বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের অভিশাপ ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’ কী?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’-এর কথা মনে আছে? ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স। নিজ দেশে পরিচিত ‘অসাধারণ’ ব্যক্তি হিসেবে। ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাকে ডাকেন ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ নামে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্কের ওসমানীয় শাসনের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহী করে তোলা, মিশরের সিনাই ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে তুর্কি সেনাদের বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযান এবং ১৯১৮ সালে তুরস্কের অধীনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ দামেস্ক শহর দখলে অগ্রণী ভূমিকা রাখার জন্য এই ব্যক্তি বিশেষভাবে খ্যাত।

১৯৬২ সালে তার জীবনী নিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ সিনেমা। এর শুরুর অংশে দেখা যায়—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর পানির কূপ নিয়ে আরবদের গোত্রদ্বন্দ্ব।

অন্যদিকে, সেই একই সময়ে পর্দার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের তেল-কূপগুলো দখলের পরিকল্পনা করছিল দুই অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

সেই তেল-কূপ দখলের নীলনকশার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘এশিয়া মাইনর এগ্রিমেন্ট’। ব্রিটিশদের ভাষ্য: এটা কোনো ‘চুক্তি’ ছিল না। ছিল ‘সমঝোতা’।

পরবর্তীতে তা পরিচিতি পায় ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’ নামে।

এমন নামকরণ হয়েছে ব্রিটিশ কূটনীতিক মার্ক সাইকস ও ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকোর নাম অনুসরণ করে। কেননা, এই দুই কূটনীতিক অতি গোপনে সেই সময় এশিয়া মাইনর হিসেবে পরিচিত আজকের মধ্যপ্রাচ্যকে চার ভাগে ভাগ করেছিলেন।

তখন সাইকসের বয়স ছিল ৩৬, আর পিকোর ছিল ৪৪ বছর।

ইতিহাসবিদরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে সেই দুই কর্মকর্তার বিশদ ধারণা ছিল না। অথচ, তারাই খাতা-কলম নিয়ে বসেছিলেন খনিজসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ-বাটোয়ারায়।

এ ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তথা ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারত ভাগের কথা যেন মনে করিয়ে দেয়। যদিও এখানকার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।

সাইকস ও পিকো কারা?

ব্রিটিশ কূটনীতিক, রাজনৈতিক পরামর্শক, কনজারভেটিভ পার্টির নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও পর্যটক মার্ক সাইকসের জন্ম লন্ডনে ১৮৭৯ সালের ১৬ মার্চ।

এক ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সঙ্গে রেখেছিলেন ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো-কে।

তারা দুইজন মিলে তৈরি করেছিলেন ‘এশিয়া মাইনর সমঝোতা’। পরবর্তীতে এটি তাদের নামেই পরিচিতি পায়।

সাইকসের পরামর্শে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ‘অ্যারাব ব্যুরো’ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে মিশর থেকে পুরো আরব অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো।

অনেকের বিশ্বাস, বিতর্কিত ‘বেলফোর ঘোষণা’ তৈরিতেও মার্ক সাইকস ভূমিকা রেখেছিলেন।

অন্যদিকে, ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকোর জন্ম প্যারিসে, ১৮৭০ সালের ২১ ডিসেম্বর। তার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জর্জ-পিকো।

১৮৯৬ সালে কূটনীতিক হিসেবে কাজ শুরুর আগে তিনি প্যারিসে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগে পিকো বৈরুতে কনসুল-জেনারেল হন।

১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

পরে তিনি বুলগেরিয়া ও আর্জেন্টিনায় কাজ করেছেন।
তিনি ফ্রেঞ্চ কলোনিয়াল পার্টির সদস্য ছিলেন।

মার্ক সাইকস তার কৃতকর্মের প্রভাব দেখে যেতে পারেনি। ১৯১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি প্যারিসে এক শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ বছর বয়সে মারা যান।

ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো বেঁচেছিলেন ১৯৫১ সাল পর্যন্ত। সে বছর ২০ জুন তিনি ৮০ বছর বয়সে প্যারিসে মারা যান।

