জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্যাঙের পানচিনি’
আবহমান কাল ধরে গ্রাম-বাংলার জনপদে একটি বিশ্বাস প্রগাঢ় হয়ে আছে—ব্যাঙের বিয়ে দিলে নাকি মেঘের সিংহাসন টলে, নামে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি।
সেই প্রাচীন লোকজ বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের আবির মেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আঙিনায় বসেছিল এক অপূর্ব মিলনমেলা। না, কোনো মানবের পরিণয় নয়; উপলক্ষ ছিল প্রতীকী ‘ব্যাঙের পানচিনি’।
সোমবার বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্যটা একটু হেলে পড়েছে, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবনের সামনে বইছিল উৎসবের হাওয়া।

একদিকে কনেপক্ষ অপেক্ষমাণ, অন্যদিকে দূর থেকে ভেসে আসছে ঢাক-ঢোলের শব্দ। কনে সেজেগুজে বসে আছে মঞ্চের এক কোণে, আর বিকেল ৫টার দিকে রাজকীয় ভঙ্গিতে বরপক্ষ হাজির হলো বিশাল এক র্যালি নিয়ে।
বরের মাথায় এক ঢাউস ছাতা, যা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে যেন পুরো পরিবেশকে এক মুহূর্তেই রাঙিয়ে দিলো।
হলুদ, ধান আর দূর্বা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো বরপক্ষকে। চলল আশীর্বাদ আর প্রীতিময় খুনসুটি। শুধু শিক্ষার্থী নয়, এই লোকজ উৎসবে অভিভাবকদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা।
বরের বাবার ভূমিকায় ছিলেন কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক এবং কনের পিতার গুরুদায়িত্ব পালন করেন চারুকলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শামীম রেজা।
চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের হারানো সংযোগকে পুনরুজ্জীবিত করা।
লোকজ বিশ্বাস অনুসারে, খরা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টির প্রত্যাশায় এই কৃত্য পালন করা হয়। পানচিনি মূলত বিয়ের আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার; যেখানে আশীর্বাদ বিনিময়ের মাধ্যমে দুটি পক্ষের মধ্যে সম্প্রীতির সেতু তৈরি হয়।
‘প্রান্তিক মানুষের বিশ্বাস থেকে উঠে আসা এই কৃত্যটি কেবল বিনোদন নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার স্মারক’, বলেন নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী প্রজয়।
বর-কনের লড়াই ও মধুর সমঝোতা
বাঁশ আর রঙিন কাগজে গড়া ব্যাঙ-যুগলের বিশাল প্রতিকৃতি দেখে বোঝার উপায় নেই যে এরা প্রাণহীন। নতুন কলা ভবনের শিক্ষার্থীরা সেজেছিলেন বরপক্ষ আর পুরাতন কলা ভবন ছিল কনেপক্ষ। গেট ধরা থেকে শুরু করে দেনমোহর নিয়ে দর-কষাকষি—বাদ যায়নি কিছুই!
কেউ চাইলেন পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেনমোহর, কেউ চাইলেন সামান্য কিছু। বিতর্কের ঢেউ উঠল বিয়ের রীতি নিয়ে। শেষমেশ কনেপক্ষের যুক্তিতেই সবাই সায় দিলেন—মানুষের ধর্মে নয়, ব্যাঙের বিয়ে হবে প্রকৃতির আপন রীতিতে, ব্যাঙের ধর্ম মেনেই।

দীর্ঘ লড়াই আর মধুর তর্কের অবসান ঘটে আংটি বদলের মাধ্যমে। দুপক্ষের সমঝোতায় চূড়ান্ত হলো আসছে আষাঢ়েই সম্পন্ন হবে এই পরিণয়।
যান্ত্রিক এই নগরজীবনে মানুষ যখন প্রকৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজন যেন শেকড়ের দিকে এক পা ফেলা।
কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হকের ভাষায়, ‘ব্যাঙ প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। প্রকৃতি ভালো থাকলে মানুষও ভালো থাকবে, এই বার্তাই আমরা দিতে চেয়েছি।’