খাগড়াছড়িতে চেঙ্গী-মাইনী নদীর পানি বাড়ছে, বিদ্যুৎহীন দীঘিনালা-সাজেক
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়িতে আজ বৃহস্পতিবার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এরইমধ্যে চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খালের পানি বেড়ে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি আরও বাড়ছে।
একের পর এক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালা–লংগদু, দীঘিনালা–সাজেক ও খাগড়াছড়ি–রাঙামাটি সড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে দীঘিনালা–লংগদু সড়কের স্টিল ব্রিজ, ছোট মেরুং, আটারকছড়া ও তেঁতুলতলা এলাকায় সড়কের ওপর পানি উঠে যায়। এরপর থেকে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বুধবার সকালে দীঘিনালা–সাজেক সড়কের কবাখালী, বাঘাইহাট এলাকাও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সড়কে অনেককে কোমর পানি পেরিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। অনেককে আবার ভ্যান গাড়িতে করে পার হতেও দেখা গেছে।
অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ি–রাঙামাটি সড়কের মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা, লিমুছড়ি এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ওই সড়কেও সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে জেলার চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খাল–ছড়ার পানি বাড়ছে। জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার নিম্নাঞ্চলে অনেক বসতবাড়ি ও সড়কে পানি উঠেছে। অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেছে। পানি উঠেছে খাগড়াছড়ি শহরের নিচের বাজার, বটতলী, মহিলা কলেজ এলাকা, টিটিসি, রাজ্যমনিপাড়া ও গঞ্জপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায়।
খাগড়াছড়ি শহরের রাজ্যমনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা উলাপ্রু মারমা বলেন, ঘরবাড়িতে পানই ওঠায় যাওয়ায় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে পানি উঠলেও আমি এসে পাহারা দিচ্ছি চোরের ভয়ে।
দীঘিনালার মেরুং এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, এলাকার বেশির ভাগ ঘরে পানি উঠে গেছে। আমরা একটু উঁচু এলাকায় থাকায় এখনো কোনোরকমে আছি। তবে রান্নাঘরে পানি ঢুকেছে। একটুপর বসতঘরেও ঢুকবে। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় পানিও খেতে পাচ্ছি না।
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতে পানি কিছুটা কমলেও আবার বাড়তে শুরু করেছে। সাজেক ও লংগদু সড়কের কয়েকটি অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বন্যার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। মহালছড়ি–গুইমারা সড়কের সিন্দুকছড়িসহ বিভিন্ন সড়কে ছোট আকারের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। জেলা শহরের শালবন, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা, কলাবাগান, নুনছড়িবাজার, মোল্লাপাড়া, কৈবল্যপিঠ ও আঠারো পরিবার এলাকাসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয় নেওয়া মানুষদের জন্য খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দীঘিনালা ও সাজেকে নেই বিদ্যুৎ
দীঘিনালা উপজেলার ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে (সাবস্টেশন) পানি উঠেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বুধবার বিকেল থেকে দীঘিনালা উপজেলা ও সাজেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
এতে সেখানকার আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল ফোন চার্জ, ইন্টারনেট সংযোগ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।
দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিল্লোল বড়ুয়া বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানিতে পুরো উপকেন্দ্র তলিয়ে গেছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হবে।