‘এশিয়া মাইনর সমঝোতা’ কী?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ‘ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তুরস্কের পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন কূটনীতিক সাইকস ও পিকো সেই সময়ে তুর্কি শাসনের অধীনে থাকা মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশের এলাকাগুলোকে চারটি মূল ভাগে ভাগ করেন।

তেলসমৃদ্ধ দুই অঞ্চলের একটি—তথা বড় অংশ—ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবের অংশটি নেয় ব্রিটেন। অন্য অংশ—তথা, সিরিয়া ও লেবানন নেয় ফ্রান্স।

তাদের ভাগ-বাটোয়ারার মানচিত্রে ব্রিটেনের অংশটি ‘এ’ ও ফ্রান্সের অংশটি ‘বি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমঝোতা অনুসারে—তুর্কি সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্ব অংশ ও বসফরাস দেওয়া হয় তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্য তথা জারদের। অপর অংশ—তথা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ‘ধর্মীয় জটিলতা’র কারণে রাখা হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য।

এ ছাড়াও, অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির জন্য রাখা হয় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশ।

সেই অস্থির সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলছিল চারটি বড় ঘটনা। এর একটি—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ; অন্যগুলো—তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহ, ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’ ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ঘিরে ‘বেলফোর ঘোষণা’।

পশ্চিমের প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সেসময় তুরস্কের ওসমানীয় শাসকদের চেপে ধরেছিল চারদিক থেকে।

প্রসঙ্গত বলে রাখা যেতে পারে—আজকের মধ্যপ্রাচ্যকে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ‘এশিয়া মাইনর’ নামে ডাকা হতো। রোমানরা ভৌগোলিকভাবে পরিচিত পশ্চিম এশিয়ার অংশ-বিশেষকে এশিয়ার মাইনর বলতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অংশবিশেষ ‘মধ্যপ্রাচ্য’ নামে পরিচিতি পায়।

১৯৯০ এর দশকে পারস্য উপসাগরের তীরে কুয়েতকে দখলের পর ইরাক, ইরান, কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাত, কাতার ও ওমানকে বোঝাতে ‘উপসাগরীয় অঞ্চল’ পরিভাষাটিও ব্যাপক ব্যবহার করা হয়।

অর্থাৎ, প্রাচীন আরব উপদ্বীপ ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলো যুগে যুগে বিশ্ববাসীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে।

এই এলাকাটিকে ভৌগোলিক বিবেচনায় পশ্চিম এশিয়া ও নিকট প্রাচ্য নামেও ডাকা হয়।

ফিরে আসা যাক ‘এশিয়া মাইনর সমঝোতা’ প্রসঙ্গে।

সমঝোতাটির শতবর্ষে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আরবরা কেন সাইকস-পিকোর ওপর বিরক্ত’।

এতে বলা হয়, সেই দুই কূটনীতিকের পেনসিল বিশ্বের সবচেয়ে সংঘাতময় অঞ্চলটিকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করেছিল। এর ফলে সেই অঞ্চলের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষরা আরও বিভক্ত হয়ে যায়।

গত ১০ মে জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ‘একটি মানচিত্র, শত বছরের সংঘাত’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শত বছর পরও মধ্যপ্রাচ্যে কোটি কোটি মানুষের জীবনে সেই ‘সমঝোতা’র প্রভাব প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়।

এতে আরও বলা হয়, উপনিবেশিক শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলেছে।

তারা মরুভূমির বালু ওপর সরল রেখা টেনে একই সংস্কৃতি ও এমনকি, একই গোত্রের মানুষদের বিভক্ত করে দিয়েছে। তাদের সেই বিভক্তি রেখা শত বছর ধরে ‘অভিশাপ’ হয়ে আছে আরবসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জীবনে।

