের হাত ধরে এই আন্দোলন বেগবান হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেসব ইহুদি জেরুসালেমের ‘জায়ন’ পাহাড়কে নিজেদের আবাসভূমি মনে করেন তারাই জায়নিস্ট বা জায়নবাদী।
জেরুসালেমের পাহাড়টির হিব্রু নাম ‘জায়ন’—একে ‘ইহুদিভূমি’র প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা মোটা দাগে দুইভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। একভাগ ইসরায়েলপন্থি বা জায়নবাদী, অপরটি ইসরায়েলবিরোধী বা জুডাইস্ট বা ইহুদি ধর্মের অনুসারী।
মোট ইহুদিদের মধ্যে জুডাইস্টদের তুলনায় জায়নবাদীদের সংখ্যা কম।
ইতিহাস বলছে—বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান ইহুদি-বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে জায়নবাদ ইহুদিদের এক অংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে এটি খ্রিষ্টানদের মধ্যেও জনপ্রিয় করে তোলা হয়। তাই একজন ব্যক্তি ইহুদি না হয়েও বা ভিন্ন ধর্মের হয়েও ‘জায়নবাদী’ বা ‘ইসরায়েলপন্থি’ হতে পারেন।
অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য: ইহুদিদের তুলনায় খ্রিষ্টান জায়নবাদীর সংখ্যা বেশি। ইহুদি জায়নবাদী যদি একজন হয়, তাহলে খ্রিষ্টান জায়নবাদীর সংখ্যা অন্তত ২০ জন।
মূলত খ্রিষ্টান জায়নবাদীদের সহায়তায় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাষ্ট্রটি লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করেছে। ২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।
১৯৪৮ সালে ইহুদিদের একাংশ ও সব আরব রাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রচেষ্টায় আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিতে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল গঠন করা হয়।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলে সেই ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের প্রস্তাবটিই ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত।
আর্থার বেলফোর কে?
‘বেলফোর ঘোষণা’ সম্পর্কে জানার আগে এই ব্যক্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যেতে পারে।
ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টির নেতা স্যার আর্থার জেমস বেলফোর। ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯১৬ সালে তিনিই আবার ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোন।
১৮৭৪ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ঢুকে আর্থার বেলফোর আয়ারল্যান্ডের ‘চিফ সেক্রেটারি’র পদ পান।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাবিরোধী এই রক্ষণশীল রাজনৈতিক নিজেকে ইহুদিদের ত্রাণকর্তা বানিয়ে ফিলিস্তিন অঞ্চল ইউরোপীয় ইহুদিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জায়নবাদের (ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা) প্রতি ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানানোর কারণে আর্থার বেলফোরকে স্মরণ করা হবে।
আরও বলা হয়, ব্রিটেনে ভিক্টোরীয় যুগে বিজ্ঞান ও ধর্মকে ঘিরে সংঘাত চলার সময় বেলফোর ধর্মের পক্ষ নেন।
১৮৪৮ সালের ২৫ জুলাই স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আর্থার বেলফোর ইংল্যান্ডে মারা যান ১৯৩০ সালের ১৯ মার্চ।
‘বেলফোর ঘোষণা’ কী?
টেক্সাসের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রয় কাসাগ্রান্ডা মনে করেন—তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার জেমস বেলফোরের ‘ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি’ সংক্রান্ত ‘ঘোষণা’ হচ্ছে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পটভূমি।
এক পডকাস্টে তিনি জানান—একদিকে, জায়নবাদীরা যখন ইহুদিদের জন্য ‘পৃথক আবাসভূমি’র দাবি তুলছিল অন্যদিকে, তখন ইউরোপের নেতারা চাচ্ছিল তাদের ওখান থেকে ইহুদিদের সরাতে।
এই দুই আপাত বিপরীতমুখী প্রবণতা ‘বেলফোর ঘোষণা’র জন্ম দিয়েছে, বলেও মত দেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের ইহুদি জায়নবাদীদের নেতা লর্ড লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে এক সংক্ষিপ্ত চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর লিখেন—‘ইহুদি জায়নবাদীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটিশ সরকার সম্মতি দিয়েছে।’
ফিলিস্তিনে বসবাসকারী অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার খর্ব করা হবে না বলেও তিনি চিঠিতে পরিষ্কার করে উল্লেখ করেন। যদিও এই অংশটি আজো বাস্তবায়িত হয়নি।
বেলফোর এই ‘ঘোষণা’ জায়নিস্ট ফেডারেশনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধও করেন লর্ড রথসচাইল্ডের কাছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের ভাষ্য: এই ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেন যেন বিশ্ব রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘প্যানডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছে।
কারও মতে, এটি ‘৬৭ শব্দের বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়’।
তারা মনে করেন, সেসময় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ফিলিস্তিন অঞ্চলে ব্রিটিশদের কোনো প্রভাব ছিল না। এমনকি, একজনের জমি অন্যজনকে দেওয়ার নৈতিক অধিকারও ব্রিটিশদের ছিল না।