সমঝোতা অনুসারে, ফিলিস্তিন অঞ্চলের আকরে শহর থেকে ইরাকের কিরকুত শহর পর্যন্ত একটি সীমানা রেখা টানা হয়েছিল। এর ওপরের অংশ নিয়েছিল ফ্রান্স ও নিচের অংশ নিয়েছিল ব্রিটেন।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও ‘অ্যা লাইন ইন দ্য স্যান্ড’-এর লেখক জেমস বার জার্মান সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, ২০১৪ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত এক জরিপে দেখা গিয়েছিল—ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রতি ১০ জনের একজন সাইকস-পিকো সমঝোতার কথা শুনেছেন।

অন্যদিকে, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্রাজুয়্যেট স্ট্যাডিজ-এর ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও লেবাননী ইতিহাসবিদ আমল গাজাল জানান, আরব দেশগুলোর স্কুলের বাচ্চারাও এই সমঝোতা সম্পর্কে অবগত।

A Line in the Sand

তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘এই বিভক্তি রেখা মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। এই বিভাজনকারী সীমান্তের কারণে সেখানকার গোত্র ও পরিবারগুলোও বিভক্ত হয়ে পড়েছে।’

‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সীমান্ত বাস্তবতার রূপ নিলেও নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্ম হয়েছে।’

আমল গাজালের ভাষ্য: ‘সাইকস-পিকো সমঝোতাকে আরবদের বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি গোপনে করা হয়েছিল। আর গোপনে কিছু করাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়।’

তার মতে, ঐক্যের পরিবর্তে আরব দুনিয়াকে বিভক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই সেই সমঝোতা করা হয়েছিল।

‘সমঝোতা’র প্রভাব

১৯১৬ সালের ৩ জানুয়ারি ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র খসড়া তুলে ধরা হয়। সে বছর ১৬ মে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে তা গ্রহণ করে। সমঝোতা-পত্রের নিচে ডান পাশে সাইকস ও পিকো সই করেন।

সমঝোতায় বলা হয়, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের আশু পতনের পর তুরস্কের দখলে থাকা মধ্যপ্রাচ্যর বড় দুই অংশের একটি ব্রিটেন ও অন্যটি ফ্রান্স নেবে।

তাদের সেই সমঝোতার প্রভাব সম্পর্কে ব্রিটানিকা বলছে—আরব বিশ্বে দেশভাগের সীমানা রেখা টেনে দেওয়ায় কুর্দি ও দ্রুজ জাতিগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কেননা, এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষগুলো বর্তমানে একাধিক আরব রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হয়ে জীবন কাটাচ্ছে।

এতে আরও বলা হয়—‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র বিরোধিতা করে একসময় ‘প্যান আরব জাতীয়তাবাদ’ গড়ে উঠলেও তা সাফল্য পায়নি।

পরবর্তীতে, ২০১৪ সালে ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র বিরোধিতা করে সশস্ত্র সংগঠন আইএস প্রচারণা চালায়।
সিরিয়া ও ইরাকে গড়ে উঠা এই সংগঠনটি সে সময় এক প্রচারণা ভিডিওতে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে সীমান্ত চৌকি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখায়।

‘সাইকস-পিকোর সীমানা মানি না’ স্লোগান দিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে সংগঠনটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ জানতেই পারেনি যে ডাউনিং স্ট্রিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।

১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে লন্ডনে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হার্বার্ট অ্যাশকুইথের সঙ্গে মার্ক সাইকসের বৈঠকের সারসংক্ষেপের বরাত দিয়ে ঐতিহাসিক জেমস বার জানান—সাইকস বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্রিটেন-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র থাকা প্রয়োজন।

তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য: ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র মাধ্যমে মূলত ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে বিভক্ত করা হয়েছে। সে কারণে সেই সমঝোতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তুরস্ক।

আরব সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সেই সমঝোতা আরবদের জন্য ‘অভিশাপ’ ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের ‘অভিশাপ’

১৯১৬ সালের ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’ কখনই বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও একে ধরা হয় মধ্যপ্রাচ্যে আজকের সব অশান্তির ‘মূল কারণ’ হিসেবে।

ইতিহাস বলছে—‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’র কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১৫ সালের শেষের দিকে। আনুষ্ঠানিকভাবে তা শেষ ও গৃহীত হয় ১৯১৬ সালের মে মাসে।

১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বলশেভিক বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হলে সেখানে জার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের পতন হয়।

বিপ্লব-পরবর্তী কমিউনিস্ট সরকার গোপন ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’ জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মুখোশ খুলে যায়।

আল জাজিরার প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, লেনিনের সহকর্মী লিওন ত্রতস্কি ১৯১৭ সালের ২৪ নভেম্বর ‘ইজভেসতিয়া’ পত্রিকায় সেই সমঝোতার একটি কপি প্রকাশ করে দেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মহাশক্তিধর দেশগুলো ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে কীভাবে ভাগ-বাটোয়ারার পরিকল্পনা করছে তা তুলে ধরতে তিনি এ কাজ করেন।

কেননা, সেই সময় সেই দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরবদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে তারা আরবদের তুর্কি শাসন থেকে মুক্ত করে ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ দেবে।

অথচ দেখা গেল, ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে ‘পিঠা ভাগের’ মতো তুর্কি শাসনের অধীনে থাকা আরব ভূখণ্ডগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছে।

এমনকি, সহযোগিতার আড়ালে আসলে আরব ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো, অর্থাৎ, তুরস্ক ও তৎকালীন পারস্য বা আজকের ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের অধীনে নিয়ে নিচ্ছে।

তুর্কিদের হাত থেকে আরব অধ্যুষিত ফিলিস্তিন অঞ্চল ও জেরুসালেম শহর আরবদের হাতে ফিরিয়ে না দিয়ে তা বিদেশি ইহুদিদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

এ ছাড়াও, তুর্কিদের ভূখন্ড রাশিয়া ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।

উপসংহার

১৯৯০ সালে ইরাকি বাহিনী প্রতিবেশী কুয়েত দখল করলে ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন যে তিনি ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক সীমানা মানেন না। কেননা, সেই সীমানা উপনিবেশিক শক্তির তৈরি।

এরপর তিনি স্বাধীন কুয়েতকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ের মতো ইরাকের একটি প্রদেশে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। সেসময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের তৈরি সীমানার ‘যৌক্তিকতা’ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল।

‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’-র ১১০ বছর হলেও, তা এখনো মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল ক্ষতের মতো দৃশ্যমান। আর তাই সংঘাত-পীড়িত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ‘মূল কারণ’ জানতে সেই গোপন সমঝোতা সম্পর্কে জানা জরুরি।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ছবির পোষ্টার। ছবি: আইএমডিবি

একটি অখণ্ড ভূখণ্ড, একই ভাষা-সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের যে অন্তত ২০টি দেশে ভাগ করে রাখা যায়, সেই ধারণাটির যেন জন্ম দিয়েছিল ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’।

আবারও ফেরা যাক ‘লরেন্স অব অ্যাবাবিয়া’-য়। সেই চলচ্চিত্রের শেষ অংশে তুলে ধরা হয় ব্রিটিশদের দখল করা দামেস্কে আরব কাউন্সিলের বৈঠক ও বৈঠকের হট্টগোল। এর মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয় আরবদের গোত্রদ্বন্দ্ব।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সেই দ্বন্দ্ব যে আজো প্রকটভাবে বিদ্যমান এর প্রমাণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে আরব দেশগুলোর রেষারেষি ও অনৈক্য।

আর এসব দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখার কৌশল হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছে ‘সাইকস-পিকো সমঝোতা’। তাই একে দেখা হয় আরবদের ‘চিরস্থায়ী বিভাজন মন্ত্র’ হিসেবেও।

যদিও পশ্চিমের কূটনীতিকদের অনেকে মনে করেন, সাইকস-পিকো যদি আরবদের বিভক্ত না করতেন তাহলেও তাদের বিভাজন অবশ্যম্ভাবী ছিল।