ব্রিটিশদের সহযোগিতাকারী আরবরা এই ঘোষণাকে তাদের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে গণ্য করে আসছে।
‘সংঘাতের শুরু’
২০১৭ সালের ২ নভেম্বর ঘোষণাটির শতবর্ষে বিবিসির ‘বেলফোর ডিকলারেশন: দ্য ডিভিসিভ লিগ্যাসি অব সিক্সটি সেভেন ওয়ার্ডস’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একে আরব-ইসরায়েল সংঘাতের শুরু হিসেবে দেখা যেতে পারে।’
ফিলিস্তিনিরা চায়, ‘বেলফোর ঘোষণা’র জন্য ব্রিটেন ক্ষমা চাক।
গত ৯ মার্চ লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ব্রিটেনের ৪৫ এমপি ও রাজনীতিক এক চিঠিতে বেলফোর ঘোষণার জন্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেছেন।
তাদের মধ্যে বর্তমানে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এবং বিরোধী লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টির সদস্য আছেন।
২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বিবিসির অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়—১০০ বছর আগে একটি কাগজে মাত্র ৬৭ শব্দ পবিত্র ভূমিতে (ফিলিস্তিন অঞ্চল) আগুন জ্বালিয়েছিল।
আধুনিক সময়ের সবচেয়ে অমীমাংসিত সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল, বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।
এতে আরও বলা হয়—বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ‘ইহুদিদের দেশ গড়ার’ অনুমতি দেয়। অনেক ইসরায়েলি এই ঘোষণাকে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর ও ইহুদিদের ‘মুক্তির ঘোষণা’ হিসেবে দেখলেও ফিলিস্তিনিরা একে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য করে।
‘বেলফোর ঘোষণা’র সময় ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত শতাংশ। কিন্তু, ইউরোপীয় ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিন অঞ্চলে আসায় ১৯৩৫ সালে তাদের সংখ্যা বেড়ে ২৭ শতাংশ হয়।
গত বছর ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রয় কাসাগ্রান্ডা ‘অফিস আওয়ারস’ পডকাস্টে জানান, আরবরা সবসময়ই ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
তিনি আরও জানান—এমনকি, ইউরোপ থেকে যখন নির্যাতিত ইহুদিরা দলে দলে ফিলিস্তিনে আসছিল তখন আরবরাই সেসব অভিবাসীদেরকে তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিল। আদিবাসী ফিলিস্তিনিরা তাদের জমিতে অভিবাসী ইহুদিদের ঘর করতে দিয়েছিল।
সেসব ইহুদি যখন তাদের আশ্রয়দাতাদের হত্যা ও বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করতে শুরু করলো তখন আরবদের বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না, বলে মন্তব্য করে ড. কাসাগ্রান্ডা।
নেপথ্যে ছিলেন যারা
‘বেলফোর ঘোষণা’ তৈরিতে স্যার আর্থার বেলফোরের মূল ভূমিকা থাকলেও তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী জড়িত ছিলেন বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়।
২০১৭ সালে ঘোষণাটির শতবর্ষে সংবাদমাধ্যমটি জানায়—১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া লর্ড লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ড সেই প্রভাবশালীদের একজন। এই ব্রিটিশ জায়নবাদী নেতা জায়নিস্ট অর্গানাইজেশনের সভাপতি খাইম ভাইজমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
১৯১৭ সালের গ্রীষ্মে আর্থার বেলফোর ইংলিশ জায়নিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি ওয়াল্টার রথসচাইল্ড ও জায়নিস্ট অর্গানাইজেশনের সভাপতি খাইম ভাইজমানকে তাদের জায়নবাদী লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে ঘোষণার খসড়া তৈরিতে সহায়তা করতে বলেছিলেন।
তারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়।
এই তালিকায় আরও আছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া লিবারেল পার্টির এই নেতা ১৯১৬ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তার জোট সরকার ‘বেলফোর ঘোষণা’ অনুমোদন দেয়।
জর্জ বলেছিলেন, ‘আমি আমার জাতির তুলনায় ইহুদি জাতির ইতিহাস বেশি জেনেছি।’
আল জাজিরার প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—ডেভিড লয়েড জর্জ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ব্রিটিশদের সহায়তায় উগান্ডায় ইহুদিদের বসতি স্থাপনের বিষয়ে ‘রাজনৈতিক জায়নবাদের জনক’ হিসেবে পরিচিত থিওদর হারজলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগি নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের গোপন ‘এশিয়া মাইনর সমঝোতা’ বা ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র অন্যতম রূপকার ব্রিটিশ কূটনীতিক মার্ক সাইকসও ‘বেলফোর ঘোষণা’য় জড়িত ছিলেন।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে—খাইম ভাইজমান ও তার অনুসারী জায়নবাদী এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে মূল যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন মার্ক সাইকস।
ভাইজমান তার আত্মজীবনীতে লিখেন: ১৯১৭ সালে জায়নবাদীদের এক বৈঠকে সাইকস বলেছিলেন যে ‘ফিলিস্তিনকে ইহুদিকরণের ভাবনার সঙ্গে তিনি পুরোপুরি সহানুভূতিশীল।’
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কিদের পরাজয়ের পর ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের কাছে পবিত্র শহর জেরুসালেমসহ আরব অধ্যুষিত ফিলিস্তিন অঞ্চল উপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী নিজেদের দখলে নেয়।
‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’-য় ব্রিটিশরা ‘ধর্মীয় জটিলতার কারণে’ প্রথমে ফিলিস্তিন অঞ্চলকে ‘আন্তর্জাতিক’ সম্প্রদায়ের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯১৬ সালের ১৬ মে ফ্রান্সের সঙ্গে গোপন এই ‘সমঝোতা’ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে সেই অঞ্চল ব্রিটিশরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।
বিতর্কিত সমঝোতাটির মূল কারিগর ব্রিটিশ কূটনীতিক মার্ক সাইকস ও ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকোর নামে পরবর্তীতে ‘এশিয়া মাইনর সমঝোতা’-র নামকরণ হলেও তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে, এর প্রভাব থেকে যায় ফিলিস্তিন অঞ্চলে।
অর্থাৎ, ব্রিটিশদের দখলদারিত্বের মাধ্যমে তাদের হাত দিয়ে আরব ও মুসলিম অধ্যুষিত ফিলিস্তিন অঞ্চল চলে যায় বিদেশি ইহুদিদের হাতে। ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
‘বেলফোর ঘোষণা’য় আরও জড়িত ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম ইহুদি মন্ত্রী হারবার্ট স্যামুয়েল। ১৮৭০ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি ‘ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে একটি প্রস্তাবনা ব্রিটিশ মন্ত্রী পরিষদে তুলে ধরেন।
মিশরের সুয়েজ খালের পাশে একটি বন্ধু রাষ্ট্র তথা ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টির ওপর জোর দেন ব্রিটিশ মন্ত্রী পরিষদের এই ইহুদি সদস্য।
সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, হারবার্ট স্যামুয়েল তার প্রশাসনে জায়নবাদীদের নিয়োগ দেন। ফিলিস্তিনিরা যেন নিজেদের রাষ্ট্র গঠন করতে না পারে, তা দেখভালের জন্য।
‘বেলফোর ঘোষণা’য় জড়িত আরও একজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। তিনি লেখক ও কূটনীতিক নাহুম সসোকোলোভ। ১৮৫৯ সালে পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি জায়নিস্ট অর্গানাইজেশনের সভাপতি খাইম ভাইজমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
নাহুম সসোকোলোভ ‘বেলফোর ঘোষণা’র পক্ষে প্রচারণা চালাতেন বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ঘৃণিত রাষ্ট্র’ ইসরায়েল
গত ১ জুন মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস-এর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়—খোদ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে টেলিফোনে বলেছেন, সবাই ইসরায়েলকে ‘ঘৃণা’ করে।
এদিকে, গত ১৩ মে গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশন-এর জরিপের বরাত দিয়ে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, চলতি বছর ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে ‘ঘৃণিত’ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই তালিকায় প্রথম পাঁচে ইসরায়েলসহ আছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
আজ থেকে ৭৮ বছর আগে বিশ্বশক্তিদের সহায়তায় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূল, নির্বিচারে হত্যা, লাখো মানুষকে চিরতরে উদ্বাস্তু করে দেওয়া ও সর্বোপরি, গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত।
গত ৭ এপ্রিল গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চের এক জরিপে বলা হয়—যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ।
শেষ কথা
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ‘বেলফোর ঘোষণা’র পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন করা হয়। এই ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা ‘মহাবিপর্যয়’ হিসেবে দেখে।
রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার সময় এর কোনো আনুষ্ঠানিক সীমানা উল্লেখ না করায় ইসরায়েল এর প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ক্রমাগত হামলা চালিয়ে সেসব দেশের ভূমি দখল করে চলেছে। দেশটি একটি আগ্রাসী শক্তি ও প্রতিবেশীদের জন্য ক্ষতিকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে বিবেচিত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনে সেদিনের সেই ‘মহাবিপর্যয়’ আজ আঞ্চলিক রূপ নিয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত এখন পারস্য উপসাগর তথা ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ববাসী দেখছে—১৯১৭ সালের ‘বেলফোর ঘোষণা’ থেকে ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম চুক্তি’—মধ্যপ্রাচ্যে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি যতভাবেই ইসরায়েলকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করুক না কেন, মূলত ইসরায়েলের কারণে খনিজসমৃদ্ধ সেই অঞ্চলটি যেন এক অন্তহীন যুদ্ধের যাঁতাকলে পড়ে গেছে।
এমন বাস্তবতায় ইহুদি রাষ্ট্রটির নেতারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠনের দাবি জানাচ্ছে। সেই রাষ্ট্রের সীমা ধরা হয়েছে মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত। এমনটি হলে তা এক বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
তাদের মতে, আর সেই বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ের মূলে থাকবে ‘বেলফোর ঘোষণা’র সেই ৬৭টি শব্দ।









